জ্বলতে দে তোর আগুনটারে, ভয় কিছু না করিস তারে…

সাদিয়া নাসরিন: ওরা জিতে ফিরে এসেছিল। বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে এসেছিল ওরাশিরোপা জেতার আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল। বলছিলাম এএফসি অনুর্ধ ১৬ বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে স্থান করে নেয়া বাংলাদেশের কিশোরী ফুটবলারদের কথা। বাফুফে ওদের একা ছেড়ে দিয়েছে। তাদের উঠিয়ে দিয়েছে একটা লোকাল বাসে সকাল আটটার দিকেধর্ষণোম্মুখ পুরুষবেষ্টিত এই দেশে নিরাপত্তাহীন এক অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে মেয়েগুলো লোকাল বাসে সারাদিন ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি পৌঁছেছে তিনটারও পর। ওদের হাতে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা।

ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো, খেয়ে না খেয়ে বেড়ে উঠা মেয়েগুলো নাকি এসি বাসে চড়তে সাচ্ছন্দ্য(??) বোধ করে না!!! অথচ কী তুমুল সাচ্ছন্দ্য আর আত্মবিশ্বাস নিয়েই না এই মেয়েগুলো এসি বিমানে চড়ে বিদেশের মাটিতে হোটেলের এসি রুমে থেকে একের পর এক জয় ছিনিয়ে নিল! ফুটবলের মতোই লাথি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আসলো মৌলবাদ-হিজাব আর ধর্ষণ আক্রান্ত বাংলাদেশের সকল কুপমণ্ডকতা।  

football-3ময়মনসিংহ থেকেও আড়াই ঘণ্টার দূরত্বের এক সীমান্তবর্তী অজ পাড়াগাঁয়ের নাম কলসিন্দুর। প্রবল দারিদ্র, কুসংস্কার, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শাসন, পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একদিন সমস্ত শক্তি এক করে ফুটবলে লাথি মারা শুরু করেছিলো কলসিন্দুর এর একদল কন্যাশিশু। সেই মেয়েগুলো আজ ফুটবল খেলে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। না, এতো সহজ ছিলো না এই রাস্তাঅনেক খানা-খন্দ-বাধা অতিক্রম করে সাফল্যের সেতু তৈরি করে গেছে এই মেয়েরা।

অপ্রতিরোধ্য  সাহস  আর স্বপ্ন নিয়ে এই মেয়েদের তৈরি করছিলেন মফিজ উদ্দিন নামের এক জাদুকর। মাঠে নেমে এসেছিলেন তিনি। অপুষ্ট শরীরের একদল মেয়েকে তিনি দিয়েছিলেন পায়ের শক্তি। দিনের পর দিন পরম মমতা দিয়ে তৈরি করেছেন ফুটবলার হিসাবে। মাত্র পাঁচ বছর আগে ফুটবল খেলা শুরু করেছিল এই শিশুরা। বঙ্গমাতা স্কুল টুর্নামেন্ট দিয়ে এদের শুরু। তারপর থেকে জেতাটা আসলে ওদের অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো।

গত চার বছরে শুধুই সাফল্যে ভেসেছে এই মাটির দেশে সোনা ফলানো মেয়েরা। গত বছর এপ্রিলে নেপালের এএফসি  অনুর্ধ ১৪ টুর্ণামেন্টের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে ১৮ সদস্যের বাংলাদেশ দলে একসঙ্গে খেলার সুযোগ পায়  কলসিন্দুরের ১০ কন্যা গ্রুপ পর্বে তারা ভারতের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র এবং ভুটানকে হারায় ১৬-০ গোলের ব্যবধানে। সেমিফাইনালে ইরানকে ২-০ গোলে হারিয়ে স্বাগতিক নেপালের বিপক্ষে ফাইনাল খেলার সুযোগ হয়। কিন্তু নেপালে কয়েক দফা ভূমিকম্পের জন্য ফাইনাল খেলা স্থগিত হয়। কলসিন্দুরের মেয়েদের আরও একটি বড় সাফল্য ২০১৪ সালে জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া।

এই মেয়েরা আজ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে চমকে দিয়েছে গোটা বিশ্ববাসীকে। কিছুদিন পরেই এই মেয়েরা লড়বে এশিয়ান শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের রঙ্গমঞ্চেহয়তো এখানেই তারা থেমে থাকবে না। একদিন তারা বিশ্বকাপেও খেলবেসেই হীরের টুকরো মেয়েগুলোর এই অনাদর কি শুধু মেয়ে বলেই? শিরোপা জিতে ফিরেছে বলেই শুধু নয়। যেকোনো খেলোয়াড়কে, বিশেষ করে নারী খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা আর পরিবেশ দিতে বাধ্য নয় কি দেশের ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলো? এই দুর্বিনীত দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং  অসংবেদনশীল আচরণের জন্য বাফুফের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা কি নিবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়?

নয়জন কিশোরি মেয়ে এই অনিরাপদ নগরে সম্পূর্ণ একা লোকাল বাসে টিজড হতে হতে, গালিগালাজ শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরেছে। বাড়ি ফিরেই ওরা শুনেছে শিক্ষক জুবেদ আলীর গগণ বিদারী হুমকি, “আর কোনদিন স্কুলে পড়া তো দূরের কথা, নাম নিলেই ওদের জুতাপেটা করে দাঁত ভেঙে দেওয়া হবে”  দ্বিতীয় গোলরক্ষক তাসলিমার বাবা সবুজ মিয়াকে মারা হয়েছে প্রকাশ্য বাজারে।

football-4জুতোপেটা করে দাঁত ভেঙ্গে দেয়া হবে!!! অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে স্থান করে নেয়ার এই পুরষ্কার!!! এতো অবাক হবার কী আছে তাতে? এরকমই হবার কথা ছিল না কি? এ দেশের মেয়েরা হলো খরচের জীবনের বাহক মাত্র। চাহিবামাত্র গ্রাহককে দিতে বাধ্য থাকে যে জীবন। সে জীবনে এসি বাসের সাচ্ছন্দ্য !! আপোষের জীবনে সম্মানের আশা !!! না, ঠিক যায় না।

মেয়ে, তুমি কি একটু জিতে এসেছ বলে জুবেদ আলী নামের একজন পুরুষের আদেশ অমান্য করে ঢাকায় সংবর্ধনা নিতে যেতে চাও! এতো বড়ো সাহস তোমার! আস্ত পুরুষ মানুষের ফুটবল দল যখন  নিচে নামতে নামতে তলানিতে চলে যাচ্ছে, মালদ্বীপের কাছে পাঁচ গোল খেয়ে আসছে, ভুটানের সাথে নিজের মাঠে ড্র করছে, ঠিক সেই সময় মেয়ে তোমরা কেন জিতে যেতে লাগলে একের পর এক? জিতলেই যদিবা, সে নিয়ে কী আছে এতো বাড়াবাড়ির?

শোন মেয়েরা, বাফুফে তোমাদের একা ছেড়ে দিয়েছে। লোকাল বাসে অপমানিত হতে হতে বাড়ি  ফিরেছফিরেই নিজের বাবাকে অপমানিত হতে দেখেছ। মনে রেখো, তাতে কিছু এসে যায়নি তোমার জীবনে। কেউ কিছু সুবিধা কম দিল বলে থেমে যাবে না জীবন তোমার। আগুনটা শুধু জ্বালিয়ে রাখো। তোমার জীবন রুখে এমন সাধ্য কার?  টিসি দেয়ার ভয় দেখিয়েছে বলে তোমরা মাথা নিচু করে মেনে নাওনি সব। তোমরা মেনে নাওনা। মেনে নেয়নি সাঁতারু মাহফুজা, অ্যাথলেট মাবিয়াও। কারণ, তোমরা শিখে গেছ, এই নিরন্তর একলা যুদ্ধে কিভাবে স্রোতের বিপরীতে জয়ের তরী ভাসাতে হয়।

মেয়ে, তোমাকে তো জিততেই হয় ঘরে-বাইরে আমরণ যুদ্ধে। যুদ্ধ না করে কিচ্ছু পাবে না তুমি এই পৃথিবীতে।  তোমাদের উত্যক্ত করা হবে, শাসানো হবে, রক্তচক্ষু দেখানো হবেতবু তোমরা জিতবে। তুমি যতবার জিতবে, ততবার হেরে যাবে তোমার সামনে আসমান জমিন আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষতন্ত্র, যারা আজ তোমাদের টিজ করেছে, গালাগালি করেছে। তুমি যতবার জিতবে, ততবার হেরে যাবার ব্যাথায় তারা কাতর হবে, চিৎকার করবে, ছটফট করবে। আর এই ফাঁকে তুমি আরো এগিয়ে যেতে থাকবে আলোর মিছিলে। তোমরা খেলায় হারতে পারো, কোন টুর্নামেন্ট হাতছাড়া হয়েও যেতে পারে, কিন্তু জীবনের কাছে তোমরা আর হারবে না মেয়ে। জেনে রেখো, জেতাই তোমাদের নিয়তি।

আমরা জেনে গেছি তোমাদের দু’পায়ের শক্তি। বছরের পর বছর ধরে যখন আমাদের এই দেশটা চলে যাচ্ছিল ধর্ম ব্যবসায়িদের হাতে, মহামারির মতো ছড়িয়ে যাচ্ছিল ধর্ষণোম্মুখ হিংস্র পুরুষ শ্বাপদের আঁচড়, ঠিক তখন এই তোমরাই লাথি মেরে ফুটবলের সাথে উড়িয়ে দিয়েছ যত ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার এবং প্রতিক্রিয়াশীলতাএমন একদিন আসবে যেদিন তোমরা ঘুরে দাঁড়িয়ে ওই কটুক্তি করা গালাগাল করা লোকগুলোর নাকশা ভেঙ্গে দিয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে বাড়ি ফিরবে।

তোমাদের পায়ের শক্তি দেখে একদিন নিজেদের পায়ের শেকল ভাঙবে এদেশের অগুনতি শৃঙ্খলিত নারী। নারী জন্মের গ্লানি, শরীর নিয়ে গ্লানি কাটিয়ে নারীরা বের হয়ে আসবে মুক্তির পথে। অতএব, চ্যালেঞ্জ করো মেয়ে।  তোমাদের পায়ের জোর এবং শক্তি একদিন উড়িয়ে দেবে মানুষের ভেতরের সকল বৈষম্য। আমি জানি, নারী-পুরুষের সমতার বিশ্ব গড়ে তুলবে তোমরাই।  যুদ্ধটা টিকিয়ে রাখো, আর জিততে থাকো আমরা অপেক্ষায় আছি।

প্রধান নির্বাহী, সংযোগ বাংলাদেশ

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.