সংগ্রামই যে শিশুর একমাত্র উত্তরাধিকার

জেসমিন চৌধুরী: বাংগালির জীবনই যুদ্ধের। রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক জীবনে যুদ্ধতো আছেই, সামাজিক আর ব্যক্তিগত জীবনেও অহর্নিশ যুদ্ধ চলছে। হুঁশ হবার পর থেকে সবার মত লড়ছি আমি নিজেও পারিপার্শ্বিকতার সাথে, আশেপাশের মানুষের সাথে, এমনকি নিজের সাথেও। তাই রক্তারক্তি ছাড়া যুদ্ধ দেখলে মুগ্ধ হই।

14247655_10154568038394850_2102441296_oযুদ্ধ থেকে বিরতি নিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিলাম সমুদ্রের হাওয়া খেতে, জীবন থেকে দু’টো দিন পালিয়ে থাকতে। কিন্তু কে জানতো সেখানে গিয়ে দেখবো আমার বিলাসবহুল বিশ্রামাগারেও আরও কারও জীবনযুদ্ধ চলছে? তদুপরি যখন দেখলাম সেই যোদ্ধারা হচ্ছে কচি কোমলমতি শিশুরা যারা নিজ সিদ্ধান্তে লড়তে আসেনি, জন্মেই দেখেছে ক্ষুব্ধ যুদ্ধভূমি, তখন ছুটি কাটানোর স্বস্তি অনেকটাই উবে গেল।

ইনানি বীচে যাব, হোটেল থেকে একটা রংচংগা টমটম ডেকে দেয়া হলো। উঠে বসে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলাম, কী সুন্দর! সদ্য তারুণ্যে পা দেয়া স্মার্ট ড্রাইভার ইউএসবি স্টিক থেকে গান চালিয়ে দিল। টমটমের যান্ত্রিক আওয়াজ ছাপিয়ে উঠলো অপরিচিত পুরষ কন্ঠের অপরূপ মুর্ছনা,  ’তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়?’ এই কবিতাটাকে কেউ গান করেছে, জানতাম না। ঝকমকে রোদেলা দিন, সমুদ্রের প্রাণ জুড়ানো বাতাস, চারদিকে নয়নাভিরাম সবুজ, পাশে বসা ভাললাগার কাছের মানুষটা। জীবন এতো সুন্দর!  

কিছুদূর যেতেই চোখ পড়লো পথের পাশের ছাপড়া দোকানের সামনে সাজিয়ে রাখা সিংগাড়ার স্তুপ। পাশেই ভাজা হচ্ছে আরো গরম গরম খাবার দাবার। নেমে পড়লাম চা সিংগাড়া খেতে। চা এনে দিল আট/দশ বছরের এক শিশু। শিশুদের কাজ করতে দেখলে আমার মিশ্র অনুভূতি হয়। এই বয়সে তার স্কুলে যাবার কথা ছিল, হেসেখেলে বেড়ানোর কথা ছিল, অথচ তাকে কাজ করতে হচ্ছে। আবার ভাবি, কিছু একটা করে খেতে শিখছে তো, তাইবা কম কি? কিন্তু তাদের কাছ থেকে সেবা নিতে অস্বস্তি হয়, অপরাধ বোধ হয়। এক ধরনের মানবিক এবং আবেগিক বিলাসিতা আর কী! নিজের বিবেকের স্বাস্থ্যকে আরেকটু সরেস করে নেবার আনন্দ।

ছেলেটা প্লেটে করে সিংগাড়া কাঁচামরিচ নিয়ে এলে তাকে আমাদের পাশে বসে খাবার আমন্ত্রণ জানালাম। কাউন্টারে বসা ভারিক্কি চেহারার মালিকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সে না-সূচক মাথা নাড়ল। আরো কয়েকবার বলার পরও যখন তাকে সিংগাড়া খেতে রাজী করানো গেল না, আমি মালিককে ডেকে বললাম, ‘কী বিষয় ভাই, আপনাকে এতো ভয় পায় কেন? মারধর করেন নাকি?’

উত্তরে একগাল হেসে তিনি বললেন, ‘না মাইরলে কি কাম-কাজ করবো? মাঝে-মধ্যে দুই-চারটা মারি’। তখন ঘটনাটা বুঝা গেল। তিনি ছেলেটার পিঠে কষে একটা থাপ্পড় বসিয়ে বললেন, ‘খাইতে কইতেসে খা, কথা শুনসনা ক্যান?’

14247961_10154568040914850_1558218813_oআরেকজন কাস্টমার জানালেন, ছেলেটার নাম বেলাল, বাবা মারা গেছে ছোটবেলায় এবং মা চলে গেছে আরেক লোকের সাথে। সেই থেকে সে এই দোকানের মালিকের বাড়িতেই থাকে এবং দোকানের কাজ কর্ম করে। বেলালের জীবনের গল্প শুনতে শুনতে সিংগাড়া দলা বেঁধে আমার গলায় আটকে যেতে লাগলো। চোখের সামনের চায়ের কাপ ঝাপসা হয়ে এলো।

বেলালের সাথে সৈকত নামের আরেকটা ছেলে কাজ করছিল যার ভাগ্য অপেক্ষাকৃত ভাল। তার মা-বাবা আছেন এবং সে সকালে স্কুলে যায়, বিকালে কাজ করে। দেখা গেল আমার কথাবার্তায় দোকান মালিক এবং কাস্টমাররা বেশ আমোদিত হয়েছেন। এই সুযোগে মালিকের সাথে আরো খানিকটা ভাব করে নিয়ে তাকে অনুরোধ করলাম, বেলালকে যেন সকালবেলা সৈকতের সাথে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তিনি কথা দিলেন করবেন। এই প্রতিশ্রুতি শুনে বেলাল হেসে ফেললো, রোদেলা সকালটা আরো বেশি ঝলমলে হয়ে উঠলো।

বেলালের সাথে পরিচয়ের পর যেখানেই যাই আমার চোখ বেলালের মতো শিশুদের খুঁজতে থাকে, খুব বেশি খোঁজার প্রয়োজন হয় না অবশ্য। ইনানী বীচেই দেখা হয়ে যায় শিশু শ্রমিক ওসমানের সাথে। আমরা পানিতে নামব, কাপড় জুতা ব্যাগ কী করবো ভেবে পাচ্ছি না, এমন সময় ছেলেটা লাজুক মুখে এসে বলল, ‘আপনেরা নামেন, আমি দেইখা রাখব’।

আজকাল কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু ছেলেটার চোখে মুখে এমন একটা কিছু ছিল যে তাকে বিশ্বাস করতে আমাদের একমুহুর্তের জন্যও দ্বিধা হলোনা। সারাদিন সে আমাদের পেছন পেছন ঘুরল, অনেক গল্প করল। সে সকালে স্কুলে যায়, দুপুরের পর বীচে এসে যার জন্য যা পারে কাজ করে। ওসমানের মা বাবা আছে, তারা চায়না সে কাজ করুক কিন্তু গরীব মায়ের হাতে টাকা তুলে দিতে তার ভাল লাগে। সন্ধ্যা বেলা বিদায় নিয়ে আসার সময় ওসমান আমাদের ছুটে যাওয়া টমটমের দিকে ক্ষুধিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল , ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলাম আমিও, ঘনিয়ে আসা গোধূলির আঁধারে তার অনড় সিলুয়েট মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত।

14248051_10154568038924850_1733464841_oসেদিন রাতে লাবণী বীচের কাঠের চেয়ারগুলোর একটায় বসে চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখছি আর ঢেউ গুনছি, একটু পরেই একটা ছোট্ট ছেলে ছুটে এলো চেয়ারের মালিকানা জানান দিতে। তার নাম ইমন। ইমন শব্দটার মানে জানে কি’না জিজ্ঞেস করে তাকে বিভ্রান্ত করে দিলাম আমি, কিন্তু মানে বুঝিয়ে বলতেই খুশীর হাসিতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। একটু পরপর এসে খোঁজ নিচ্ছিল কিছু লাগবে কি’না। তখন ভরা জোয়ারের সময়, ঢেউ কাছে আসতে আসতে প্রায় পায়ের কাছে এসে আছড়ে পড়ে চোখমুখ ভিজিয়ে দিচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ করেই চাঁদমামা বিদায় নিলেন, টুপ টাপ বৃষ্টি পড়তে শুরু করল। কিন্তু ইমনের জ্বালায় একসাথে ঢেউ আর বৃষ্টির পানিতে ভেজা হলোনা। সে ছুটে এসে চেয়ারটা সরিয়ে দিল, মাথার উপরে ছাতা লাগিয়ে দিল।

ফাঁকে ফাঁকে বললো তার জীবনের গল্প। চেয়ারগুলার ইজারা তার চাচার, কিন্তু চাচা বড়লোক হলে কি হবে, তার বাবাতো গরীব তাই তাকে কাজ করে খেতে হয়, তবে সকাল বেলা স্কুলে যায় সে। সেদিন তার অংক পরীক্ষা ছিল, পরীক্ষা ভালই হয়েছে বলে জানালো ইমন।

পরদিন হিমছড়ি যাবার পথে ছোট একটা পাহাড়ি ঝরনা দেখে ছবি তুলার জন্য নেমে পরিচয় হলো জেসমিন আর মোহাম্মদ রাশেদের সাথে, বয়স বড়জোর আট/দশ। শুধু রাশেদ লিখলাম না, কারণ সে খুব গর্বের সাথে তার পুরা নামটা উচ্চারণ করেছিল। তাদের দু’জনের মাথায়ই ছিল বড়সড় জ্বালানী কাঠের বোঝা। আমার নামও জেসমিন শুনে মেয়েটা হেসে ফেলল। বোঝা বইতে কষ্ট হয় কি’না জিজ্ঞেস করলে দু’জনেই জোরে সোরে এদিক ওদিক মাথা নাড়ল। ওজন দেখার জন্য রাশেদের বোঝাটা আমি মাথায় নিতেই দু’জনে হেসে কুটিপাটি। আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি কমপক্ষে দশ কেজি ওজন ছিল বোঝাটার, কিন্তু ছোট্ট ছেলেটা হাসিমুখেই বয়ে নিয়ে যাচ্ছে মায়ের জন্য।

14285738_10154568038639850_2020086274_o 14303784_10154568039219850_1224773620_oএছাড়াও ঢাকায় এবং সিলেটে পরিচয় হলো সব্জি বিক্রেতার সহযোগী ইমরান, ডাব বিক্রেতা পল্লব তালুকদার, আর ফুল বিক্রেতা চুমকির সাথে। চুমকি বেশ রাতে বেলি ফুলের মালা বিক্রি করছিল স্টার কাবাবের সামনে।

আমি তার সবগুলো মালা কিনে নিয়ে বললাম, ‘এতো রাতে বাইরে কেন তুমি, বাসায় যাও’। ওমা, একটু পরেই দেখি সে একঝাঁক বেলুন হাতে সেই একই যায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে তার মুখে দুষ্টুমির হাসি খেলে গেল। বেইলি রোডের এক কাপড়ের দোকানে পরিচয় হলো মিলন নামের এক শিশু যোদ্ধার সাথে। দোকানের মালিকের হাতে মিলনের বই আর কাপড় কেনার জন্য কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে অনুরোধ করলাম তার পড়ার ব্যবস্থা করতে। তিনি লজ্জিত মুখে বললেন, ‘আপা আমরা এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি তাই এসব কথা ভাবিনা। কাপড় কিনতে এসে আপনি তাকে নিয়ে ভাবলেন দেখে লজ্জা পেলাম। অবশ্যই এখন থেকে সে স্কুলে যাবে’।

দেশে গিয়ে নতুন পুরোনো অনেক বন্ধুদের সাথে, অনেক আত্মীয়ের সাথে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সাথে দেখা হয়েছে, কিন্তু সব ছাপিয়ে আমার মন জুড়ে আছে এই শিশুগুলি। হয়তো আর কখনো তাদের সাথে আমার দেখা হবেনা, কিন্তু আমি তাদেরকে বুকের ভেতর করে নিয়ে এসেছি। তাদের মধ্যে যে সততা, নিষ্ঠা আর পরিশ্রম স্পৃহা দেখেছি তা বড়দের মধ্যে দেখিনি। তবে এই শিশুদের দেখে আমার একবিন্দুও করুণা হয়নি। আমি এদের মধ্যে এক অপরিসীম ক্ষমতা দেখেছি। আমাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে সংগ্রাম ছাড়া কিছুই পায়নি এরা, অথচ হাসিমুখে লড়ে যাচ্ছে।

ঝড়, বৃষ্টি, রোদ এবং নিরাপত্তার অভাবকে উপেক্ষা করে সর্বক্ষেত্রে বড়দের পাশাপাশি জীবন সংগ্রামে লিপ্ত এসব শিশুদের দেখলে অনেক ভাবনা মাথায় এসে ভীড় করে। দিনের আলোয় জীবন সংগ্রামে লিপ্ত পথে ঘাটে ছড়িয়ে থাকা এসব শিশুদের সার্বিক বিকাশ নিয়ে ভাবি। দু’মুঠো পেটের ভাতের নিশ্চয়তা খুঁজতে গিয়ে খেলার সময়ের সাথে সাথে তাদের জীবন থেকে শৈশব আরো কতভাবে হারিয়ে যাচ্ছে কে জানে?

অবশ্য আশার কথা হচ্ছে শিশু শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি যাদের সাথে কথা বলেছি তাদের মধ্যে দু’জন ছাড়া সবাই স্কুলে যাচ্ছে, বাকি দু’জনের অভিভাবকরাও আমাকে কথা দিয়েছেন তাদের স্কুলে পাঠাবেন। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘চিল্ড্রেন শুড বি সিন এন্ড হার্ড’। আমি আমার পাঠকদেরকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরকে আরো বেশি মনোযোগ দেবার অনুরোধ করবো। এদের সংগ্রামে হাত মেলাতে যদি আমরা এগিয়ে আসি, প্রতিটি সচেতন মানুষ যদি একটি করে শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে হয়তো তাদের জীবনযুদ্ধ কিছুটা সহজ হয়ে উঠবে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.