বড় মানুষদের বড় অনুভূতি, হাতির মৃত্যু ও ক্ষুদ্র আমি

শারমিন শামস্: কোনো একটা চ্যানেলে কাজ করতাম। সেখানে এক প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিল। অযোগ্য অশিক্ষিতের হাতে ক্ষমতা টাকা পদ দিলে যা হয়, তাই হয়েছে তার ক্ষেত্রে। বিসদৃশ একটা মোটা পেট এবং শিক্ষাচারহীন চলন ছিল তার বৈশিষ্ট্য।

14009944_10208658723758357_285235023_nতো সেই লোক কোনভাবে জেনেছে আমার দুটো বিড়াল আছে। একদিন অফিসের ক্যান্টিনে সে আমার ওপর হামলে পড়লো। শারমিন, এই যে আপনি বিড়াল পোষেন, বিড়ালের পিছনে এত টাকা খরচ করেন, এদের খাওয়ান, কোন মানে হয়! কই মানুষের বাচ্চার জন্য এগুলা করেন না, কেন? বিড়ালের বাচ্চাকে দরদ দেখায়ে লাভ কী? বিড়াল তো কোন কাজেও আসে না। হ্যান-ত্যান করে করে সে প্রায় দশ মিনিট নানা কথা বলে গেল। বলাবাহুল্য আমি কোন জবাবই দিলাম না।

একটা দর্শন আমি মেনে চলি। অশিক্ষিত মূর্খের সাথে তর্কে যেতে হয় না।

যে মানুষ মনে করে পৃথিবীতে কেবলমাত্র মানুষের প্রতি মানবতা দেখানোই মানবতা, আর সব প্রাণী জাহান্নামে যাক, সেই লোক পিশাচ ছাড়া আর কিছু হতে পারে বলে আমি মনে করি না। এইসব পিশাচসদৃশ লোকই ছোট্ট বিড়ালছানার গায়ে গরম মাড় ফেলে, রাস্তার কুকুরের দিকে ইটের টুকরা ছুঁড়ে মারে, গরু-ছাগলরে অমানুষিক কষ্ট দেয়। আর যদি তা নাও করে, পোষা প্রাণীর প্রতি মমত্ব তাদের গায়ে জ্বালা ধরায়।

এখন তারা কি মানবতাবাদী? যে লোক অকারণে বিড়াল-কুকুরের মত নিষ্পাপ নিরীহ প্রাণীকে কষ্ট দেয়, কিংবা তারা আদর পাচ্ছে জেনে যার পিত্তি জ্বলে, তার হৃদয়ে মনুষ্যপ্রজাতির জন্য মানবতা, ভালোবাসা আর প্রেম আছে, সেটা কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য?

যে ভালোবাসে, সে তো কোনো বাছবিচার ছাড়াই ভালোবাসে। যার মন নরম কোমল, সে তো নিষ্পাপ নিরীহকেই আগে ভালোবাসবে। মানুষকে ভালোবাসলে একটা কুকর বিড়াল কিংবা গরু ছাগল হাতি বা ঘোড়াকে ভালোবাসা যাবে না, এই তত্ত্ব কীভাবে একটা মানবতাবোধসম্পন্ন মানুষের মাথায় খেলে, এই নিয়ে আমি মাঝে মাঝে ভাবি। বরং আমি তো দেখি যে মানুষ পশুপাখির প্রতি দয়াশীল, সেই মানুষই অন্য মানুষের বিপদে আপদে সবার আগে এগিয়ে আসে। সেইসব মানুষের এই পেটমোটা জিএম এর মত কাড়ি কাড়ি টাকা হয় না, দামি গাড়ি দামি ফ্ল্যাট হয় না বটে, কিন্তু মস্ত বড় আত্মা নিয়ে তারা পাশের বাড়ির অসুস্থ খালাম্মা থেকে শুরু করে রাস্তায় দুর্ঘটনায় পড়া কুকুর, ডানা ভাঙ্গা ছোট্ট চড়াই পাখি সকলকেই ভালোবেসে বেড়ায়। তাতে আর যাই হোক জগৎ সংসারের কোন ক্ষতি হয় না।  

আমি ওই কুৎসিত মনের জিএমটিকে বলতে পারতাম, আমার বিড়াল দুটো আমার ঘরের শান্তি। আমি তাদের ভালোবাসা টের পাই। যদি মানুষের আত্মা থাকে শরীরের ভিতরে, তবে তা টের পাবে যে কেউ। তারা ঈশ্বরের সৃষ্টি দুটো প্রাণ।

আমি বলতে পারতাম, আমার কাড়ি কাড়ি টাকা নাই বটে, কিন্তু সীমিত সাধ্যে আমি চারপাশে কত কত মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাতে আমার বিড়াল কুকুর মুরগি গরুর প্রতি ভালোবাসা কাটছাঁট করতে হয় না। ঈশ্বরের দুনিয়ায় অর্থসম্পদ কিচ্ছু নেই বটে আমার, কিন্তু একটা হৃদয় আছে, ভালোবাসতে পারি, সবাইকে।

সরিষাবাড়ির হাতিটা মরে গেল। টানা ৪২ দিন না খেয়ে থাকা দুর্বল হাতিটাকে মাত্রাতিরিক্ত ট্রাংকুইলাইজার দিয়ে দেয়া হলো। এখন এই হাতিটার জন্য আমাদের কষ্ট পাওয়া যাবে না। কেন? কারণ এটা হাতি, মানুষ তো নয়।

আমি অবাক হয়ে দেখলাম, এই সমাজ ওই জিএম এর মত লোকে গিজগিজ করছে। তাদের কাছে হাতির জন্য শোক ন্যাকামি। তাদের বক্তব্য কী? বন্যাপীড়িত লোকের জন্য না ভেবে হাতির জন্য শোক? ছ্যা ছ্যা ছ্যা।

আমার জানতে ইচ্ছে করছে, আগামী ঈদুল আজহার কোরবানির টাকাটা এদের কয়জন বন্যার্তদের জন্য দিয়ে দিয়েছেন? কিংবা কারা একটু চিড়া-মুড়ি-প্যারাসিটামল পানি বিশুদ্ধ করার ওষুধ নিয়ে ছুটে গেছেন? আমি হলফ করে বলতে পারি, যারা হাতির জন্য কষ্ট পাওয়াকে নেতিবাচক জ্বালাধরা দৃষ্টিতে দেখেন, তাদের কেউ কোনদিন একটি মুহূর্তের জন্যও বন্যার্ত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জন্য কষ্ট পেতে পারেন না। সেই আত্মা সেই মনুষ্যত্ব নিয়ে তারা জন্মান নাই।

14054703_10208658723478350_1560776489_nএকটা প্রাণী মরে গেছে। সে বাঁচার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করেছে। বিশাল শরীরটা নিয়ে পানিতে ভেসে ভেসে এতদূর এসেছে শুধুমাত্র প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে। সেই হাতিটাকে স্থানীয় লোকজন এতোটাই উত্যক্ত করেছে যে সে ডাঙায় উঠতে পারছিল না। তাকে বাগে আনতে দিনের পর দিন ব্যর্থতা বনবিভাগের। তারপর কোনধরনের চিন্তাভাবনা না করেই তাকে একটার পর একটা চেতনানাশক দিয়ে হত্যা করা হলো। আর আমরা যারা কষ্ট পেলাম পুরো ব্যাপারটিতে তাদের ওপর হামলে পড়লো কিছু লোক।

এই হলো আমাদের প্রকৃত চেহারা! একটা নিষ্পাপ অবলা প্রাণীর প্রাণে বাঁচার আকুতি অনুভব করে কষ্ট পাওয়াকে যারা ন্যাকামো, বাড়াবাড়ি থেকে শুরু করে ভারতের দালালি বলে আখ্যা দেয়ার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, তারা আর যাই হোক মানুষের বাচ্চা না। মানুষ মানে কি দুই হাত দুই পা আর উন্নত মগজ? মানুষ মানে কি মনুষত্ব নয়? মানুষের অনুভূতি কি তবে শুধু মানুষের জন্যই বরাদ্দ? বিধাতা কি এতটাই স্বার্থপর আর হীন করে সৃষ্টি করেছেন আমাদের?

মনে পড়ে সেই একই চ্যানেলের সর্বাধিকারীর কথাও। আমার সন্তানসম বিড়ালছানাটা পাঁচতলা থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে ফেলেছিল বলে একটু আগে ছুটি নিয়েছিলাম। সেই তথ্য টানা তিন বছর নানাভাবে আমাকে মনে করিয়ে দিয়ে ভর্ৎসনা করতেন তিনি।

‘বিড়ালের জন্য ছুটি নেন আপনি’। আমি উত্তর দিই নাই কখনো, সেই একই দর্শন মনে রেখে। পরে শুনেছি তার কন্যার খরগোস মরেছে বলে তার বাসার ঈদ নাকি মাঠে মারা গিয়েছিল কন্যার কান্নার ঠ্যালায়। জীবন এমনই।

যে সমাজ নিষ্পাপ অবলা প্রাণকে ভালোবাসতে শেখেনি, সেই সমাজে মানুষও নিরাপদ নয়। সেই সমাজ অনুভূতিহীন, সেই সমাজ স্বার্থপর, হীন। আর তাই সেই সমাজে রাজন, রাকীবের উপর নির্যাতনের মত ঘটনা বারবার ঘটে, মিলনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় গ্রামভর্তি লোকের চোখের সামনে।

এই সমাজে দুই ঠ্যাংওয়ালা মানুষ ঘুরে বেড়ায় আর মানুষের পাশে দাঁড়াবার ভান করে। ধিক, শত ধিক সেইসব মানুষদের!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.