হাসপাতাল ও জীবনের গল্প (৩, ৪)

শান্তা মারিয়া: ভদ্রমহিলা ফিলিপাইনের আমি প্রথমে মনে করেছিলাম ঊনি পার্বত্য চট্টগ্রামের মেয়ে হবেন কারণ ভালোই বাংলা বলছিলেন তিনি পরে আলাপ করে জানলাম, ২৭ বছর ধরে বাংলাদেশে আছেন তাঁর স্বামী একজন বাঙালি স্বামীর নাম বললেন চৌধুরী

Shanta 2
শান্তা মারিয়া

আইসিইউতে আমার বাবার পাশের বেডেই ছিলেন ঊনার স্বামী দেখতাম কী গভীর মমতায় স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তিনি বিদেশে একসঙ্গে চাকরি করার সময় তাদের পরিচয় তারপর প্রেম ও বিয়ে বাঙালিকে ভালোবাসার টানে ঢাকাতেই আবাস গড়েছেন বিভিন্ন দূতাবাসে কাজ করেছেন ভদ্রমহিলা এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম দিয়েছেন ঢাকাতেই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে লন্ডনে থাকে বেশ সুন্দরী মেয়েটি বাবার অসুখের খবর পেয়ে উড়ে এসেছে ঢাকায়

ছেলেটির কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন তিনি ছেলেটি মারা গেছে ২০১০ সালে ও লেভেল পরীক্ষার্থী ছিল সে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে বিরিয়ানি খেতে গিয়েছিল বাড়িতে ফেরে মৃতদেহ রূপে মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার ছেলেকে ওর বন্ধুরা খুন করেছে কিন্তু বলেছে দুর্ঘটনা আমি ছেলের হত্যার বিচার পাইনি আমি বিদেশি তাই আমার অভিযোগ কেউ শোনেনি ছেলের মৃত্যুর শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে স্বামী আমার স্বামীও বাঁচবে না

আজকে আমার স্বামী আইসিইউতে আমি একা মানুষ একাই দৌড়াচ্ছি তোমাদের দেশে চেনা লোক না থাকলে বিচারও পাওয়া যায় না, চিকিৎসাও পাওয়া যায় না আজ যদি আমার ছেলে বেঁচে থাকতো তাহলে নিজেকে এত অসহায় লাগতো না

আমার স্বামীও বোধহয় বাঁচবে না জীবনে আমি আরও একা হয়ে যাবো’। ভদ্রলোক বাঁচবেন কিনা জানি না তবে আইসিইউর বন্ধ দরজার সামনে অসীম ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিদেশিনীর চেহারা আমি কোনোদিন ভুলবো না একথা নিশ্চিত

৪) সব গল্প দুঃখের হয় না কিছু গল্পে সুখের ছোঁয়াও থাকে যদিও শেষ পর্যন্ত সব গল্পই মৃত্যুর গল্প অথবা মৃত্যুতে জীবনের শেষ নয়, বরং সব মানুষই মৃত্যুঞ্জয়ী অপেক্ষা কক্ষে বসে এসব ভাবছিলাম, চোখে পড়লো একটি মেয়ে কোণের দিকের আসনে চুপচাপ বসে আছে চোখে জল নেই, কেমন যেন উদাসীন ভাব ওর ননদ আমাকে ইশারায় দেখালো, ‘ওই আমার ভাবী’ বুঝলাম মেয়েটির স্বামীর কথাই এতোক্ষণ শুনছিলাম

আইসিইউ’র দশ নম্বর বেডে শুয়ে আছে যে ছেলেটি, তার বয়স ৩৫ বছর বিয়ে করেছে গত ডিসেম্বরে তার মানে এক বছরও পুরো হয়নি ছেলেটির বোন এতোক্ষণ আমার সঙ্গে কথা বলছিল ওরা দুইভাই একবোন বাবা মা গ্রামের বাড়িতে থাকেন ছেলের অসুস্থতার খবর পেয়ে ঢাকায় চলে এসেছেনছেলেটির চাচাতো বোনও আছে ওরা সবাই একসঙ্গে একপাশে বসে কথা বলছে, ছুটাছুটি করছে, গল্পও করছে কিন্তু এদের সঙ্গে কোনো যোগ নেই বউটির আমাকে আকর্ষণ করলো ওর চোখের নির্লিপ্ত দৃষ্টি যেন ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে ও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে এমনকি শোক থেকেও

মেয়েটি কথা বলতে চায় না তবু ধীরে ধীরে কয়েকদিন ধরে ওর সঙ্গে অল্প অল্প কথা হলো ওর বাবা নেই মা থাকেন গ্রামের বাড়িতে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ বিয়ের পর থেকে স্বামীর সঙ্গে ঢাকাতেই ছিল শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠতা এখনও হয়নি স্বামী বেশ স্বাস্থ্যবান যুবকঈদের ছুটিতে নতুন বউসহ গিয়েছিল শ্বশুরবাড়িতে, গ্রামে সেখানেই হঠাৎ করে প্যাংক্রিয়াসের ইনফেকশন হয়ে গুরুতর অসুস্থ ডায়াবেটিসও ধরা পড়েছে। ডাক্তাররা বাঁচার আশা দিতে পারছেন না

ছেলের বাবা মায়ের অভিযোগ হলো, নতুন বিয়ে করে ছেলে পর হয়ে যাচ্ছিল, নইলে ঈদের ছুটিতে নিজের গ্রামে না গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গেল কেন? না, বউটিকে সরাসরি হয়তো ‘অপয়া’ বলা হচ্ছে না, কিন্তু তারসঙ্গে একটু শীতল আচরণ যে করা হচ্ছে সেটা বাইরের লোকেরও চোখে পড়তে বাধ্য

আমার বাবাকে দেখতে আইসিইউর ভিতরে যখন ঢুকলাম তখন দশ নম্বর বেডের দিকে একটু না তাকিয়ে পারলাম না বেশ স্বাস্থ্যবান লোক তবে দেখতে একেবারেই ভালো নন। সুন্দরী বউটির পাশে কিছুটা বেমানান মনে হলেও সেটা ওর অসুস্থতার কারণেও হতে পারে মনে মনে বললাম, ভাই সেরে উঠুন তাড়াতাড়ি আপনার স্ত্রীর পাশে দাঁড়ান

এটা কিছুদিন আগের ঘটনা এরপর ভদ্রলোক কিছুটা সুস্থ হয়েছেন এখন তিনি ওয়ার্ডে আছেনকাল ওর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়েছে চোখে সামান্য একটু আনন্দের ছোঁয়া দেখে বড় ভালো লাগলো  প্রার্থনা করি, ঈশ্বর যেন তার এই আনন্দটুকু কেড়ে না নেন

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.