মাতৃত্ব বনাম নিজস্বতা

কাকলী তালুকদার: মেয়েরা অকর্মণ্য, শক্তিহীন, দুর্বল, আরও অনেককিছু! আমিও আজকাল নিজেকে তাই মনে করি। আমি ইচ্ছে করলেই আগের মতো ইচ্ছে ঘুড়ি নিয়ে আকাশে উড়ে যেতে পারি না। গত ছয় বছরে ওয়াশরুমে নিজের প্রয়োজনীয় সময়টুকু ব্যয় করার আগেই দরজায় নক পড়েছে হাজার বার। পারি না হুট করে একলা নিরুদ্দেশ যাত্রায় অংশ নিতে।

Working momছোটগল্পের বইগুলো একসময় প্রিয় ছিল, মনের মতো সিনেমা দেখার জন্য অনেকবার বসেছি, প্রিয় বই, ল্যাপটপ সব অল্প সময়েই দখল হয়ে যায়। এই মোবাইল ফোনটাও দিনের একটা বড় অংশ কার্টুন দেখার কাজে আমার হাতছাড়া হয়ে যায়।
গত তিন বছর জব করি না, ছেলেটা জন্মাবার আগেই মাতৃত্বকালীন ছুটি শুরু করেছিলাম। সেই সময় শেষ করে আরও দুবছর কাটিয়েছি জবলেস।
এখানে জব বলতে অর্থের বিনিময়ে কাজের কথা বলছিলাম। তবে আমি কাজ ছাড়া চব্বিশ ঘন্টা পার করি না আজ ছয় বছর।

আমার কাজের কোনো সময়-অসময় নেই। রাতে ঘুমের মাঝেও অনেকবার ঘুম ভাঙে বাচ্চাদের বিভিন্ন আচরণে।
আমি মা, আমি শক্তিহীন, দুর্বল। আমার দুই ডানায় ভর করে থাকে সভ্যতার ধারক আমার সন্তান। আমার ওজন বেড়ে যায়। আমি উল্কার মতো ছুটতে পারি না, আমার শরীরের সাথে আরও দুজনের ওজন মিশে যায়। আমি অর্থের মুক্তির খোঁজে ছুটতে পারি না, আমার সন্তান নিরাপত্তাহীন হয়ে যায়।

আমার কোনো নিজস্বতা নেই, বিরক্তি নেই, ক্লান্তি নেই। চাওয়া নেই, স্বপ্ন নেই মায়েদের এইসব থাকতে নেই। আমার মাতৃত্বের দায়িত্ব আছে, দায় আছে, কিন্তু অধিকার নেই। দায়িত্বের চেয়েও দায় বেশী। এই দায় নারীকে বুঝতে হয় সরল হিসাবের মতো।

Asian Motherএখানে প্রশ্ন করলেই মাতৃত্বের অপমান। আমার হম্বিতন্বি করার যোগ্যতা নেই, তাই আমার চড়ুই পাখিসম কোনো স্বপ্নও থাকতে নেই। আমার কোনো চারপাশ নেই, আমার কোনো দায়িত্ব নেই ফেলে আসা পরিবারের জন্য। কারণ আমি মা, আমি মানুষের মতো একক আমিত্ব নিয়ে বাঁচার অধিকার হারিয়েছি যেদিন মা হয়েছি সেদিনই।

রান্নার সময় মনের অজান্তেই বড় মাছের টুকরোগুলো স্বামী আর সন্তানের নামে ভাগ হয়ে যায়। সন্তান হওয়ার সাথে সাথে নিজের প্রিয় রঙের শাড়ীটি ছুটি নেয় মনের কোন থেকে। ছোট ছোট জামাগুলোই নিজের পছন্দের হয়ে উঠে। নিজের নিজস্বতাকে দখল করে নেয় সন্তানের মুখ।

রাষ্ট্রের আইন, ধর্মের আইন, মনের আইন নারীকে সমতায় দাঁড় করাতে পারে না পুরুষের সাথে। সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার এই কথা বলার সাথে উদার পুরুষগণ হাজারো যুক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে যান পথে-মাঠে-ঘাটে।
আহা নারী, তোমার অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন বড্ড ভুল। এই অধিকার তোমার কীসে প্রয়োজন! তোমার খাওয়া, পড়া, বসা সবকিছুর জন্য পুরুষ প্রস্তুত। তোমাকে দেবী, মাতা, ভগ্নি, স্ত্রী রূপেই বেশী সহনীয় লাগে। তুমি নিজেকে একক মানুষ হিসেবে কেন ভাবতে চাও! তুমি স্বাধীনতার কথা মুখে বলো, বরং বেশী বেশীই বলো, তবে সেটাও একটি পদবীকে সামনে রেখে।
সেটা কখনই একক মানুষ হিসেবে নয়, তুমি নারী, সভ্যতা টিকিয়ে রাখা তোমার দায়।
দায়িত্ব হলে তোমার থাকতো সমতার এক সমাজ। যেখানে ভাগাভাগি হয়ে যেতো জীবনের সুখ-দুঃখ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.