জয় তবে নারীরই হোক

2

লীনা পারভীন: নারীর জয়!! এ আবার কেমন খায়েশ? নারীদের আবার জয়ের আকাঙ্খা কেন? কী জয় করতে চায় এইসব অবরোধবাসিনীরা? হাহহাহহাহা, কিছুদিন আগ পর্যন্ত আমরা নারীরাও চাইতে পারিনি বা বলতে পারিনি আমি কী চাই? কী জয় করতে চাই বা কেনই বা চাই? কোথায় কীভাবে জয় করতে হবে?

কেউ কী কোন জনমে এই পোড়া বাংলাদেশে যেখানে নারী মানেই ঘোমটা টানা কলসী কাঁখে লাজুক মুখের একটি মেয়ের ছবি দেয়া হতো ক্যালেন্ডারের পাতায়, ভেবেছিলো এই দেশের মেয়েরাও মাঠে দৌড়াবে? দাপটে বেড়াবে খেলার মাঠ, প্রতিযোগিতা করবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মেয়েদের সাথে? আমি হলপ করে বলতে পারি, আমরা কেউই ভাবিনি বা কল্পনাও করিনি। কিন্তু আজ সেটাই সত্যি। আমাদের দেশের মেয়েরা বেরিয়ে এসেছে খোলস ছেঁড়ে। শাড়ীর লম্বা আঁচল সামলে আজ তাড়া দৌড়ের উপর রেখেছে বাঘা বাঘা দেশের নারীদের, যারা পোষাকে, বেশভূষায়, লেখাপড়ায় এমনকি সবরকম সুযোগ সুবিধার দিক থেকে আমাদের থেকে যোজন যোজন পথ এগিয়ে।

Football 1আসলে আমি এতোটাই আপ্লুত যে যা বলতে চেয়েছিলাম, তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমি আপ্লুত আমাদের বোনদের নিয়ে। আমি আবেগে কেঁদে ফেলি যখন দেখি আমার ছোট ছোট বোনেরা, কন্যারা গ্রামের মাঠঘাট ছেঁড়ে বেড়িয়ে এসেছে রাজধানীর বুকে দাপট দেখাতে।

আমাদের নারী ক্রিকেট দল বলেন, আর ফুটবল দল বলেন, এদের কেউই কিন্তু শহুরে হাওয়ায় বেড়ে উঠেনি, তথাকথিত এগিয়ে থাকা স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা পা রাখেনি, তাহলে ক্যামন করে তারা আমাদের থেকে এতো এডভান্স চিন্তা করতে পারলো? এটি আমার কাছে এখনো বিস্ময়ের এবং অবাক করা এক বিষয়।

যে সময়টাতে আমরা দেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন, সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন এমনকি নারীর অবাধে চলাফেরা নিয়েও কখনো কখনো আমরা চিন্তায় ভেঙ্গে পড়ি, ঠিক সে সময়টাতেই আমাদেরকে আশার আলো দেখায়, স্বপ্নের মাঝে নিয়ে যায় আমাদের নারী ক্রীড়াবিদরা। অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবলারদের মাঝেই আমি আমার মুক্তির রাস্তা দেখতে পাই।

ছোটবেলা থেকেই আমরা শুনে এসেছি একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর নারীদের লাফানো নিষেধ। কারণ জানতাম না, কিন্তু আমি নিজেও এইসব বাধার মধ্য দিয়েই এসেছি। মনে আছে, আমি খুব লাফানো টাইপ মেয়ে ছিলাম। ছোটবেলায় দাঁড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, ব্যাডমিন্টন, ডাঙ্গুলি, দড়ি লাফ, ক্রিকেট, ফুটবল, সাতচাড়াসহ নানা রকম খেলায় মত্ত থাকতে পছন্দ করতাম। খেলার সাথীদের মধ্যে কখনো মেয়ে কখনো ছেলদের দল। বেশীরভাগই ছেলেদের খেলা পছন্দ করতাম। ঠিক যখনই আমার মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হলো, মায়ের কড়া নিষেধ এলো আর লাফালাফি করা যাবে না।

এরকম একটি বিধিনিষেধের সমাজে আমাদের মেয়েরা ফুটবল, ক্রিকেটের মতো শারীরিক কসরতের খেলা খেলছে, মাঠের এ মাথা ও মাথা দৌড়ে বেড়াচ্ছে, এ কী কম পাওয়া?

দুই এক বছর আগে তো আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, আমাদের দেশে নারীদের চলাফেরা, এমনকি চাকরি বাকরি করাটাও মনে হচ্ছে সংকুচিত হয়ে যাবে। বিভিন্ন ইসলামী দলগুলি যেভাবে নারী বিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে বেড়ায় আর আমাদের ক্ষমতাসীন দলগুলির মাঝে মাঝে আপোষকামী মনোভাব আমাদেরকে কখনই সেই শংকা থেকে বেরিয়ে আসতে দেয় না।

আজকের নারীদের এই জয় তাদের চর্বিওয়ালা গালে বিরাট আঘাত। কোন হূমকি যে নারীর এগিয়ে যাওয়াকে টেনে ধরতে পারে না, আজকের এই জয় তারই নিশ্চয়তা। খেলার মাঠে তারা কোন দেশকে কত গোল দিয়ে আজকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ২০১৭ এর এ এফ সি কাপে এন্ট্রি নিয়েছে, সে সবার জানা, আমি সেই পরিসংখ্যান দিয়ে তাদের মূল্যায়ন করতে চাই না। সেটা খেলোয়াড়দের কৌশলের বিষয়, সে প্রশংসা না হয় নাই বা করলাম।

Football 2একটা সময় আমরা নারী ক্রীড়াবিদ বলতে জানতাম রানী হামিদকে, জোবায়দা লীনুসহ হাতে গোনা কয়েকজন, যাদের কেউ দাবা, কেউ বড়জোর টেনিস পর্যন্ত। ফুটবল আর ক্রিকেট হচ্ছে পুরামাত্রায় শারীরিক খেলা, যেখানে নারীর শরীরের কোন রাখঢাক রাখার ব্যাপার নাই, আর দর্শক সারিতে বসে থাকে আপামর জনতার অংশ। আমি তো মনে করি এতে করে আমাদের দেখার দৃষ্টিও পরিবর্তন হচ্ছে। চোখ অভ্যস্ত হচ্ছে নারীর শরীরের অংশ দেখার চেয়ে খেলার কৌশল দেখায়। এভাবেই আসবে সামাজিক সচেতনতা আর মগজে আসবে পরিবর্তন।

লেখা লিখতে গেলে শেষ করা যাবে না, আমি এতোটাই আবেগে আছি। তবে সেইসব মেয়েদের পিতামাতা এবং আত্মীয়স্বজনদের যদি সম্মান না দেখানো হয় তাহলে সে আবেগ অনেকটাই ফ্যাকাশে হয়ে যায়। আমি প্রথম বাঁধা পেয়েছিলাম আমার মায়ের কাছ থেক, ঠিক একইভাবে যদি এইসব ডানপিটে মেয়েদের মা তাদেরকে আঁটকে দিত তাহলে কোথায় পেতাম আমারা আজকের এই দিন?

পরিবার হচ্ছে যে কোন পরিবর্তনের প্রথম পাঠশালা। আমি কীভাবে আমার জীবনকে দেখবো সেই শিক্ষা প্রথমেই আমরা পাই পারিবারিক আবহ থেকে। তাই পরিবারের মানষিকতাটাই প্রাথমিক ভিত তৈরী করে।

নারী মুক্তি বা নারীর অধিকার আসবে সেই পরিবর্তিত পরিবার থেকেই, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র। বড় বড় বুলি ছাড়া আর রাস্তায় বিশেষ দিনে ব্যানার নিয়ে দাঁড়ালেই নারীর যোগ্যতম স্থান চলে আসেনা। আর মগজে বা মননে পরিবর্তন আনার জন্যও চাই এই ধরনের পরিবারকে সামনে নিয়ে আসা। তারুণ্যের সামনে এইধরনের উদাহরণকে আলোকপাত করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তারুণ্য আজকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে, কিন্তু কেন হচ্ছে? তার কারণ খুঁজে বের করে সমাজে যেসব ভালো উদাহরণ আছে সেগুলিকে তুলে ধরতে হবে। নারীর সাফল্যকে শুধু কথায় স্বীকৃতি দিলেই হবে না, তাদের বেড়ে উঠার জন্য নিশ্চিত করতে হবে সমস্তরকম সুযোগ সুবিধার।

ক্রীড়াক্ষেত্র থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই নিশ্চিত করতে হবে নারীর উপযোগী পরিবেশ, যাতে করে আমাদের পিতামাতা তাদের মেয়েদেরকে সমাজের বুকে ছেঁড়ে দিতে পারে স্বাচ্ছন্দে, আর নারীরাও জেগে উঠবে তাদের আপন শক্তিতে। উজ্জ্বল করবে দেশের মুখ, দশের মুখ।

লেখাটি ৪১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.