ভালো মেয়ে হতেই হবে কেন?

সাজেদা হক: আজ বেশির ভাগ অনলাইনে একটি সংবাদ এসেছে, ‘আবারো ঘর ভাঙ্গছে রচনা ব্যানার্জ্জী’র। আমি বিশ্বাস করি, কোন মেয়েই সংসার ভাঙ্গতে চায় না এবং সাধারণত একজনের সঙ্গেই জীবন কাটাতে চায়। মেয়েদের এই দুর্বলতার কথাটা পুরুষরা জানে বলেই মেয়েদের সাথে যা ইচ্ছা তাই আচরণ করে। আর যখন ভাঙ্গে তখন বুঝতে হবে, নিতান্তই নিরুপায় হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

sajeda
সাজেদা হক

তাই, শ্রদ্ধা করুন সেই সাহসী মেয়েটিকে, যিনি এই সিদ্ধান্তটা নিতে পারলেন। আফটার অল হিউম্যান রিলেশন। এখানে উত্থান-পতন থাকবেই। এটাও মানতে শিখুন। বুঝতে শিখুন, মেয়েরাও মানুষ। এমন অনেক মেয়েই আছেন, যারা এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার চেয়ে আত্মহত্যাকেই শ্রেয় মনে করেন। আত্মহত্যা করেন এই ভেবে যে, সমাজ কী বলবে, আত্মীয়-স্বজনরাই বা কিভাবে নেবে বিষয়টা। অনেকে আবার ধর্মীয় (গোড়ামি-কুসংস্কার-আমি বলি মুসলমান মন) চিন্তা থেকেও এক স্বামীর সঙ্গে জীবন কাটিয়ে দেয়ায় বিশ্বাসী। ব্যত্যয় হলে মৃত্যুই শ্রেয় তাদের কাছে।

ছেলেদের একটা দুর্বলতার কথা ফাঁস করে দেই। সেটা হলো-সাধারণত, বউ মরে গেছে এটা বলতে বেশি পছন্দ করেন তারা। একটা প্রবাদও তো আছে, ভাগ্যবানের বউ মরে, অভাগার গরু। আর ডিভোর্স হয়ে গেছে এটা তারা বলতে চান না, বলতে লজ্জা পান। আত্মসম্মানে লাগে। তাই নিজেকে ভালো প্রমাণের জন্য বলে বেড়ান,  বউয়ের চরিত্র ভালো ছিলো না।

সত্য স্বীকারে মেয়েরা যতোটা সাহসী, ঠিত ততোটাই ভীতু পুরুষরা। এজন্য ছেলেদের ভদ্র আর অমায়িকভাবে সমাজ-সংসার। মিথ্যার প্রলেপ তাদের চলনেও, বলনেও। আদতে খুব কম সংখ্যক পুরুষ আছেন যারা সত্যিকার অর্থে সংসার করতে চান। আমি তো আরো এক ধাপ এগিয়ে বলি, এই যে গোটা বিশ্ব, সমাজ-সংসার, তার পুরোটায় মেয়েদের ত্যাগের কারণে, সহ্য করার কারণে, কষ্ট পেয়েও মুখ বুঁজে থাকার কারণে তৈরি। এখানে পুরুষের কোনো অবদান কখনই ছিলো না, নেই এবং পরেও থাকবে না।

তাই, পুরুষ নামের স্বামীরা যা খুশি বলুক, তাতে কিছু যায় আসে না। মেয়ে তুমি তোমার মনের কথা শোনো। এই সমাজ-সংসার কিংবা অন্য কেউ তোমার কষ্ট-তোমার বেদনা, আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়ার হিসেব মেলাতেও পারবে না, মিলিয়েও দেবে না। এমনকি দৈনিক যে চাহিদা তোমার, হোক তা শারীরিক বা মানসিক, তাও মেটাতে পারবে না। সুতরাং কি লাভ এদের কথা ভেবে?

পুরুষ বা পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থা চায়, মেয়েটা মরে যাক। আর না হয় একদম মুখ বুঁজে থাক, যেন কোন রা না করে। যেন সামাজিক প্রথা মেনে ঘরে নিয়ে মেয়েটিই তার ক্ষমতা আর শক্তি দেখানোর একমাত্র জায়গা।

মাঝে মাঝে মনে হয়, অযথাই নিম্নশ্রেণীর মানুষদের দোষ দেই আমরা, যারা শারীরিক নির্যাতন বেশী করে বলে ভাবি আমরা। কিন্তু শারীরিক তো বটেই, মানসিক নির্যাতন কোথায় নেই বলতে পারেন? উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারে কি এমন নির্যাতন কম হয়? না। হয়তো নির্যাতনের ধরনটা এসবক্ষেত্রে ভিন্ন। নির্যাতন তো হয়ই। সব কথা তো আর সব সময় সবাইকে বলাও যায় না। তারপরও মেয়েরা নানাভাবে চেষ্টা করেন সংসারে টিকে থাকতে, পরিবারের সাথে মানিয়ে চলতে। কিন্তু যখন নিতান্তই পারেন না, তখন কোন কোন সাহসী মেয়ে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। আলাদা হওয়ার সাহস করে। তাদের এ সিদ্ধান্তকে অন্তত আমি স্বাগত জানাই। শ্রদ্ধা করি। বিশ্বাসও করি, অনেক চেষ্টার পর সংসার ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

কারণ ক্ষণে ক্ষণে মরার চেয়ে, বেঁচে থাকাটা অনেক সুখের, অনেক আনন্দের। সবচেয়ে আনন্দ হলো, এই যে স্বামী-স্ত্রী মধ্যে বা ছেলেটা-মেয়েটার মধ্যে ভালো-মন্দের এই যে প্রতিযোগিতা- সেখানে শেষ জয়ের হাসিটা সাহসীর।

এ সাহস অর্জনের জন্য প্রত্যেকটা নারীকে বহু দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হয়। এই দ্বন্দ্বটা যতটা না পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক, তার চাইতেই বেশি মানসিক। তালাকের বা আলাদা বাসের সিদ্ধান্তটা এতোটাই কঠিন যে, মেয়েটিকে একটি অন্তহীন যুদ্ধ করতে হয় দিন-রাত। যুদ্ধটা অন্যের সাথে নয়, বরং নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। তাই ভীষণ সাহসী একটি কাজের জন্য মেয়েটি সম্মান পেতেই পারেন। অথচ আমাদের তথাকথিত পুরুষশাসিত সমাজ তাকে তখনও অবজ্ঞা করে, অপমান করে, করে ইভ টিজিংও।

ভয় পেয়ো না মেয়ে, এসবকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েই তুমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছো। এবং এ সিদ্ধান্তই তোমার যথার্থ। কোনো ভুল নাই এতে। নেই কোনো লজ্জাও। তাই মাথা নত নয়, মাথা উঁচু করে দাঁড়াও, চলো। এগিয়ে যাও সামনের পথে, মেলো তোমার উন্মুক্ত ডানা। ছড়িয়ে দাও তোমার স্বপ্ন। আলো ছড়াও দিকে দিকে।

আসলে এই সমাজে নারী ইস্যুতে একটিও ভালো ছেলে নেই। জোর দিয়ে বলছি, একজনও নেই। দীর্ঘদিনের কাজ আর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। ফলাফল যদি এই হয়, তাহলে তোমার ভালো মেয়ে হতেই হবে কেন?

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.