প্লিজ, রিপোর্টারদের সুযোগ দিন

কিশোয়ার লায়লা: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বেশ আলোচনা আর সমালোচনার ঝড় উঠেছে ক’দিন ধরে। আমি দেশ থেকে ১০ ঘন্টা পিছিয়ে, তবুও ঝড়ের দমকা হাওয়া আমিও অনুভব করেছি।

একসময় সাংবাদিকতা আমার জীবিকা ছিল। এখন সরাসরি জীবিকা না হলেও নিজেকে সাংবাদিক ভাবতে ভালো লাগে। সহকর্মীদের নিয়ে মানুষ হাসাহাসি করলে আমার কেমন জানি ছোট ছোট লাগে। মনে হয় আমার দিকেই তো আঙ্গুল!
তুমি যেমন বীজ বপন করবে তেমনই ফল পাবে। এটা স্বত:সিদ্ধ একটি বাক্য। জীবনের অনেক ক্ষেত্রে এই বাক্য প্রযোজ্য।

Kishowarমনে আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ‘সাক্ষাতকার’ বিষয়টি শিক্ষক এই বাক্য দিয়ে পড়ানো শুরু করেছিলেন। নেবো সাক্ষাতকার। তার সাথে বীজ বপন বা ফল এসব কেন, তখন বুঝিনি। বীজ বপন হলো প্রশ্ন ছোঁড়া আর ফল মানে উত্তর। মানে আমার প্রশ্নের ওপরই জবাব নির্ভর করবে। কর্মজীবনে ভালভাবে বীজ বপনের চেষ্টা বরাবরই ছিল। কখনও পেরেছি, কখনো পারিনি।

প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নকর্তাদের সমালোচনা পড়ার পর থেকে আবারো চাষাবাদের বিষয়টা মনে পড়লো। ‘‘তাঁহারা এমনই বীজ বপন করিলেন যে এখন প্রধানমন্ত্রী কী কহিলেন তা নিয়া কোন সংবাদে মনোনিবেশ করিতে পারিতেছি না। প্রশ্ন কর্তারাই সংবাদ হইয়া গেলেন।’’

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি প্রায়ই গণমাধ্যমের সামনে পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে জবাব দেবার প্রত্যাশায় হাজির হন। আর এই লোভনীয় সুযোগটা আমরা প্রায়ই এভাবে নষ্ট করি। আমার বিশ্বাস স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও চান তীর্যক সব প্রশ্নের জবাব দিতে। অবশ্য আমার ধারণা তিনিও অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। ঊনিও বীজ বপনের দুর্বলতা জেনে গেছেন এতোদিনে।

আমি আমার ১২ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে দেখেছি প্রতিটি অফিসেই প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সংগ্রহের জন্য দুজন রিপোর্টার থাকেন। তারাই প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কিত সব সংবাদ কভার করে থাকেন। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী কোনো সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিলে সেই দু’জন যারা সারা বছর রোদ বৃষ্টি ঝড়ে কাবু হয়ে গুরুদায়িত্ব পালন করেন তারা কেমন জানি তলিয়ে থাকেন। অফিসের ‘বস’ হাজির হন সেই সংবাদ কভার করতে।

এটা মানি যে অভিজ্ঞতার একটা দাম আছে। একজন বস লেভেলের সাংবাদিকের মাথায় যে প্রশ্ন খেলবে সে প্রশ্ন একজন রিপোর্টারের মাথায় খেলতে নাও পারে। আমার কথা হলো, সেই মূল্যবান প্রশ্নটি আপনি সেই রিপোর্টারের সঙ্গে শেয়ার করুন। তার সাথেও আলোচনা করুন যে তুমি এ প্রশ্নটি করবে। সেই রিপোর্টার তো একই অফিসের প্রতিনিধি। রিপোর্টারের একটি ভালো প্রশ্ন আপনার অফিসেরই ওজন বাড়াবে। আপনাদের তো প্রধানমন্ত্রী এমনিতেই চেনেন। এবার ওই রিপোর্টারকে চিনতে দিন। সেও আপনার ছায়ায় বেড়ে উঠুক। রিপোর্টারদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিন।

এবার কজন সাংবাদিক প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনে একটি সংবাদ পড়লাম। দেখলাম তাঁরা প্রত্যেকে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সাক্ষাত পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। তাঁদের কেন প্রশ্নের অজুহাতে প্রধানমন্ত্রীর সামনে ভাষণ দেয়ার দরকার হলো? আর তাঁদের বেশিরভাগের ভাষণও যদি নির্ধারিত বিষয়টির ওপর হতো!

২০১০ এর শেষ বা ২০১১’র শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলন আমি কভার করেছিলাম।  মনে আছে, এ যাবতকালে ঐ একটি সংবাদ সম্মেলনই ছিল সম্পূর্ণ ‘সাংবাদিক’ মুক্ত। মানে আমরা সবাই রিপোর্টার ছিলাম। আমি বসার সুযোগ পেয়েছিলাম প্রথম সারিতে। একেবারে প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি। কেউ বলতে পারবেন কী কারণে ওটা ‘সাংবাদিক মুক্ত’ সংবাদ সম্মেলন ছিল?
কারণ ওটা ছিল সংবিধান সংশোধনী কমিটির অগ্রগতি, ফাইন্ডিংস আর সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কিছু বলা আর প্রশ্নে জবাব দেয়ার সংবাদ সম্মেলন। দু’তিন দিনের আওয়াজে নয়, মোটামুটি হঠাৎ করেই তিনি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন।

আমরা সংসদ প্রতিনিধিরা হঠাৎ খবর পেয়ে দৌঁড়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে হাজির হলাম। হয়তো এই কারণেই সেটা সাংবাদিক মুক্ত ছিল। কারণ ‘সাংবাদিকরা’ স্যুট-টাই ঠিক করতে পারেন নাই। প্রশ্নের নামে বিশাল বিশাল তৈলযুক্ত ভাষণ তৈরির সুযোগ পান নাই। আর সংবিধান নিয়ে ঊনারা তেলের মাত্রাটা কতটা দিতে পারবেন, সেটাও বুঝতে পারছিলেন না হয়তো।

সংবিধানের মলাটের তো পরিবর্তন হয়নি যে বলবেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এতো সুন্দর মলাট দিয়ে আপনি সংবিধান বাঁধিয়েছেন, এ যেনো সোনার  ফ্রেমে বাঁধা ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাক্, সেই সংবাদ সম্মেলন নিয়ে আমার ভাল স্মৃতি আছে। রিপোর্টার হিসাবে দুটো (একটি মূল ও একটি সম্পূরক) প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম।
ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী। আপনি ভবিষ্যতে এরকম তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিলে জাতি বেশি উপকৃত হবে।  আখেরে আপনার জনপ্রিয়তাও বাড়বে, বৈ কমবে না। আমার বিশ্বাস আপনারও অনেক ভাল প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছে করে। জাতির কোন বিষয়ে বোঝার ভুল থাকলে আপনার সেটা পরিষ্কার করতে ইচ্ছে করে।

কিন্তু ভালভাবে বীজ বপনের প্রক্রিয়ার অভাবে আপনি ভাল ফল দিয়ে জাতির ভুল ভাঙ্গতে পারেন না। আপনার দেয়া সংবাদ সম্মেলন ‘সাংবাদিক’ মুক্ত রেখে রিপোর্টারবেষ্টিত হলে কিছুটা ভাল ফল আপনি জাতিকে দিতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

টরন্টো

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.