মেয়েদের পোষাক: খোলাখুলি বনাম ঢাকাঢাকি

ড. সীনা আক্তার: অনেক গবেষণায় দেখা গেছে নারীর তুলনায় পুরুষ যৌনতা নিয়ে বেশী চিন্তাভাবনা করে। টেলিগ্রাফ পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়,  Journal of Sex Research এ প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুযায়ী পুরুষ প্রতিদিন ৩৪ বার এবং নারী ১৯ বার যৌনতা চিন্তা করে। বিবর্তনবাদী মনস্তাত্ত্বিক (evolutionary psychologist) Dr Diana Fleischman বলেন, ”পুরুষ অতিরিক্ত অনাকাংখিত ভাবনায় (যৌন) থাকে, তাদের পক্ষে যৌনচিন্তা উপেক্ষা করা খুব কঠিন। (Men have more intrusive thoughts, too – it’s harder for them to ignore thoughts about sex)”।

Child 1আমার পরিচিত কিছু পুরুষের কামজ মন্তব্যেও এ উক্তির সত্যতা লক্ষ্য করেছি; যেমন, নিজ কানে শোনা কম বিচ্ছিরি একটা উদাহরণ: এক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি তার ভিনদেশী নারী সহকর্মী সম্পর্কে বলেন ‘মেয়েটা দেখতে খুব সেক্সি, কিন্তু দাঁতগুলো এমন বিচ্ছিরি যে চুমু দিতে ইচ্ছে করে না’! মোটকথা, মেয়েদের দেখলে অনেক পুরুষের (সবাই না) মনে কামনা-বাসনা জাগ্রত হয়।

অধিকন্তু, বলা হয় অতি খোলামেলা, সংক্ষিপ্ত, আঁটসাঁট পোষাকে মেয়েদের দেখলে অনেক পুরুষের যৌন ভাবনার সূচনা (trigger) হয় এবং অনেকে বিনোদিত হয়। সংক্ষিপ্ত, খোলামেলা, আঁটসাঁট পোষাক বলতে যে পোষাকে শরীরের বিশেষ অংশ (private parts) দেখা যায় বা স্পষ্ট বোঝা যায়।

বিষয়টা আপেক্ষিক, মানে সমাজ-সংস্কৃতি ভেদে এর মাপকাঠি ও গ্রহনযোগ্যতা ভিন্ন। তবে উদার সমাজ ব্যবস্থায়, জনসমক্ষে মেয়েরা এ ধরনের পোষাকে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করে, কিন্তু এর জন্য তাদের সাধারণত কটুক্তি, যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয় না। এর কারণ ১. মেয়েদের যে কোন পোষাকে সেখানকার পুরুষরা দেখতে অভ্যস্ত; ২. পুরুষ নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং সম্মান করে, এবং ৩. যৌননিপীড়ন বিরোধী আইন ও এর প্রয়োগ। দুর্ভাগ্যজনক যে আমাদের দেশে এর প্রত্যেকটার ঘাটতি রয়েছে।  

অপরিচিত মেয়েদের দেখে কোন পুরুষের যৌনাভূতি হওয়াটা অস্বাভাবিক না, কিন্তু তার মানে এই না যে এজন্য সেই নারীর পোষাক দায়ী এবং তাকে যৌন নিপীড়ন করা জায়েজ। বরং পুরুষের আত্মসংযমের অক্ষমতাই যৌন নিপীড়নমূলক ঘটনার জন্য দায়ী। অনাকাংখিত যৌন ভাবনা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পুরুষের এবং সভ্য পুরুষরা তাই করেন।

সভ্য পুরুষ নারীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে না, বরং নিজেদের সামলায়ে মেয়েদের সাথে একসাথে পড়াশোনা, কাজকর্ম ও চলাফেরা করে। অন্যদিকে যৌনাভূতি নিয়ন্ত্রণে অক্ষম পুরুষেরা দৃষ্টিতে, ভাষায়, স্পর্শে এবং জবরদস্তি করে নারীকে নিপীড়ন করে; যে যেভাবে সুযোগ পায়। এই ইতর পুরুষেরা নিপীড়ন করেই থেমে থাকে না, উঁচু গলায় মেয়েদের পোষাক, চালচলনকে দোষারোপ করে নিজেদের কুকর্মের বৈধতা দাবি করে। আমাদের দেশে অনেক মেয়েই এ ধরনের পুরুষের লোভাতুর দৃষ্টির শিকার হয়, বিশেষ করে সংক্ষিপ্ত, খোলামেলা, আঁটসাঁট পোষাক পরা মেয়েরা। দুর্ভাগ্যক্রমে কেউ কেউ নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়।

Gender-inequality-in-US-02সারাবিশ্বেই মেয়েদের পোষাক আলোচনা-সমালোচনার একটা বিষয়। সংস্কৃতির প্রবহমানতায় আমাদের দেশে খুব অল্পসংখ্যক শহুরে মেয়েকে জনসমক্ষে অতি খোলামেলা, সংক্ষিপ্ত, আঁটসাঁট পোষাকে দেখা যায়। এ ধরনের পোষাকের পক্ষে কট্টর নারীবাদীদের যুক্তি হচ্ছে, এটা নারী স্বাধীনতা এবং প্রগতির বিষয়। কারো যুক্তি এতে নারীকে আকর্ষণীয় দেখায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, কার দৃষ্টিতে ঐ পোষাকে নারীকে আকর্ষণীয় দেখায়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই প্রশংসাটা আসে পুরুষের (স্বামী/প্রেমিক ব্যতীত) কাছ থেকে -মৌখিক অথবা অভিব্যক্তিতে। ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং প্রগতির নামে অনেক পুরুষও নারীর খোলামেলা-স্বল্প-আঁটসাঁট পোষাকের পক্ষে উচ্চকিত! এর কারণ, যৌনকাতর পুরুষের কূটকৌশল, দৃষ্টি দিয়ে নারীর শরীর উপভোগের চাতুরতা। পুরুষ শাসিত চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপন, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নারীকে এ ধরনের পোষাকে উপস্থাপনে এই কূটচাল লক্ষণীয়। স্পষ্টতই সেখানে পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বে নারীর পোষাক নিয়ন্ত্রিত এবং সেইসব পোষাকের অনুকরণ বাস্তবেও দেখা যায়।

পোষাক নির্বাচন অবশ্যই ব্যক্তির পছন্দ-অধিকারের বিষয়, তবে দায়িত্বশীলতার মাধ্যমেই অধিকার আসে।

জুনিয়র রকাফেলার উক্তিটি এখানে প্রাসঙ্গিক, তিনি বলেছেন- Every right implies a responsibility; Every opportunity, an obligation, Every possession, a duty (John D. Rockefeller, Jr.)। আমাদের দেশে, মেয়েদের পোষাকের ক্ষেত্রে দায়িত্বটি হচ্ছে আত্ম-সুরক্ষার দায়িত্ব, অন্য মেয়েদের প্রতি দায়িত্ব এবং সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি দায়িত্ব। দায়িত্বহীন স্বাধীনতা ভোগ মানে স্বার্থপরতা, যা সমাজ-সংস্কৃতিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

যেমন মেয়েদের পোষাকের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শের সাংস্কৃতিক স্বন্দ্ব-সংঘাত। এই সংঘাতে সৃষ্ট  অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ভুক্তভোগী আমাদের মেয়েরা। যেমন জনসমক্ষে নারীর প্রতি কটুক্তি, নিপীড়ন, সহিংসতা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কট্টর ধর্মীয় বলপ্রয়োগবাদীদের তৎপরতা।

কূটকৌশলে কট্টর নারীবাদী মতাদর্শকে ইস্যু করে কট্টর ধর্মীয় মতাদর্শের বিস্তারকে বেগবান করা। কট্টর ধর্মীয় পন্থীদের কাছে একমাত্র সামাধান নারীকে প্যাকেট করা, ঘরে বন্দি করা এবং বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা। যেমন ইতোমধ্যে মেয়েদের পোষাকে আমূল পরিবর্তন দৃশ্যমান, বিপুল সংখ্যক মেয়ে হিজাব-বুরকা পরে, এমন কি কিশোরী-শিশুদের হিজাব পরানো হয়। হিজাব-বুরকা প্রচারকদের ভাষ্য হিজাব মানে শালিনতা, পুরুষের নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা কিন্তু এই গৎবাধা দাবীর কোন ভিত্তি নেই। কারণ গবেষণায় দেখা যায় নারী এবং মেয়ে শিশু সর্বাধিক নিপীড়নের শিকার হয় নিজ পরিবারে, বিবাহিত নারী নিপীড়নের শিকার হয় স্বামী দ্বারা। হিজাব-বুরকা প্রচার, প্রসারের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে রাজনৈতিক, দল ভারী করার ও দেখানো ধর্মীয় রাজনীতি।

বলাই বাহুল্য, এই রাজনীতির নিয়ন্ত্রক পুরুষ। মেয়েরা মূলত হিজাব পরে ধর্মের নামে স্বজনদের হুমকি ও ভয়ে এবং নিজ গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হবার ভয়ে। ভয় দেখিয়ে, লোভ দেখিয়ে, নিয়ন্ত্রণ করে কাউকে কিছু করানো মানেই নিপীড়ন।

girls 3সারা বিশ্বেই পোষাক-সৌন্দর্য-শালীনতার নামে নারীর শরীরকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার নিয়ন্ত্রক মূলত কর্তৃত্ববাদী পুরুষ। এর ধারাবিাহিকতায় আমাদের দেশেও একদিকে পাশ্চাত্যের কট্টর নারীবাদ এবং অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে কট্টর রক্ষণশীলতায় নিয়ন্ত্রিত মেয়েদের পোষাক। পরিণামে সম্পূর্ণ বিপরীত মতাদর্শের সংঘাত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ফলাফল, মেয়েদের পোষাক সংশ্লিষ্ট অপরাধ বৃদ্ধি, অপরদিকে ঘরে-বাইরে নারীর স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে যেমনটা হয়েছে ইরান, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে।

অথচ এই অতি খোলামেলা, আঁটসাঁট, সংক্ষিপ্ত পোষাক এবং হিজাব-নিকাব-বুরকা, এগুলোর কোনটাই আমাদের সংস্কৃতির অংশ না। উল্লেখ্য, পশ্চিমা পোষাক মানেই অতি খোলামেলা-আঁটসাঁট, সংক্ষিপ্ত পোষাক না। অন্যদিকে হিজাব-নিকাব মানেই শালীনতা না। সুরক্ষা, শালীনতা ও সৌন্দর্যের নীতিতে আমাদের বাঙ্গালী-বাংলাদেশী পোষাক সমৃদ্ধ, যেমন: শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ-পাজামা-পাঞ্জাবি। ভিনদেশী পোষাক আমরা পরতেই পারি, সেক্ষেত্রে আমাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ বজায় থাকাটা অত্যাবশ্যক।

চলমান সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রতিরোধে আমাদের সমৃদ্ধ পোষাক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কট্টর নারীবাদী আদর্শিক পোষাক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের হিজাব-নিকাব-বুরকার আধিপত্যকে মোকাবেলা করা সম্ভব না। বরং আমাদের মূল্যবোধকে ধারণ করে এমন পোষাকই কেবল এই আগ্রাসনকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ, তবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের প্রত্যেকেরই দায়িত্ব আছে।

লেখক: সমাজবিদ, প্যারেন্টিং পেশাজীবী।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.