কিরণমালা, পাখিড্রেস এবং নন্দঘোষের শ্রেণীচেতনা

শাশ্বতী বিপ্লব: সাম্প্রতিক সময়ে আমরা এক নন্দঘোষের খোঁজ পেয়েছি। আমাদের মেয়েদের, গৃহিনীদের যা কিছু আমাদের মনঃপুত হয় না, তার সব দোষ সেই নন্দঘোষের কাঁধে চাপিয়ে আমরা বালুতে বেশ আরাম করে মাথা গুঁজে থাকতে পারি।

Nodiযেমন ধরুন, আমাদের সন্তানদের বয়ঃসন্ধিকাল। খুব নাজুক সময়, তাই না? মনের মাঝে কারণে-অকারণে অভিমান জমে, নিজেকে গুরুত্বহীন মনে হয়। আমরা এই বয়সী ছেলেমেয়েদের সামলাতে গিয়ে প্রায়ই হিমশিম খাই। মনোবিজ্ঞানীরা নানাররকম পরামর্শ দেন, আমরা শহুরে বাবা-মায়েরা তা মেনে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু তারপরও কোন এক অদ্ভুত কারণে হয়তো কোন নতুন গেজেট না পেয়ে, বা কাঙ্খিত ফলাফল করতে না পেরে অথবা বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যেতে না দেওয়ার মতো আপাত তুচ্ছ কারণে তাদের কারো কারো জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে।  জীবনকে ব্যর্থ মনে করে আত্মহননের পথ বেছে নেয় ছেলেমেয়েরা।

আমরা বিষন্ন মনে লিখতে বসি, সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করুন, তার মনের খবর রাখুন। তাকে সব বিষয়ে ‘না’ বলবেন না, বুঝিয়ে বলুন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

অন্যদিকে  চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের আব্বাসবাজার-বিশ্বনাথপুর গ্রামের ১৪ বছরের হালিমা বা মানিকগঞ্জের ঘিওর সদরের গোলাপনগর গ্রামের ১৪ বছরের ছালেকা ‘পাখি ড্রেস’ না পেয়ে আত্মহত্যা করলে আমরা সেখানে অভিমান দেখতে পাই না, না পাওয়ার বেদনা দেখতে পাই না, বয়ঃসন্ধিকালের নাজুকতা দেখতে পাই না!!

হতাশা নিয়ে লিখতে বসি, ‘সব দোষ ওই ভারতীয় সিরিয়ালের। বন্ধ কর। বন্ধ কর।’

Shaswati 4
শাশ্বতী বিপ্লব

আবার ধরুন, দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে আমরা বেশ সোচ্চার। যে নারী সাহসে ভর করে অসাড় সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এলো, তাকে নিয়ে আমাদের অনেক গর্ব। কিন্তু পাখি ড্রেস না পেয়ে খুলনা পাইকগাছার গদাইপুর গ্রামের শারমিন যখন স্বামীকে তালাক দিয়ে দেয়, আমরা সেখানে সম্পর্কের অসাড়তা দেখতে পাই না। শারমিনের সাহসকে বাহবা জানাই না। অপরাধীর কাঠগড়ায় আবার সেই নন্দঘোষ। সচেতন সমাজ লিখতে বসি, ‘সব দোষ ওই ভারতীয় সিরিয়ালের। বন্ধ কর। বন্ধ কর।’

নারী নির্যাতন নিয়ে আর নতুন করে বলার কিছু নেই। কত তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণেই না প্রতিদিন চলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, হত্যা, আত্মহত্যার মতো ঘটনা। কিন্তু যখন সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে সিরিয়াল দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়ার পর বউ হালিমাকে মারধর করে হত্যার পর লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়, আমরা নির্যাতন মানসিকতার সেই কালসাপটাকে দেখতে পাই না, পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতা দেখতে পাই না। সচেতন সমাজ লিখতে বসি, ‘সব দোষ ওই ভারতীয় সিরিয়ালের। বন্ধ কর। বন্ধ কর।’

জল-জংলার এই বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার কত জানেন? প্রতি ৩০ মিনিটে একটি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। আর দিন শেষে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫০। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই ঘটে পানিতে ডুবে।না, এই শিশুদের মায়েরা তখন সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত থাকে না। কিন্তু সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুঃখজনকভাবে যখন পুকুর পড়ে মারা গেলো ৬ ও ৪ বছর বয়সী দুই শিশু অথবা কুষ্টিয়ার খোকশায় সিরিয়াল দেখার ফাঁকে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন ধরে মর্মান্তিকভাবে মারা গেলো ১০ ও ৭ বছরের আরো দুই শিশু, আমরা সেখানেও কারণ হিসেবে অনেক কিছু দেখতে পারতাম। কিন্তু দেখতে চাইলে তো দেখবো। সচেতন সমাজ চোখ বন্ধ করে লিখলাম, ‘সব দোষ ওই ভারতীয় সিরিয়ালের। বন্ধ কর। বন্ধ কর।’

এখানেই শেষ নয়, আরো আছে। হবিগঞ্জে ভারতীয় সিরিয়াল ‘কিরণ মালা’ দেখাকে কেন্দ্র করে দু’দলের ৪ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ হয়েছে। এতে নারী-পুরুষ, শিশুসহ কমপক্ষে শতাধিক লোক আহত হয়েছে। একই সিরিয়াল দেখাকে কেন্দ্র করে মারামারি, হাতাহাতি হয়েছে কুমিল্লায়। দায়ী সেই একই নন্দঘোষ।

কেন? কী দেখায় ওই সিরিয়ালে? পেশী শক্তির প্রদর্শন ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করে বা আত্মহননে উৎসাহ দেয় এমন কিছু? নারী নির্যাতন করতে বলে? সংসার, সন্তানের প্রতি অবহেলা? অথবা ওই কিশোরী বা বউটা যদি দেশীয় কোন বুটিকের পোশাকের জন্য আত্মহত্যা করতো তবে কি সেটা সঠিক কারণে আত্মহত্যা হতো? নয়? তবে, সিরিয়ালের দোষ কেন?

Serialআমাদের গ্রামীণ নারীদের, কিশোরীদের জীবন নিয়ে, বিনোদন নিয়ে আমরা কতটুকু চিন্তিত? কী ব্যবস্থা করেছি আমরা তাদের জন্য? এই তো সেদিনও নারী ও শিশুদের জন্য সন্ধ্যা মানেই গভীর রাত ছিল গ্রামীণ জনপদে। শুধু ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে সকল পুরুষ চলে যেতো (এখনো যায়) বাজার নামক জনাকীর্ণ স্থানে। সেখানে চা সিগারেট খেয়ে, আড্ডা দিয়ে, কম বয়সীরা কেরাম বা তাস খেলে রাত নয়টা-দশটা নাগাদ বাড়ি ফেরে। তখন মেয়েরা, মায়েরা সারাদিনের গৃহস্থালীর কাজ শেষে কী করেন? বিনোদনের কী ব্যবস্থা রেখেছি আমরা তাদের জন্য? নাকি তাদের বিনোদনের দরকার নেই?

মানি আর না মানি, দিনশেষে আমরা আমাদের সকল সচেতনতা, প্রতিবাদ, বিশ্লেষণ, সমাজচিন্তা, আবেগ ভালোবাসা নিয়ে সেই অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করি, যেখানে আমার বসবাস।

ভিনদেশী অনুষ্ঠান নিয়ে আমাদের উন্মাদনা কি নতুন? আশির দশকে টারজান থেকে শুরু করে সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, ম্যাকগাইভার বা নাইট রাইডার নিয়ে একরকমের উন্মাদনা কাজ করতো। নব্বইয়ের দশকে আলিফ লায়লা নিয়েও ক্রেজ কম ছিল না। এর মাঝে আরও ছিল ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ বা ‘ইন্ডিয়ান আইডল’ নিয়ে মাতম। এখনও আছে।

ইংরেজি বোঝা সমাজের জন্য ইংরেজি টিভি সিরিজ। ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করা আর রাত জেগে সিজনের পর সিজন দেখা। শুনেছি এই সিরিজগুলোর নাম জানা স্মার্টনেসের লক্ষণ। কই সেগুলো বন্ধের তো আওয়াজ তোলে না কেউ!

কিছুদিন আগে পর্নসাইট বন্ধের সিদ্ধান্তে চারদিকে সমালোচনার ঝড় উঠলো। পর্ন দেখার নাকি স্বাধীনতা থাকা উচিত!! অনেকে বললেন, এসব ফালতু এ্যাকশনে কোন কাজ হবে না, সমস্যার মূলে কাজ করতে হবে। সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলার ব্যবস্থা, মূল্যবোধ, ব্লা ব্লা ব্লা। আর ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ করলেই বুঝি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?

ইংরেজি টিভি সিরিজের দর্শক মূলতঃ শহুরে শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা। তারা আমাদের মতো বিবেকবানদের (!) সন্তান, তাই দামী। তারা সমাজের সুবিধাভোগী অংশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। আর পর্নসাইটের ভোক্তা মূলতঃ পুরুষ, সেও দামী। সুবিধাভোগী অংশের মাথা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। তাদের বিনোদন কেড়ে নেয়ার অধিকার কারও নেই।

অন্যদিকে পাখি ড্রেসের কারণে আত্মহত্যা করা কিশোরীরা তো আমাদের মতো মানুষ নয়। তারা সুবিধাবঞ্চিত অংশের প্রতিনিধি। সিদ্ধান্ত পালনকারী। তাদের বয়ঃসন্ধিকালের আবেগকে বোঝার দায় আমরা কেন নেবো?

সিরিয়াল দেখা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পরা মানুষগুলোও গ্রাম্য খ্যাতের বেশি কিছু নয় আমাদের কাছে। তাদের মাঝে বিরাজমান সামাজিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতাকে আমরা কেন বুঝতে যাবো?

গরীবের বা অশিক্ষিত চাষাভুষার দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন বলতে কিছু আছে নাকি!! সেসব তো শহুরে ব্যাপার। সারাদিন হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল আর হেঁসেল ঠেলে কাটে যে গ্রামীণ নারীর, তার মর্যাদাবোধকে বোঝার দায় তো আমাদের নয়।

ভারতীয় চ্যানেল বন্ধের হাজার কারণ আমরা দেখাতে পারি। সেগুলোর কোনো কোনোটা হয়তো যৌক্তিকও। কিন্তু এই মানুষগুলোর মনকে না বোঝার, তাদের অসহায়ত্বকে আমলে না নেয়ার, বিনোদনের অভাবকে চিহ্নিত করতে না পারার আমাদের যে ব্যর্থতা, তার দায় দয়া করে ভারতীয় ওইসব সিরিয়ালের ঘাড়ে চাপাবেন না। এতে অভিমানী আত্মহত্যা বা সাহসী তালাক অথবা মারামারি-হানাহানি কোনোটাই বন্ধ হবে না।

কিরণমালা দেখতে না পেলে অন্য কিছু দেখবে। পাখি ড্রেস না চিনলে অন্য পোশাকের জন্য আত্মহত্যা করবে। অন্তরে শ্রেণীবৈষম্য গেঁথে রেখে কি আর বাইরের বৈষম্য দূর করা যায়? মনের চারদিকের দেয়ালটা ভেঙ্গে বাইরে এসে দেখুন একবার, একই সমস্যার ভিন্ন কারণ দেখতে পাবেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.