বাড়ি ফেরা

নওরীন তামান্না: গ্রীষ্মের ছুটিতে ধুপধাপ দেশে বেড়াতে যাচ্ছে সবাই। এক বন্ধু যায়, আমরা বাকিরা হা-হুতাশ করি। তারপর টুপ করে সংবাদ দেয় আরেকজন, ‘আমিও যাচ্ছি’।

প্রবাসে থাকা মানুষদের দেশে যাওয়ার আয়োজন দেখেছেন কারা কারা? সে এক অপূর্ব দৃশ্য। অফিস থেকে একটুখানি ছুটি বাড়ানোর তোড়জোর, রাতদিন কেনাকাটা করা, টিকিট কাটা, টাকা পয়সার জোগাড় -সে হাজার ঝামেলা। তারপরও কুছ পরোয়া নেই বলে কেমন একটা ঘোরলাগা মনে তারা জিনিসপত্র গোছায়, মুখের হাসি কিছুতেই ঘোচে না।

Nowreen Tamannaযখন ফিরে আসে, দেশ-মাটি- প্রিয়জনদের পেছনে রেখে, কী বিষাদে ভরে থাকে মন, সে শুধু জানে তারাই, যারা আমার মতো দেশ ছাড়া বহুকাল। ফিরে আসার পরও তাদের চোখে মুখে লেগে থাকে সবুজ। সাথে থাকে দেশের ছোঁয়া লাগানো নানান ধরনের জিনিসপত্র। দেশে থাকতে যার মূল্য ছিল না সেরকম ভাবে- মাটির সাথে দীর্ঘ বিরহে তাই মনে হয় অমূল্য।

যে পুরুষটি গত দশ বছরে শার্টপ্যান্ট স্যুট ছাড়া আর কিছু পরেন না, তিনিও হয়তো সাথে করে নিয়ে এসেছেন পাঁচটি লুঙ্গি, দশটি পাঞ্জাবী, ছয়টি গামছা! সাথে অবধারিতভাবেই থাকে মায়ের হাতে রান্না করা খাওয়া- দাওয়ার বাক্স।

বিদেশের এয়ারপোর্টে খাবার-দাবার আনা নিয়ে ভারি কড়াকড়ি। কিন্তু কে বলে বাঙালী ভীরু? ইমিগ্রেশন ওয়ালাদের শ্যেনচক্ষু ফাঁকি দিয়ে কেমন সব অভিনব উপায়ে যে তারা খাবার জিনিস আনেন, তা নিয়ে অনায়াসে একটি রোমাঞ্চ উপন্যাস লেখা সম্ভব।

মনে পড়ে একবার রায়হান দেশে গেছে। আম্মা একগাদা রান্না করা খাবারের বাক্স দিয়ে দিয়েছে তার হাতে। হিথ্রো এায়ারপোর্টে তাকে এক কর্মকর্তা শুধালো, সাথে রিপোর্ট করার মতো কিছু কি আছে? রায়হান নির্বিকার ভাবে বললো “হ্যাঁ আছে” তারপর বলে গেলো “কাবাব, বিফ, পিকল এ্যান্ড মাচ মাচ মোর। ইন ফ্যাক্ট আমার যে বড় স্যুটকেসটি দেখছো তার পুরোটাই ভর্তি নানান ধরনের ব্যাঙ্গলি ফুড এ”।

অফিসারটি দুইচোখ কপালে তুলে বললো “এতো খাবার এনেছো? জানো না এইগুলোর অনেক কিছুই এখানে আনা বারণ?”

রায়হান আগের চেয়েও নির্লিপ্ত গলায় বললো, “জানি, তবুও এনেছি। তার আগে বলো, তুমি কি ম্যারেড?”

“কেনো?”

“এইগুলো দিয়েছে আমার মাদার-ইন-ল, তার মেয়ের জন্য। যদি বলো তো আমি এখানে থেকে যাবো, কিন্তু খাবার ছাড়া বাড়ি যাওয়া চলবে না”।

অফিসারটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো “হুম, বুঝতে পেরেছি। শাশুড়ি আমারও আছে। ঠিক আছে নিয়ে যাও- অসুবিধা নেই”।

যাই হোক, দেশে বেড়াতে যাওয়া বন্ধুদের কেউ কেউ ফিরে এসেছে। এখনও না ফেরারা অবিরত পোস্ট করে যাচ্ছে নানান ছবি, প্রিয়জনদের, আড্ডার, বৃষ্টির- সাথে, ডিজিটাল যুগের নতুন উপসর্গ নানান লোভনীয় খানাপিনার ছবি আর বিবরণ। আমি অদ্ভুত একধরনের মন খারাপ আর মায়া নিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখি। গভীর কোনো ভালোবাসার দৃশ্য দেখতে আমার বড় ভালো লাগে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.