এক কুড়ি চার, এক কুড়ি পাঁচ

পৃথা শারদী: ওরে, গেল গেল সময় গেল। চব্বিশ-পঁচিশ বছর, আমরা মাত্র পাশ করে বের হই এই বয়সে। ক্যারিয়ার , চাকরি সব আমাদের কাছে আনকোরা বইয়ের মতন নতুন। ছুঁয়ে দেখতে গেলেও মনে হয় কী শান্তি ! এর আগে হয়তো দু’চার পাইস কামানো হয় সবারই, টিউশনি করে, পার্ট টাইম কাজ করে ,ইন্টার্ন করে, অথবা ন’টা-পাঁচটা চাকরি আর মাস শেষে স্যালারি! হোক না সে স্যালারি দশ, বারো, পনের কিংবা চল্লিশ হাজার! কিন্তু নিজের কামাই! সে তো অন্য ব্যাপার ভায়া । 

Pritha Sharodi
পৃথা শারদী

চব্বিশ-পঁচিশ কিন্তু আরও একটা কারণে আমাদের মেয়েদের কাছে খুউ….উউব মূল্যবান। কোন কারণের জন্য? আহা, বুঝলেন না এখনো? বিয়ে, বিয়ে!
একটা ডিগ্রী নিয়ে পাশ করা মানে একটা বড় ব্যাপার, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা মেয়েরা বিয়ের জন্য…..বেশ ঠিকঠাক……তবে বয়সটা কম, ছেলের ফ্যামিলির সাথে খাপ খাওয়াতে নাও পারতে পারে। যৌবন সে সময় তার আসি আসি করেও আসে না, তাই ওটা বরং থাক।

আর মাস্টার্স পাশ করা মেয়ে! কী যে কথা মানুষের! মেয়েরা কুড়িতে হয় বুড়ি! মাস্টার্স পাশ করা মেয়ের যৌবন অস্তগামী। তার উপর বুঝবে বেশি!
তবে চব্বিশ-পঁচিশে মেয়েরা সবদিকেই ঠিকঠাক। ভরা যৌবন, স্নাতক পাশ করে তার মাথাভর্তি বিদ্যা, কেউ কেউ তো বিদ্যাধরী হয়ে প্রথম দ্বিতীয়ও হয়ে যায়। এরা শ্বশুরবাড়ি সামলানোর দৃঢ় চিত্ত, সহ্য ক্ষমতা অসীম থাকে এদের। এসব আসলে অন্য কোন বয়সের মেয়ের মধ্যে পাওয়া যায় না।
আমরা মেয়েরা এ সময় রেসের ঘোড়া হই। তাগড়া রেসের ঘোড়া, ঠিক পঁচিশের মাঝে নিজেকে বিবাহিত নারী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য আমাদের রেস শুরু হয়ে যায়।

আচ্ছা, রেসের ঘোড়া দেখেছেন কি সবাই? রেসের ঘোড়া কিন্ত যে সে ঘোড়া হয় না, দক্ষ ঘোড়াকে দিয়েই রেসে খেলানো হয়, ঘোড়াকে শেখানো হয় কত দ্রুতগতিতে দৌড়ানো যায়, হোঁচট না খেয়ে কিভাবে সামনে আগানো যায়। ঘোড়াগুলো শেখে, মনের আনন্দেই শিখতে থাকে। শেখা শেষ হলেই তাকে জিন পড়ানো হয়, তার পিঠের ওপর সপাং সপাং করে চাবুক মারা হয়।

ঘোড়সোয়ারের একটাই কথা তখন, “দক্ষ হয়েছ তুমি, তবে দীক্ষাগুরু আমি, আমি যেদিকে বলবো সেদিকেই দৌড়, অন্যদিকে দৌড় মানে তো খবর আছে”। চাপে পড়েই হোক, মারের ভয়েই হোক, জিনে টান লাগার ব্যথাতেই হোক না কেন রেসের ঘোড়ারা প্রাণপনে দৌড়ায়, মালিককে জিতিয়ে দেয়, আমরা মেয়েরা যেমন প্রাণপণে চোখের জল নাকের জল এক করে দাঁতে দাঁত চেপে কোনো এক দু’পাতার বায়োডাটা দেখে কোনো এক অচেনা লোককে বিয়ে করে আমাদের মা-বাবাকে উদ্ধার করি, বুড়ো মেয়ে ঘরে বসে আছে এ অপবাদ থেকে, ঠিক সেভাবে।
“ইয়ে, মানে আমাদের ক্যারিয়ার? এতো কষ্ট করে পড়লাম যে! ”
“আরে, ছাড়ো তো! কীসের ক্যারিয়ার! আগে ভালো একটা ছেলে। ভালো ছেলে হলে এতো সাপোর্ট পাবে কল্পনাতেও নেই তোমার।”
“আর যদি ছেলে ভালো না হয় !”
“তুমি তো মেয়ে বেশি কথা বলো! ছেলে কেন ভালো হবে না, এতো ভাবলে জীবন চলবে না।”
অনেক পরিবার এসময় মেয়ের চোখের জল দেখে নরম হোন, বিয়ের তোড়জোড় বন্ধ রাখেন মাস ছয়েকের জন্য, যদিও মেয়েটার ক্যারিয়ার গোছাতে সময় লাগে দু’ তিন বছর।

আজকাল লোকমুখে শুনছি ছাব্বিশ-সাতাশ-আটাশে বিয়ে করলে আসলে খুব ক্ষতি হয়ে যায়। মেয়ের বয়স বেড়ে (!) যায়, বাচ্চা নিতে সমস্যা হয়, এমনকি তার শারীরিক কামনা-বাসনাও নাকি ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে! স্বামী তখন তাকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে, আহারে! ওরে কপাল! স্বামীকে দেহের মোহে ধরে রাখবার জন্যও তাহলে এই পঁচিশের সন্ধিক্ষণে বিবাহ দরকার।
ফট করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। “ বালাই ষাট! তো, পঁচিশে বিয়ে করা মেয়েদের স্বামীরা কি পরকীয়ায় লিপ্ত হন না?”
জ্ঞানী জনতা এখানেই নীরব থেকে চোখ দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমি একজন বেগানা বেয়াদপ বিবাহযোগ্যা অবিবাহিতা নারী !
আমি হলফ করে বলতে পারি আমরা যারা পাশ করে গেছি, অথচ এখনো অবিবাহিত, তারা রুটিন মাফিক কয়েকটা কথা শুনে যাচ্ছি। মা-বাবা বলতেই থাকেন , “আজকে এই ছেলেটাকে দেখলাম ………………… আমি তো বুড়ো হয়ে গেছি, তুমি যদি এখন বিয়ে না কর আমি কীভাবে থাকি ……………………………………বাবা মায়ের কথার অবাধ্য হয়ো না, ভুগতে হয়। ”
আমরা মেয়েরা সবসময়ই এসব আবেগী কথাবার্তাকে ভয় পাই, ত্যাড়ামি করতে করতেও তাই একটা সময় শ্বাস ফেলে বলি, “ আচ্ছা দেও মা, আমাকে বিয়ে দিয়ে দেও।”

আমাদের চোখের সামনে তখন ভাসে একটা সোনালি কাজ করা লাল টুকটুক বেনারসি, অফিসের ফাইল কিংবা আইটি রিলেটেড ফাইলগুলো চোখের জলের সাথে ভেসে যায়, একটা কথাই তখন মনে হয়, মা-বাবাকে তো ফেলতে পারি না , যা হচ্ছে ভালো হচ্ছে আর যদি ভালো না হয়?

ভালো না হলে, হবে না ! তবে সেটা ইতিহাস হবে না, কোথাও ঢাকা পড়ে যাবে, একটা মেয়ের ক্যারিয়ার নষ্ট হলে কোন কিছু অশুদ্ধ হয়ে যায় না, বরং ঘরে লক্ষ্মী বিরাজ করে।

চব্বিশ-পঁচিশে ছেলের বিয়ে! ওকী! চোখ পাকাচ্ছেন কেন! হতেই তো পারে! খুব তো বলেন, নারী-পুরুষ সমান,অধিকার সমান, তো বিয়ে কেন করতে পারবে না একটা ছেলে চব্বিশে? ও! আত্মসম্মান?

আহ হা ! মেয়েদের সেটা নেই বুঝি?

একটা মেয়ের কাছে ক্যারিয়ার যা, একটা ছেলের কাছেও ক্যারিয়ার তা। একটা ছেলে প্রথম বেতন হাতে পেয়ে যেমন ভাবে এবার তার মাকে ঐ শাড়ীটা কিনে দেবে, বাবাকে দেবে ঐ জুতোটা। একটা মেয়ে কি ভাবে না? খাম খুলে তারও কি নিজের কামাইয়ের পয়সা দেখতে ইচ্ছা করে না? তারও কি ইচ্ছা করে না মা-বাবা ভাই-বোনকে নিজের টাকায় কিছু কিনে দিতে? তারও কি ইচ্ছা করে না একা একা নিজের মা-বাবার দেখাশোনা করতে? বাবা-মাকে একদিন নিজের পয়সায় আইসক্রিম খাওয়াতে? ঠিক ছোটবেলায় তার মা-বাবা যেভাবে তার দেখভাল করতো, সেভাবে তার এই বুড়ো মা-বাপকে একটু দেখভাল করতে?
তারও তো ইচ্ছা হতে পারে উচ্চশিক্ষায় বাইরে পড়তে যেতে। সিনা টান করে হেঁটে যেতে সবার মাঝে? নিজের মতো করে একটু শ্বাস নিতে !
তার তো নাও ইচ্ছা করতে পারে ছোটবেলার সেই হাড়িকুড়ি নিয়ে খেলাধুলোর জীবনটা বড়বেলায় দেরি করে সত্য করে জীবনে আনতে।
কিছু মেয়ে খুব স্বপ্নবাজ হয়, কিছু মেয়ে খুব ঘরোয়া হয়। সবার জন্য তো সবকিছু না। সব মেয়েরই একটা চাওয়া থাকে, থাকে নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, কারো জীবনে ক্যারিয়ার আগে বিয়ে পরে, কারো জীবনে বিয়েই আগে, পরে মাঝে, ক্যারিয়ার নেই। পাশ করে ভাল বিয়ে করার জন্য, পড়ালেখা করা তার দরকার ছিল তাই সে পড়েছে।
বয়োজ্যাষ্ঠগণ যারা আমার এই লেখাটি পড়ছেন, একটু নিজের ঘরে থাকা মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করুন, সে কী চায়! সে কী রান্নাঘরেই স্বপ্ন খুঁজে পেতে চায়, নাকি স্বপ্ন ছুঁতে সে সারা দুনিয়া ঘুরে দেখতে চায়! সে যা চায় তাকে তাই করতে দিন। বিশ্বাস করুন, সে হারবে না। দুমদাম করে আজকে এ যুগে এসে সবকিছু চাপিয়ে দেবেন না।

আপনারা সবাই চান যাতে আপনার ঘরের মেয়েটি যেন ভালো থাকে, আপনাদের চাওয়ার সাথে মেয়ের চাওয়াটির বোঝাপড়া করুন, ভালো বৈ মন্দ হবে না।
আসলে চব্বিশ-পঁচিশ বয়সটা ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর বয়স রে, ডানা মুড়ে ঘরে থাকার বয়স নয়। এতো পড়াশুনা করে নিজের স্বপ্নকে গয়নাগাটির ব্যাংকের লকারে রেখে একবুক অন্ধকার নিয়ে সংসারে সুখ-সুখ খেলা তো মরে বাঁচা!
বেঁচে উঠতে উঠতেই মৃত্যু, তা তো কাম্য নয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.