আমি রিশাকে নিয়ে লিখতে চাইনি

শাশ্বতী বিপ্লব: রিশাকে নিয়ে লিখবো না ভেবেছিলাম। কতই তো লিখলাম, তনুকে নিয়ে, সুমাইয়াকে নিয়ে, আফসানাকে নিয়ে, কী লাভ হলো? রিশার প্রতিও ভয়ানক অন্যায় হয়েছে। তবুও আমি রিশাকে নিয়ে লিখতে চাইনি। কেন?

কারণ ওবায়েদ ধরা পড়বে আমি জানতাম। ওবায়েদের পেশী বা অর্থের জোর নেই। তার উপর, সে তার চেয়ে চাইতে উঁচু তলার মানুষকে আঘাত করেছে। ধর্ষণের চাইতেও এটা গর্হিত অপরাধ। যেমন, গরীব মাদ্রাসার জঙ্গির জন্য আমাদের নিঃসঙ্কোচ ঘৃণা থাকলেও তাহমিদের পক্ষে দাঁড়ানোর লোকের অভাব নেই।

Screenshot_2016-09-02-20-38-51অপরাধের সাথে গুলিয়ে যায় আমাদের শ্রেণী অহম। সেদিন এক নারী নেত্রীকে বলতে শুনলাম, “সাহস কত বড়! আরে তুই তোর লেভেলের দিকে তো তাকাবি। ওই মেয়ের দিকে তুই তাকাস কোন সাহসে!” ওয়াবেদ নিম্নবিত্তের কোন মেয়েকে একই কারণে হত্যা করলে শোরগোল কম হতো, আমি নিশ্চিত। ওবায়েদকে ধরা পড়তেই হতো।

কিন্তু রিশাকে নিয়ে না লিখে আর থাকতে পারলাম না। একটি বিশেষ স্ট্যাটাস আমাকে শান্তি দিচ্ছে না কিছুতেই। এই যে এতো ধর্ষণ, এতো মৃত্যু, এতো প্রতিবাদ – আমরা ভাবি বেশ বদলাচ্ছে সমাজ।

মানুষ সচেতন হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো ধর্ষকামী, মর্ষকামী মানুষ ছড়িয়ে আছে আমাদের আশেপাশেই। যাদের মনে জমে থাকা অন্ধকারের ছিটেফোঁটা দেখলেও আঁতকে উঠতে হয়।

রিশা ও তার এক সহপাঠীর ছবি নিয়ে Kh Raihan নামের ঢাকাবাসী টাঙ্গাইলের এক যুবক লিখেছে,

“আচ্ছা এই দুইটার মধ্যে মরছে কোনটা aaa?

যেটাই মরুক আমার ক্রাশ কিন্তু দুইটাই….কেউ আমারে প্রথমটার নাম্বারটা দেনা? পরবর্তি ঘটনাটা না হয় আমিই ঘটাবো নি”

কী নির্লজ্জ, কী কুৎসিত বাহাদুরী! কী নির্মম কামনা! লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক তরুণ তার এই ধর্ষকামী মানসিকতা প্রকাশ করেছে! সে এটাকে বীরত্ব মনে করেছে!

মৃত্যু তাহলে কাম-বাসনাও জাগায় তরুণ মনে! আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে চাই এটা শুধুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারি না। কে জানে, এরকম কত তরুণ, যুবা বা বয়স্ক পুরুষে ভরে আছে আমাদের চারদিক?

প্রতিটি ধর্ষণ বা নির্যাতনের ঘটনা কি তবে আমাদের তরুণদের মনে একই রকম ঘটনা ঘটানোর মনোবাঞ্ছা তৈরি করে? আমাদের কিশোরেরা কি মনে রিরংসা নিয়ে বেড়ে ওঠে? সুযোগের সন্ধানে থাকে কোন মধ্যবয়স্ক পুরুষ বা আফসোসে দিন কাটায় কোন বিগতযৌবন বৃদ্ধ? যেমন পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে।

Screenshot_2016-09-02-20-39-55র্ষণের বিরুদ্ধে, হত্যার বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, নৃশংসতার বিরুদ্ধে, অনৈতিকতার বিরুদ্ধে সত্যি কতটুকু সচেতন হয়েছে আমার সমাজ? আমাদের এতো চিৎকার, এতো প্রতিবাদ সকলই তবে অরণ্যে রোদন কেবল!

স্মৃতি হাতড়ে মনে পড়ে ২০০৮ এর এক তিক্ত অভিজ্ঞতা। ঘটনাক্রমে গিয়েছিলাম একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে “নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা” নিয়ে কথা বলতে। তরুণ ঝকঝকে সব ছেলেমেয়ে, সবাই বিতার্কিক। তাদের সাথে কথা বলতে হবে আমাকে।

ততদিনে আমার ঝুলিতে প্রায় আট বছরের নারী অধিকার নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা। মাঠে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে মানুষের সাথে কথা বলা, কেস স্টাডি, ওয়ার্কশপ করা, ট্রেনিং দেয়া, কত কী। মনে অনেক আত্মবিশ্বাস। গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষগুলোকে যখন বোঝাতে পেরেছি, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরাতো বুঝবেই। আর ওরাতো এমনিতেই আলোকিত (!)। আমার আত্মবিশ্বাস বালির প্রাসাদের মতো ভেঙ্গে পড়তে সময় লেগেছে কয়েক মুহুর্তই।

অবাক হয়ে শুনলাম মানসিকভাবে কী তীব্র পুরুষ একেকজন, অবিকল তেঁতুল হুজুরের মতো। ধর্ষণের কারণ হিসেবে মেয়েদের পোশাককে দোষারোপ এবং পুরুষের ধর্ষণাকাঙ্খাকে জায়েজ মনে করে তারাও। আমি কথা হারাতে শুরু করলাম।

একেবারে বাকহীন হয়ে গেলাম যখন এক তরুণ একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো, ছেলেরা ধর্ষণ করলেই দোষ। আর মেয়েরা যখন ধর্ষণ করে তখনতো আপনাদের কিছু বলতে শুনি না।

আমি শুধু বলতে পারলাম, মেয়েরাও ধর্ষণ করে নাকি?

ছেলেটা বললো, করেই তো। আমার এক বন্ধুকে চারপাঁচজন মেয়ে ফোন করে উত্যক্ত করতো, ধর্ষণ করার ভয় দেখাতো। বারবার ফোন করে ডেকে নিয়ে ওই মেয়েরা তাকে ধর্ষণ করেছে।

আমি বললাম, তুমি কি করে জানলে?

আমাকে আমার বন্ধু বলেছে। ওর কত খারাপ লেগেছে জানেন?

আমার যা বোঝার বুঝে গেলাম। পাল্টা কোন উত্তর দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। বলতে পারলাম না, ধর্ষণ কোন খেলা নয়। স্বেচ্ছায় জেনে বুঝে ধর্ষিত হওয়া যায় না। সেটা বন্ধুদের কাছে গল্প করারও বিষয় নয়। এমনি আরো কত কথা আমি গিলে ফেললাম। অরণ্যে রোদন করে কি হবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া স্বচ্ছল, তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারের ছেলেদের মস্তিষ্কের অন্ধকার আমার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়ে দিলো। বাসায় ফিরলাম ভেজা চোখে, ভীষণ মন খারাপের অনুভূতি নিয়ে।

আজো বদলায়নি তবে কিছুই!! এটাই তবে আমার সমাজ….মগজভর্তি কামবাসনা নিয়ে যেখানে ঘুরে বেড়ায় দু’পেয়ে শ্বাপদ সারাক্ষণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তরুণ থেকে টাঙ্গাইলের এই তরুণ, একই অন্ধকারের স্রোত যাদের রক্তধারায়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.