অচ্ছুৎ এলজিবিটি রাইটস্

শামীম রুনা: নর্স্ক ভাষার ক্লাশে সেদিন হুট হরে হয়ে গেল অন্যরকম এক ওরিয়েন্টেশন ক্লাশ। যদিও বলছি হুট করে,তথাপি স্কুল অথরটি ক্লাশটি হুট করে করেনি তা বোঝাই যাচ্ছিল। স্টুডেন্টদের বুঝতে সুবিধার জন্য তিনজন ট্রান্সলেটর ছিল ক্লাশে, আরবী, ইংরেজি এবং পোলিশ ভাষার। এলজিবিটি রাইট ইন নরওয়ে, গে বা লেসবিয়ানদের রাইট এবং গে লেসবিয়ান রিফ্যুজিদের সমস্যা নিয়ে এই ওরিয়েন্টেশনের আয়োজন করা হয়। এটি মূলত কোর্সের একটি অনুষঙ্গ ছিল।

14331030_10205920768092288_505035468_nরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের কারণে ইউরোপে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রিফ্যুজি আসছে ফারাক্কার বাঁধ ছাড়া পানির পরিমাণে। এই রিফ্যুজিদের মাঝে নানান রকমের মানুষ রয়েছে, কেউ এসেছে পরিবার-পরিজন নিয়ে, কেউবা একা, অনেকে নানান দেশ ঘুরে ঘুরে এখানে এসে অনির্দিষ্ট গন্তব্যকে আপন আলয় বানিয়ে নিয়েছে।

এদের মধ্যে যেমন কট্টর ধার্মিক রয়েছে, তেমনি রয়েছে নাস্তিক, রয়েছে হোমোসেক্সুয়াল। হোমোসেক্সুয়াল বা সমকামিরা নিজেদের দেশে নিরাপত্তাহীনতায় ছিল বলে ওরা এসব দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো সমকামিদের আশ্রয় দিলেও ওদের নিজেদের দেশের আরব রিফ্যুজিরা কিন্তু এদেশে এসেও তাদের মেনে নিতে পারছে না। ফলে দেখা যাচ্ছে একই দেশ এবং একই ভাষার হওয়া সত্বেও ওরা নিজেদের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি করে নিয়েছে এবং যথারীতি সমকামিরা এই দেশে এসেও নিজের দেশের লোকের জন্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

আর যেসংখ্যক গে এসেছে, সে সংখ্যায় কিন্তু লেসবিয়ান আসেনি, কারণটা তো বোঝাই যায়, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের নারীরা এখনও এতোটা সাহসী হয়ে উঠতে পারেনি নিজেদের সমকামি দাবি করে আশ্রয় চাওয়ার মতো।

ওরিয়েন্টেশনে নরওয়ের এলজিবিটি রাইটগুলো পড়া এবং অনুবাদ করে বুঝানোর চেষ্টা করা হয়। নরওয়ের সমকামি বা উভয়কামিদের পক্ষে ১৯৭২ থেকে বিভিন্ন ধরনের আইন পাশ করে এসেছে, এবং সমকামিদের বিয়ের অনুমতি দেয় ২০০৯ সালে, আর তখন থেকে অনুমতি দেওয়া হয় সমকামি দম্পতিরা চাইলে বাচ্চা এডপ্ট করতে পারবে।

সমকামিতা কোনো মানসিক ব্যাধি নয়, যৌনবিকৃতিও নয়, এটি স্বাধীন এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছা এবং প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি, তাই নরওয়ের সমকামিরা সরকারি, বেসরকারি, এমনকি সেনাবাহিনীতেও কাজ করে আসছে। নরওয়ে সমকামিদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ এবং এই দেশের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, যারা সমকামি নয় তারা যেন সমকামিদের সহজ এবং স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে।

ইউরোপের অধিকাংশ রিফ্যুজি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসছে। ইউরোপ হঠাৎ উপচে আসা রিফ্যুজিদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য সহযোগিতা যেমন করছে, তেমনি চাইছে মানবিক মূল্যবোধগুলোও এদের শেখাতে।

14371875_10205920768332294_131591826_nকিন্তু আরব মুসলিমদের চাইলেই কি মানবিক মূল্যবোধ শেখানো যায়! এতো সহজে দূর হওয়ার নয় রক্তে মিশে থাকা হাজার বছরের গোঁড়ামী! মুসলিম সব দেশেই সমকামিতা অবৈধ। কোনো কোনো দেশে সমকামিতার জন্য মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়। আরবরা বহুনারীগামী হতে পারে, হালাল সেক্স শপে গিয়ে কবুল বলে নির্দিষ্ট সময়র জন্য নারী ভাড়া করার কায়দা করতে পারে, গোপনে গেলমান পুষতে পারে, কিন্তু প্রকাশ্যে সমকামিদের একদম মানতে পারে না। এসব দেশে এসেও তাই সুযোগ পেলেই সমকামিদের ওপর এক হাত নিতে ছাড়ে না। কার্যত, ইউরোপেও সমকামিরা নিজেদের দেশের মানুষ দ্বারা নিগৃহিত হচ্ছে।   

আমাদের ক্লাশে বিশজন স্টুডেন্টের মধ্যে দুইজন গে, সিরিয়া থেকে এসেছে ওরা। জোসেফ আর লরেন্স, মিথ্যে বলবো না; প্রথম প্রথম ওদের সঙ্গে কথা বলতে একটা অস্বস্তিবোধ কাজ করতো। পরে তা কেটে যায় এবং বুঝতে পারি মানুষের মনের গভীরের অন্ধকার সহজে আলোকিত হতে চায় না। আলো জ্বালানোর জন্য পরিচর্যা এবং অনুশীলন জরুরি।

ওরিয়েন্টেশনে জোসেফ নিজেকে সিরিয়ান গেদের রিপ্রেজেন্টেটিভ বলে দাবি করলো। বললো, সিরিয়ায় সমকামিদের নিরাপত্তাহীন জীবনের কথা। ও বলে, সমকামি বলে সিরিয়াতে কাউকে ইসলামিক টেররিস্টরা খুন করলে কেউ কোনো প্রতিবাদ করে না, এমনকি মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরাও এই বিষয়ে প্রতিবাদ করতে বিব্রতবোধ করে। লেসবিয়ান নারীকে খুন করা সিরিয়ায় জায়েজ, কেননা এরা ধর্মের পথ থিকে বিচ্যুত।

kiss 1আমি ভাবি, বাংলাদেশ কি আর সিরিয়া থেকে কোনো অংশ পিছিয়ে আছে? এরপর জোসেফ জানায়, ও সাত মাস আগে নরওয়ে আসতে পারলেও, ওর বয়ফ্রেন্ড এখনো আসতে পারেনি, ও চায় ওর বয়ফ্রেন্ডকে নরওয়ের আইন অনুসারে বিয়ে করে নিয়ে আসতে। ওদের স্বপ্ন বিয়ের পর ওরা বাচ্চা এডপ্ট করবে এবং নরওয়েতে  হ্যাপিলি বসবাস করবে। জোসেফ পকেট থেকে বের করে এনে দেখায় সমকামিদের ছয় রঙা পতাকাটি, বলে, আমাদের শুধু একটি পতাকা আছে, কোনো দেশ নাই। আর তোমরা যারা আমাদের সাথে মিশতে অপছন্দ করো তাদের বলছি, হোমোসেক্সুয়ালিটি কোনো রোগ নয়। চাইলেই কেউ হোমোসেক্সুয়াল যেমন হতে পারে না, তেমনি জোর করে কারো সেক্স হেবিট চেঞ্জ করে দিতে চাওয়া মানে দুইজন মানুষকে জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা।

ওরিয়েন্টেশনে আরব দেশগুলোর গেদের নিয়ে বিবিসির করা কিছু ফুটেজ দেখানো হয়।

জোসেফের বয়ফ্রেন্ডকে নিয়েও একটি ভিডিও ছিল। সবার কাছে জানতে চাওয়া হয়, সমকামিদের নিয়ে কার দেশের কী অবস্থা। সমকামিদের নিয়ে বলতে গিয়ে মনে হলো, বাংলাদেশের অবস্থা সিরিয়া, আফগানিস্তান বা অন্য আরব দেশগুলোর চেয়ে ভালো নয়। সমকামি না হয়েও, শুধু সমকামিতার পক্ষে কথা বললে, লিখলে বা কিছু প্রকাশ করলেই মানুষকে খুন করা হয়। তার প্রমাণ তো বাংলাদেশ দেখেছে। তাছাড়া বাংলাদেশে সমকামিতা প্রতিরোধে ৩৭৭ ধারার আইন রয়েছে, যে আইনে মৃত্যুদণ্ড না দিলেও দশ বছর থেকে শুরু করে আজীবন কারাদণ্ড সঙ্গে জরিমানাও হতে পারে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, ইচ্ছা-অনিচ্ছাসহ সব মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সমকামিতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ মুসলিম দেশগুলোর কূপমণ্ডুক মতবাদকে এখনও আঁকড়ে আছে। মানুষ হয়ে জন্মানোর পর নিজের জীবন নিজের মতো করে উপভোগ করার অধিকার নিশ্চয় একজন মানুষের থাকা উচিত।

Xulhaz-Mannan
রূপবান পত্রিকার নিহত সম্পাদক জুলহাস মান্নান

বর্তমানে বাংলাদেশে সমকামি বা এলজিবিটি রাইটের পক্ষে বেশ কিছু সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। বয়েজ অফ বাংলাদেশ তেমনি একটি সংগঠন। এলজিবিটি রাইটের পক্ষে রূপবাননামে একটি পত্রিকা বের করা হয়, যা বাংলাদেশের প্রথম সমকামিদের পত্রিকা। পরে রূপবানের সম্পাদক জুলহাস মান্নান ও সদস্য তনয়কে ইসলামিক টেররিস্টরা কুপিয়ে খুন করে। এদের খুনের পর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী খুন হওয়ার জন্য মৃত ব্যক্তিদেরই দায়ী করে বলেন, সমকামিতা বাংলাদেশে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

মুসলিম বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের নামে দুই তরুণের মাঝে গোপন সম্পর্ক মানতে পারে, ধনীরা ঘেঁটুপুত্র রাখতে পারবে-তা মানা যাবে, বেহেস্তে হুরপরীর সঙ্গে গেলমানদের সেবা পাওয়া যাবে-তাও মানা যাবে, কিন্তু প্রকাশ্যে সমকামিতা সহ্য করা যাবে না। আর মুসলিম বিশ্বের গায়ে মানেনা আপনি মোড়ল মতাদর্শকে সাপোর্ট করে বাংলাদেশ আইন করে সমকামিতা বন্ধ করতে চায়। এ যেন জোর করে অন্যের জীবনে নিজের বোঁচা নাক ঠেসে দুর্গন্ধের খোঁজ করা।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.