পুলিশের সবাই কি চোর, ছ্যাঁচর, বাটপার?

বিথী হক: পৃথিবীর কথা বাদ দিই, আমার দেশে সবচেয়ে ঘৃণ্য দুটি পেশা সাংবাদিক এবং পুলিশ। যে লোকটা খুন করে বেড়ায় মানে ভাড়াটে খুন করে সংসার চালায় সেও এই দুই পোশার মানুষকে গালি দেয় আবার যে লোকটা খুশি খুশি পেট মোটা চেহারায় ৫ ওয়াক্ত নমাজ পড়ে, টেবিলের নিচে ঘুষ খায় সেও এই দু’ পেশার মানুষকে ঘেন্না করে। যেন নিজে আর যাই করুক পুলিশ, সাংবাদিকদের মত চোর, ছ্যাঁচড় আর বাটপার আর কোথাও নেই। আজকে বলবো পুলিশদের কথা, অন্যদিন সাংবাদিক।

Bithy 2প্রতিবার সন্ত্রাসী ধরা বা গুলশান, কল্যাণপুর ও রুপনগরের অভিযানের পর সভ্য, বুদ্ধি-বিবেকে টইটম্বুর মানুষদের মনে হয় এটা পুলিশের সাজানো ঘটনা। কোন পুলিশ সদস্য না মরলে তো সে গল্পের আগুনে ঘি! এতবড় একটা ঘটনায় একটা পুলিশও মরে নি তার মানে অবশ্যই এটা নাটক বৈ অন্য কিছু হতেই পারে না!

এ পর্যন্ত ঘটা গুলশানের ঘটনাই একমাত্র সত্য ঘটনা। বাদবাকি সব বানোয়াট স্ক্রিপ্টেড নাটক। পুলিশদের জীবন হাটে-বাজারে ২০ টাকা কেজি দরে কিনতে পাওয়া যায়। তাই এসব হামলায় মরার পরেও তাদের ফিরে আসার সুযোগ আছে। এরকম হামলায় মরলে তাই তাদের জীবনের কোন ক্ষতি হয় না, তাদের পরিবারও দিব্যি বেঁচে থাকে। গুলশানের ঘটনায় যেহেতু ২জন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন সেহেতু সেই ঘটনা সত্যি, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে ছয় জন জঙ্গি মরল আর একটা পুলিশ সদস্যও মরলো না! এটা কিভাবে সম্ভব? এটা নিশ্চয়ই নাটক।

পুলিশ মরলে খুব শান্তি পায় মানুষ, আসামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশে তারা মিষ্টি খায়, মানুষের ঘর জ্বললে তাদের চর্মচক্ষু ঠাণ্ডা হয়! এতসব দেখে আমি শিউরে উঠি। আমরা, পুরো মানব ‘সভ্যতা’ অর্থাৎ আমরা কি সভ্য হচ্ছি নাকি আদিম হচ্ছি?  আমরা কি এগোচ্ছি নাকি পেছাচ্ছি? হাজার হাজার বছর পেছনে ফেলে সভ্যতার পেছনে ধাওয়া করে, টিকে থাকার লড়াইয়ে জিতে আমরা যে সংগ্রাম প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি তার ফলাফল কি গোলকধাঁধাঁয় বদলে যাচ্ছে? তীর-ধনুক আর বর্ষার যুগের মত কি আমরা বর্বর হয়ে যাচ্ছি?

যে পুলিশ আপনাকে আমাকে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে, বিশৃঙ্খল পরিবেশে গুলির নিচে পেতে দিচ্ছে বুক সে পুলিশ না মরলে নাকি আপনার কাছে তাদের কার্যক্রম সাজানো মনে হয়। তাদের মৃত্যু না হলে নাকি শান্তি লাগে না! আমি শুধুই শুনি। মানুষের মৃত্যু আমাকে কষ্ট দেয়। সে হোক ৫০ বছরের সাধনা-মগ্ন সন্ন্যাসী কিংবা দুর্ধর্ষ চোর-ডাকাত। কিন্তু আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে আদিম সংস্করণ আর উন্মাদনা রয়ে গেছে এটা সম্ভবত ব্রহ্মাও টের পাননি। টের পাননি বলেই সহজ স্বাভাবিক মানবিক দিকগুলো খুব সূক্ষভাবে পাশবিক হয়ে রয়ে গেছে।

আমরাই সম্ভবত স্রষ্টার সবচেয়ে অকৃতজ্ঞ সৃষ্টি। যে মানুষটা দিনের পর দিন ভাল কাজ করে যায় তার একটা করা ভুলকে আমাদের ক্ষমার অযোগ্য মনে হয়, তার সকল ভাল কাজ শুধুমাত্র একটা ভুল বা অপরাধের নিচে চাপা পড়ে যায়।

আমার লেখা সাংবাদিক বা পুলিশ কারো চামচামি করছে না। আমি যেমন বলছি না এই পেশার সবাই অনেক সৎ এবং মহান, তেমনি বলছি না এদের সবাই অসৎ আর মীরজাফর।

আচ্ছা আপনি যে বলছেন সব পুলিশ খারাপ। আপনি বাংলাদেশের সব পুলিশকে চেনেন? না চিনলে চেনার এবং অচেনার অনুপাত কত? সেটাও বলতে না পারলে বলেন তো আপনি বেশিরভাগ সময়ই কিভাবে সবখানে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারেন? বছরে ৪/৫ বার, বেশি করে ধরলাম ৪০/৫০ বার রাত্রে পুলিশের কাছে হেনস্থা হয়েছেন, আপনার পকেট থেকে মোটা অংকের ঘুষ দিয়েছেন; সে সুবাদে বছরের বাকি ৩২০ দিনের কথা বেমালুম ভুলে গেলেন?

মানলাম ভাল আর খারাপের হিসেবটা ২০:৮০ কিংবা ১০:৯০ কিংবা তাও নয়, তার চেয়েও কম। ধরলাম ০৫:৯৫, কিন্তু তার জন্যও কি আপনি পুরো পুলিশ পেশাটাকেই গালি দেয়ার অধিকার রাখেন? তার জন্যই কি পুরো পেশা ধরে সবার মৃত্যু কামনা করতে পারেন? এক সপ্তাহ দেশের সকল আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে রাখলে বুঝবেন জীবন কাকে বলে আর নিরাপত্তা কোন যক্ষের ধন!

শোনেন, খারাপ পেশা বলে কিছু নেই। মানুষ যে কোন পেশায় গিয়ে নিজে খারাপ হয়ে পুরো পেশাটাকে নেতিবাচক বানিয়ে ফেলে। দোষটা যার যার ব্যক্তিগত হলেও গালি দেয়া হয় বেচারা “পেশা” জিনিসটাকে। মৃত্যুল্লাসে ফেটে পড়ি পেশার মৃত্যু হল ভেবে।

আপনারা যারা পুলিশ পেশাটাকে গালি দেন এবং ভাববার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করেন না যে এই গালির ভেতর কিছু সৎ, সাহসী মানুষও রয়েছে। আপনাদের জন্য জীবন দিয়ে দিলেও যারা সহানুভূতি পর্যন্ত পান না তারা আপনার গালিতে কষ্ট পান, আপনার আমার উৎসাহ না পেয়ে নিজেকে নিজে উৎসাহ দিতে দিতে উৎসাহ খুঁজে পান না আর। সব পুলিশ সদস্য ক্রাইম পোট্রোলের মত এত সৎ এবং দায়িত্ববোধ সম্পন্ন না হলেও কিছু সদস্য কিন্তু পুলিশে অবশ্যই আছে যাদের জন্য আমরা বেঁচে যাই।

ভাল না থাকি, বেঁচে থাকার অর্থটাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.