জীবন, তুমি কার আকাশে উড়ো?

সাদিয়া নাসরিন: সব ম্যানেজ হয়ে গেছে, সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়। শুধু ঠা ঠা পড়া মানুষের আকৃতি নিয়ে এখনো জম্বুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের মতো কিছু মানুষ। আমাদের মাথার উপর একখণ্ড অস্বচ্ছ আকাশ। যে আকাশে ভেসে বেড়ায় কিছু সস্তার জীবন। যে জীবন “ম্যানেজ” করা যায়, ম্যানেজ হয়ে যায়। যে জীবন দুলতে থাকে আপোসনামা আর টাকার বান্ডিলের মাঝখানে।

আহা টাকা…একটা আপোসনামা…একটা রিক্সা ভ্যান…গরম ধোঁয়া উঠা মোটা ভাত…আর একটা জীবন!!  

14080921_10205207079696370_1319975324_nআমি লিখতে বসেছি ক্রিকেটার শাহাদাতের বাসার গৃহকর্মি হ্যাপি’র “জবানবন্দি” ও “ভুলে যাওয়ার” কথা। যে জবানবন্দিতে আমাদের হ্যাপি, না না না হ্যাপি নয়, হ্যাপি নয়, টাকা কথা বলেছে। টাকা বলেছে হ্যাপি পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে।

অবশ্য বছরখানেক আগের কথা কীনা ১১ বছরের হ্যাপিও ভুলে যেতে পারে কেউ তার গায়ে গরম খুন্তি ছ্যাঁকা দিতো। হ্যাপির মামার হাতে এখন অনেকগুলো টাকা। তাই হ্যাপি ভুলে যেতেই পারে শাহাদাত নামের এক পিশাচ তাকে রুটি বেলোনি দিয়ে চোখের উপর মারতো। হ্যাপি ভুলে গেছে মার খেতে খেতে এক সন্ধ্যায় সে ঘর থেকে বের হয়ে কালশি বাজারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলো।

ভুলে যাও হ্যাপি, ভুলে যাও। আমরাও তো কত কিছু ভুলে গেছি। ওফ! কে আবার মনে করিয়ে দেয় আদুরির কথা! ওই যে মরার মতো ডাস্টবিনে পড়ে ছিলো যে মেয়েটা! ওর নাম আদুরী, নাকি আমার নিকুন্তিলা! একই বয়স, একই রকম দেখতে!! না না, আমার নিকুসোনা কেন থাকবে অমন ময়লার ডিপোতে? সে যে আমার রাজকন্যা!

কিন্তু আমিও যে ওকে “আদুরি” বলে ডাকি! কিন্তু আদুরিকে কেন ওরা সারাদিন না খাইয়ে রাখতো? কেন অমন সোনা মুখে আগুনের ছ্যাঁকা দিতো? কেন ওর গায়ে গরম ইস্ত্রির ছ্যাঁকা? কে এমন করে ব্লেড দিয়ে সারা শরীর কেটে দিয়েছে আমার আদুরির?

ভুলে যাও হ্যাপি, ভুলে গিয়ে বেঁচে যাও। ভুলে যাও জান্নাতুলের কথা। জান্নাতুলও ম্যানেজ হয়ে গিয়েছিল আমাদের এক মানবতাবাদী শিল্পীর হাতে। শিল্পীর নাম “কৃষ্ণকলি”। “সাঁওতাল বানাইছে ভগবান, মানুষ করেনি” টাইপ জ্বালাময়ী গান করেন। সেই শিল্পীর ঘরে জান্নাতুল নামে এক কিশোরী গরম ভাত রাঁধেনি বলে বকুনি খেয়ে নাকি ফাঁসিতে ঝুলে “আত্মহত্যা” হয়ে গিয়েছিল। পুরোটা চোখ খুলে আকাশটা আর দেখতেই পারলোনা মেয়েটা। আহা!

জান্নাতুলও ভুল করেছিলো, হ্যাপি। ও ভুল করে আমাদের জামাইবাবু অর্কের গায়ে খামচি দিয়েছিল। জান্নাতুলকে ধর্ষণ করেছিল কিনা, বা চেষ্টা করেছিল কিনা তা আমরা জানি না। জানবোও না। কারণ এসব “মানবতাবাদী” ভাসুরের গল্প আমাদের মিডিয়া লিখে না। আমরা শুধু অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করি, কেন  বউ বকা দিল আর খামচি খেল জামাই?

আমরা শুধু জেনেছি, একটা আপোসনামার কথা। জান্নাতুলের বোন সেই আপোসনামায় লিখেছিলো “আমার বোন মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না, একা একা বসে থাকতো। ওকে মেরে ফেলার খবর জানলেও মামলা করবো না। মামলা করলে তো বোনকে আর ফিরে পাবো না”……।  

Sadia Nasrin
সাদিয়া নাসরিন

আয়রন নেছা এখন কেমন আছে কে জানে? সেই যে, জয়পুরহাটের কালাইয়ের মোসলেমগঞ্জ বহুতি গ্রামের নজরুল ইসলামের স্ত্রী আয়রন নেছা। পঙ্গুঁ স্বামীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে ঢাকায় এসে কাজ নিয়েছিল এক জাঁদরেল “সচিব স্যার” এর বাসায়। কিন্তু সেই “স্যার”, সাবেক অতিরিক্ত সচিব সৈয়দ আমিনুর রহমান নামের তার ছেলের জন্য মামলা ও জেল জুলুমের ভয় দেখিয়ে কিডনি দিতে বাধ্য করেছিল তাকে। কিডনি দিতে জোর করলে স্বামীর অসম্মতির কথা বলে পালিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যায় আয়রন নেসা। কিন্তু পালিয়েও বাঁচতে পারেনি। গুলশান থানায় তাকে নগদ ২ লাখ টাকা ও ১২ ভরি সোনার গহনা চুরির সাজানো মামলায় ফাঁসিয়ে কিডনি দিতে বাধ্য করে। এখানেও আপোসনামার গল্প তৈরি হয়। কিন্তু কিডনির জন্য ১০ লাখ টাকার লোভ দেখালেও  মাত্র আড়াই লাখ টাকা পেয়েছিল আয়রন নেছা।

হত্যা, আত্মহত্যা, গরম খুন্তি, আর আপোসনামার গল্প এভাবেই চলতে থাকে। টাকার আকাশে উড়তে থাকে সার্ভেন্ট রুমের মেঝেতে পড়ে থাকা সস্তার জীবন। কাপ ভাঙার অপরাধে পিঠে গরম ইস্তিরির ছেঁকা খাওয়া রংপুরের ১২ বছরের রহিমা…কাচের প্লেট ভাঙার অপরাধে এসআইয়ের স্ত্রীর হাতে সারা শরীরে গরম খুন্তির ছেঁকা খাওয়া ১০ বছর বয়সী রোমেলা……আইনজীবীর বাসায় কাজ করতে গিয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফেরা কিশোরগঞ্জের তাহমিনা…হিসু করার অভিযোগে টেবিলের নিচে মাথা দিয়ে বেদম পিটিয়ে আহত করে চার তলার রান্নাঘরের ব্যালকনি দিয়ে ফেলে দেয়া নয় বছরের শিশু শারমিন…….আহারে, জীবন!!

যাক, আবেগের প্যান প্যানানি বাদ। এবার আসলি বাত করুং।

জান্নাতুল-হ্যাপি-আদুরি-হাসিনাসহ সকল গৃহকর্মী হত্যা, হত্যাচেষ্টা এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার বিচারের জন্য আওয়াজ তুলুন। আই রিপিট “হত্যা”  “হত্যাচেষ্টা” এবং “আত্মহত্যার প্ররোচনা”। যদি ধরেও নিই যে, এটা বকুনি খেয়ে অভিমানী মেয়ের আত্মহত্যা, তাহলে ও আত্মহত্যার প্ররোচনার জন্য কৃষ্ণকলি-অর্ক’র বিচার করতে হবে। যদি হ্যাপি সব ভুলেও যায়, তবু গৃহকর্মে শিশু নিয়োগ দেয়ার অপরাধে বিচার করতে হবে শাহাদাত-নিত্য’র।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ’ (বিলস) এর তথ্য মতে, গত পাঁচ বছরে সারা দেশে অন্তত ১৮২ জন নির্যাতিত গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১৪৩ জন। গৃহকর্মী সুরক্ষা এবং ডোমেস্টিক লেবার নিয়ে যে সব সংস্থা কাজ করেন তাদের বলছি, মৃত্যু আর নির্যাতনের সংখ্যা  ঠিক কতো হলে আপনারা চেয়ার ছেড়ে পথে নামবেন? ফান্ড কম  পড়েছে? ফান্ড লাগবে না। শুধু আওয়াজ তুলেন, বজ্র হয়ে ফিরিয়ে দেয়ার লোকের অভাব পড়বে না। আই প্রমিজ।

বন্ধুরা, পথে এবার নামো সবাই, পথেই হোক পথ চেনা…আমাদের মিলিত কন্ঠের হুঙ্কার যেন টাকার জোর ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় ক্ষমতার দাপটে জীবনকে তুচ্ছ করা ওই হারামীদের কানের পর্দায়। এত জোরে আওয়াজ তোল যেন মানুষের জীবন-মৃত্যুর আপোষনামা লিখার আগে দুঃস্বপ্নে কাপড় নষ্ট করে ওই দালালেরা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.