আমারও যে কিঞ্চিৎ পৈশাচিক আনন্দ পেতে ইচ্ছে করে

জান্নাত ফাতেমা: ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতাম ট্রাফিক পুলিশ হব। দুই হাতের ইশারায় চার রাস্তার মোড়ের চার গলির অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি-ঘোড়াকে শৃঙ্খলা দিব। শৈশবের অলিগলি পেরিয়ে যখন নিজেকে একজন মানুষ না ভেবে একজন মেয়ে ভেবে বড় হতে লাগলাম, বুঝতে পারলাম, এই পেশা আমাদের মেয়েদের জন্যে নয়। ঠিক সেদিন থেকেই আমার বোঝদারি মনের বহু দিনের লালায়িত বিরাট বিরাট  স্বপ্নগুলোর প্রথম স্বপ্নের প্রথম আত্মহনন।

Cosmopolitan Women
নাজিয়া আন্দালিব প্রীমার আঁকা ছবি

কি “কা-নারী” আমি তাই না! মৃত্যু হয়েছে তো কী হয়েছে? এদেশের একশো ভাগ পুলিশের মধ্যে যেখানে নারীর সংখ্যা মাত্র ছয়ভাগ সেখানে ট্রাফিক পুলিশে কোনো নারী আদৌ আছেন কিনা থাকলেও ঠিক কতসংখ্যক আছেন, আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে! যাই হোক, যা বলতে চাচ্ছিলাম।
একটি স্বপ্নকে ছুঁড়ে ফেলে অবলীলায় যখন আরেকটি স্বপ্ন দেখি– “ভোর হলো দোর খোল খুকুমণি উঠরে/ওই ডাকে জুঁই শাখে ফুলখুকি ছোটরে…।” তখন দেরীতে বুঝলেও স্পষ্ট বুঝেছি এটা নিতান্তই কোরাস করে পড়ার ছড়া ছাড়া আমাদের মেয়েদের বাস্তব জীবনে লালন করবার নয়। কবি তখন না হয় আপনাদের যুগে মেয়েদের এমন ছুটাছুটির স্বর্ণযুগ ছিল! এমন ছুটাছুটি কি আদতে আজকালকার তথাকথিত উন্নত সভ্যতায় তনু’দের মত খুকুমণিদেরও কি মানায় মশাই!

নারীর উপর অত্যাচারের বর্বরোচিত চিত্র কল্পনা করতে জাহেলিয়াতের যুগে যাওয়া লাগে নাকি আজকাল! মানুষ নামক চেনা প্রাণীর নারকীয়তার আর পৈশাচিকতার সাম্প্রতিক প্রমাণ তনু’র মতো অসংখ্য ফুলমনিদের বেহাল দশার ছবি যদি জানা থাকতো তাহলে হয়তো এই ছড়ার চিত্র অন্যরকম থাকতো।

যাই হোক! “মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে। তুমি যাচ্ছ পালকীতে মা চড়ে। দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে, আমি যাচ্ছি রাঙ্গা ঘোড়ার পরে টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।” আহারে কল্পনায় মাকে নিয়ে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়ানো এক ছেলের মাকে আস্থা আর কঠোর নিরাপত্তা প্রদানের কী সুন্দর মায়াময় চিত্র। এমন আস্থা আমার ভাইয়ের কাছ থেকে আমার মা যেমন পেয়েছেন, আমিও অন্য সবার মত বোন হিসাবে আমার ভাইয়ের কাছে পেয়েছি জীবনের সর্বক্ষেত্রে।

এক হিসেবে,পৃথিবীর সব মায়ের ছেলে আর ভাই তাদের কাছে বীরপুরুষ। কিন্ত একশো কথার আসল কথা এ দেশে স্ত্রীরা খোঁপায় ফুল গোঁজে, চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক, হাতে বালা আর মনে তালা লাগিয়ে লজ্জাবতী লতার মতো বদ্ধ ঘরে পুরুষের জন্য অপেক্ষা করা যতখানি সুন্দর আর শোভনীয়, ঠিক ততখানি অসুন্দর আর অশোভনীয় একটি নারীর রঙিন ঘোড়ায় টগবগিয়ে রাস্তা পার হবার স্বপ্ন।

আমারও যে এমন স্বপ্ন ছিলো! অন্ধকার অরণ্যে আমার একাকী মাকে রাস্তা দেখানোর স্বপ্ন। এখনও যখন কবিতাটি পড়ি বা শুনি মরচে পরা, গুনে ধরা এই সমাজে নিজেকে বীর নারী ভাবতে বেমানানই লাগে। এই জায়গায় যথার্থ আর উপযুক্ত মনে হয় আমার ভাইটিকে।

প্রচলিত অর্থে একজন বীর ছেলের স্বপ্ন আর সংজ্ঞা সম্বলিত “বীরপুরুষ” নামের এই কবিতাটি আমরা এমন কোন নারী নাই যে চেতন বা অবচেতন মনে মুখস্ত করিনি। মনে রাখিনি। মনে রেখে, মুখস্ত করে আমরা কে কবে কী পেয়েছি বলুন তো?

দেখেছেন তো দুই রাত পূর্বে ঘটে যাওয়া এক বীরপুরুষের বীরোচিত কাণ্ডের বর্বরোচিত বর্ণনার নীলছবি। ভাবনার বিষয়, এই আজব বীরদের তালিকায় প্রান্তিক লেভেলের শিক্ষাহীন, বিবেচনাহীন একজন টেইলার থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানদাতা গুরু, ডাক্তার মশাই, পুরুত ঠাকুর, মারফতি মৌলানা সাহেব, কেউই বাকি নাই!

মিথ্যে বলে থাকলে আমি দু:খিত। এমনকি আংশিক সত্যি বলে থাকলেও ক্ষমাপ্রার্থী। রিশা’র নিষ্পাপ মুখখানি আমাদের ভাঙা সমাজের কিছু বিকৃতাঙ্গের বিকৃতরুচিধারীর পরিহাসের চিত্র। রিশা’র উপরে লোমহর্ষক নিপীড়নের ছবির কাছে আমার জীবনের ফেলে আসা সব স্বপ্ন দেখাকে মিথ্যে মনে হয়। মিথ্যে আর অর্থহীন মনে হয় আগামী দিনের বেঁচে থাকার আগমনী সব বারতা।

এখন এই মুহূর্তে আমার শুধু একটাই স্বপ্ন – মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় এই বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন “বীর”দের ছবি  সাইনবোর্ড করে রাস্তায় রাস্তায় বাঁধিয়ে রাখি। আর প্রতিদিন  লাখ লাখ পথযাত্রীর মত এই ছবিগুলোতে পান খেয়ে পানের পিক ফেলে রক্তরঙে রাঙাই। কী করবো! নকল লাল রঙ-ই আমার প্রতিশোধের রঙ। ভাইডি, আমিও তো মানুষ। আমারও যে কিঞ্চিৎ পৈশাচিক আনন্দ পেতে ইচ্ছে করে! কেমন হবে নরপিশাচদের ছবিগুলোতে তাদের মা বা বোন থুথু ফেললে!! “ধরণী তুমি দ্বিধা হও।”

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.