মেয়েটিকে এই শহরে একা ছেড়ে দিলেন?

কামরুন নাহার (রুমা): বৃষ্টিকে জিজ্ঞ্যেস করি “কী হয়েছে, খুব বিক্ষিপ্ত লাগছে তোমায়, ক্লাসে মন নেই”;  বৃষ্টি বলে, “কিছু হয়নি” অথবা “হোস্টেলের রান্না ভাল না তাই খেতে পারিনি” বলে কেমন হেসে উড়িয়ে দেয়। ওর ঠোঁট হাসে, কিন্তু চোখ হাসে না, মুখের হাসিটা চোখে প্রতিফলিত হয় না।

কিন্তু আমি ঠিক বুঝি একটা কিছু হয়েছে – আমিও ওর বয়সটা পার করে এসেছি; ওর না বলা অনেক কথার কিছু তো বুঝি! আমি ওর সিদ্ধান্তহীনতা বুঝি, বন্ধুহীনতা বুঝি, ওর ভুল পথে ভুল মানুষের সাথে পা বাড়ানটা বুঝি, ওর প্রতারিত হবার গল্পটা বুঝি -শুধু মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারি না ওর জন্য আমি কী করবো, কী করা উচিত সেটা।

বৃষ্টিরা আমাদের ‘আগামী’ – ওদের হাত ধরেই সামনে যাবে আমাদের দেশ, এই পৃথিবী – তাই ওদের সঠিক সিদ্ধান্ত, সুন্দর জীবন আমাদের কাম্য। হোস্টেলের রান্না ভাল কী খারাপ- এই সমস্যার কথা ওরা বলে, কিন্তু সব কি ওরা বলে? ওরা সব মন খুলে বলবে, সব শেয়ার করবে এমন মা-বাবা কি আপনারা হতে পেরেছেন, এমন ভাইবোন কি আপনি হয়েছেন, এমন বন্ধু কি পেরেছ তুমি হতে অথবা আমি কি পেরেছি সেই শিক্ষক হতে?

Kamrun Nahar
কামরুন নাহার রুমা

শিক্ষক হবার সুবাদে বৈচিত্র্যপূর্ণ ছাত্রছাত্রীদের সাথে মেলামেশার সুযোগ হয়েছে আমার। ভার্চুয়াল কমিউনিকেশনের সাফল্যের কারণে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সাথেও আমার যোগাযোগ হয়, কথা হয়।  আর আমার ছাত্রছাত্রীদের ব্যাপারে  জানার সুযোগ একটু  বেশি হয় কারণ আমি ক্লাস, ক্যাম্পাসের বাইরেও ওদের সাথে সময় কাটাই, আড্ডা দেই। সেই আড্ডায় আমার বড় একটা অবজারভেশন বিভিন্ন জেলা থেকে মা-বাবাকে ছেঁড়ে এই শহরে পড়তে আসা ছেলেমেয়েরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় ভোগে তা হলো, বন্ধু নির্বাচন এবং পরিবারের সাথে তৈরি হওয়া দূরত্বের সমস্যা। থাকার জায়গা মিলে যায়, কিন্তু যাদের সাথে থাকবে বা থাকে তাদের বেছে নেয়াটাই কঠিন হয়।

খুব ভালবেসে যার সাথে একই রুমে থাকা শুরু হয়, আস্তে আস্তে দেখা যায় সে আসলে উপকারের চেয়ে অপকার বেশি করছে। কিন্তু কিছু করার থাকে না, এটা ছেলেমেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই হয়। তবে ছেলেদের তুলনায় এই শহরে পড়তে আসা বা কাজের সন্ধানে আসা মেয়েদের স্ট্রাগলটা অনেক বেশি।

আমার সব ছাত্রছাত্রী জানে, আমার ছাত্রীরা যেকোনো বিষয়ে আমার কাছে অগ্রাধিকার পায় – বিশেষ করে সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে। কারণটা খুব পরিষ্কার – আমি মেয়ে, তাই মেয়েদের কষ্টটা সহজে বুঝি, সমানুভব করতে পারি।

বলছিলাম বন্ধু নির্বাচনের অপারগতার কথা। এক-একজন মানুষ একেক রকম । একেক জনের ভাবনা জীবনের চাওয়া একেক রকম। সময়ের সাথে সাথে মানুষের ভাবনায় আসে

পরিবর্তন। তাই দেখা যায় প্রথম বছর যে রুমমেট ছিলো বৃষ্টির খুব কাছের, পরের বছরই সে খুব দূরের মানুষের মতো আচরণ করছে, আর সবচেয়ে দূরের জন হয়ে যাচ্ছে সবচেয়ে কাছের। ক্লাসের যে বান্ধবীটি ছিল সব সুখ-দুঃখের অংশীদার সেই বান্ধবীটি হয়ে যাচ্ছে অচেনা কেউ। যে মেয়েটিকে সে দুচোখে দেখতে পারতো না, সেই আসছে বিপদে দুহাত বাড়িয়ে।

যে মেঘের কাছে বৃষ্টি নানান মেয়েলী সমস্যাও শেয়ার করতে পারতো, একদিন দেখা যায় সেই মেঘ কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে। সেই অদ্ভুত আচরণের প্রক্রিয়ায় কখনও সে দূরে সরে যাচ্ছে, কখনও বা খুব কাছে আসছে। সময়ের হাত ধরে অনেক বৃষ্টির জীবনেই মেঘ প্রেমিক হিসেবে আবির্ভূত হয়। এটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া, এতে কোন অন্যায় নেই।

ছেলেমেয়ে একসাথে লেখাপড়া করলে বন্ধুতা হবে, মান-অভিমান হবে, রাগ হবে, রাগ থেকে অনুরাগ হবে, আর সেই অনুরাগ একদিন তীব্র প্রেমে পরিণত হবে এটাই খুব স্বাভাবিক। ইতিহাস সাক্ষী এমন অনেক ঘটনা আছে। ইতিহাস সাক্ষী এই প্রেমের সুখের সমাপ্তি যেমন আছে, তেমন আছে করুণ পরিণতিও।

সহপাঠী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই থেকে প্রেমিক হওয়া অনেকেই সময়ের সাথে সাথে হয়েছে প্রতারক, হন্তারক। ঊনিশের একটি মেয়ের পক্ষে একজন সঠিক বন্ধু বা প্রেমিক যাচাই করা খুব কঠিন। ঊনিশের একটি মেয়ের কাছে জীবনটা দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে ছবির মতো -যেখানে সে নিজে সিমরান আর সহপাঠী বন্ধুটি বা বড় ভাইটি রাজ।

প্রেমিক কি শুধু শিক্ষায়তনের পুরুষরাই হয়! না। রোজ ক্যাম্পাসে আসার পথে গলি মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি অথবা বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেবার সময় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটি কিংবা বান্ধবীর বড় ভাইটি বা বন্ধুর বন্ধুটিও অনেক সময় প্রেমিকের বেশে সামনে আসে। মেঘের সাথে বৃষ্টির প্রেম হয়, দিন যায়,

প্রেম গভীর হয়, লেখাপড়ায় মনোযোগ কমে, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে। প্রেম আরও গভীর হয়, লম্বা সময় বাইরে থাকা হয়, লম্বা সময় সন্ধ্যায় গড়ায়, আস্তে আস্তে সন্ধ্যা থেকে সেটা হয় রাত, রাত থেকে আরও রাতে, কখনও বা গভীর রাত। এমনি করে একদিন বন্ধুর বাসায় থাকা হয়, এমনি করে একদিন হয়ে যায় দুইদিন, তিনদিন, চারদিন।

প্রেম গভীর হয় সাথে সাথে কি সমস্যাগুলোও? নয়তো প্রেমের সুখে বুঁদ হয়ে থাকা বৃষ্টির তো ঝলমল করার কথা, মন দিয়ে লেখাপড়া করার কথা – তা না করে কেন সে ক্লাসে থম মেরে বসে থাকে, কেন সে হাসে না, আগের মত প্রাণ খুলে বাঁচে না?

একদিন হঠাৎ কেন তার লাশ দেখা যায় ডাস্টবিনে, রাস্তার ধারে অথবা বেড়ি বাঁধের নিচে? কোথায় সমস্যা? মেঘকে চিনতে ভুলটা কোথায় হলো! জীবনটা যার কাছে দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে ছবির মতো, তার ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের তাকে এই ভুলটা করার জন্য ছেড়ে দেয়াটা কি স্বাভাবিক?

আমরা শিক্ষকরা যদি আপনার মেয়ের মুখ দেখে ওর সমস্যা কিছুটা হলেও বুঝে নিতে পারি আপনারা পিতামাতারা কেন তার কণ্ঠ শুনে, তাকে দেখে বুঝবেন না কী ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে সে যাচ্ছে? বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারবেন তার বেওয়ারিশ লাশ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আপনিও একজন আসামী নন?

দিনের পর দিন টাকা দিয়ে দায় সেরেছেন, জানতে চাননি তার লেখাপড়া কেমন চলছে, তার ফলাফল কী; জানতে চাননি তার বন্ধুরা কেমন, জানতে চাননি সে কেন বাড়ি যায় না, সে কেন বিচ্ছিন্ন আপনাদের থেকে! আপনি তার ক্যাম্পাসে না জানিয়ে হঠাৎ একদিন এসে তাকে চমকে দিয়ে বলেননি ‘চল আজ তোমার বন্ধুসহ একসাথে লাঞ্চ করবো’।

আপনি তার সেই বন্ধু হতে পারেননি, যাকে বন্ধু হিসেবে সহজেই জিজ্ঞ্যেস করা যায় সে কাউকে ভালবাসে কিনা, আপনি সেই বন্ধু হতে পারেননি যার কাছে আপনার মেয়ে সহজেই তার বন্ধুকে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দেবে আর আপনি জানতে পারবেন আপনার মেয়ে ভুল পথে আছে না ঠিক পথে। আপনার মেয়ে দিন দিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, জেদি একরোখা হয়ে যায়, ভুল পথে ভুল মানুষের সাথে পা বাড়ায় সেই দায় সবচেয়ে বেশি আপনার তার মা অথবা বাবা হিসেবে।

পরিবারের বন্ধনটা ঠিক দিতে পারলে, শুধুই পিতামাতা না হয়ে বন্ধু হতে পারলে মেয়েটাকে অনেক বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। মেয়েটি ইচ্ছা করে এমন করে না, মেয়েটির ভুল হয়ে যায়; ১৯ এর একটি মেয়ে ভুল করে বেশি। ঊনত্রিশের একটি মেয়েকে বিপথগামী করা কঠিন, কিন্তু ঊনিশের একটি মেয়েকে ভুল পথে নিয়ে যাওয়া সহজ।

পরিবর্তিত পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের মেয়েরাও এখন এগিয়ে সবদিক থেকে । তারা নিজের মত চলছে , বলছে, পরিবর্তন নিয়ে আসছে , নিজের মত করে জীবনটা সাজাতে শুরু করেছে – চৌকাঠের সীমানাটা পেরিয়ে ‘বাহিরকে’ দেখছে নিজের মত করে । সেই বাহিরকে দেখার অধিকার থেকেই তার ছুটে যাওয়া নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষ এবং নতুন বন্ধুদের কাছে।

কাছের মানুষদের ছেড়ে দূরে আসা ১৮/১৯ বছরের একটা মেয়ের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া তো দূরে থাক নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়াই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক এখানেই অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় ভূমিকাটা পালন করতে হবে। তার হোস্টেল বা মেসে নতুন একজনের সাথে শেয়ার করে থাকা থেকে শুরু করে নতুন বন্ধু বেছে নেয়া, নতুন শহর চেনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বুঝে ওঠা সবকুছুতেই একজন অভিভাবক ততক্ষণ পর্যন্ত পাশে থাকবেন, যতক্ষণ না সে সবকিছুর সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।

কারণ এই বিষয়গুলোতে ১৯ বছরের একটা মেয়ের পক্ষে একা সিদ্ধান্ত নেয়া, মানিয়ে নেয়া এবং বুঝে ওঠা কঠিন। একটা ১৯ বছরের মেয়েকে বিপথগামী করা সহজ, ভুল পথে পরিচালিত করা সহজ, ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করাও সহজ। তাই তাকে একা এই শহরে ছেড়ে দেয়া এবং নিজের সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে চলতে দেয়া মস্ত বোকামি। এর পরিণাম অনেক ক্ষেত্রেই খুব মারাত্মক হয়।

যে সমস্যাটার কথা বললাম সেটা সব শহরের মেয়েদেরই সমস্যা আর ছেলেদেরদের বেলায়ও হয়, তবে কম। শুধু ছেলেরা নয়, প্রতারণা মেয়েরাও করে, হন্তারকও মেয়েরা হয়, তবে তা হাতে গোনা। আর আমাদের এই সমাজে বৃষ্টিদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যু যত বেশি, বিচার প্রাপ্তি ততই কম।

তাই সব বৃষ্টির মা-বাবাদের কাছে অনুরোধ হায়নাদের ভিড়ে মেয়েটাকে একলা ছেড়ে দেবেন না। মেঘ-বৃষ্টির প্রেম সে তো অমর প্রেম। এই শহরে অথবা এই শহরের বাইরের সব বৃষ্টিরা মেঘেদের কোলে নিরাপদে থাকুক – মেঘই হোক বৃষ্টির নিরাপদ আশ্রয় – মেঘের কোল থেকেই বৃষ্টি ঝরুক অঝোর ধারায় –  বুক ভরা ভালবাসা নিয়ে, প্রেম নিয়ে।

(মেঘ-বৃষ্টি কাল্পনিক চরিত্র, মা-বাবারা যারা পড়বেন সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী যদি ভুল হয়ে যায় কিছু)

শেয়ার করুন:
  • 51
  •  
  •  
  •  
  •  
    51
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.