ছেলের পরিবার বনাম মেয়ের পরিবার

সানজীদা আক্তার খান: মেয়েদের নাকি নিজের কোন বাড়ি নেই। বিয়ের আগে থাকে বাবার বাড়ি আর বিয়ের পরে থাকে স্বামীর বাড়ি। তাই বুঝি মেয়েরা এত অবহেলিত। প্রাচীন যুগে তো মেয়ে জন্ম নিলে জ্যান্ত কবর দেয়া হতো। এখনও ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কন্যা সন্তান জন্ম নেয়াটাকে পাপ মনে করা হয়। ভ্রুণ অবস্থাতেই কন্যা সন্তানকে মেরে ফেলা অপরাধের মধ্যেই পড়ে না।

তারপরও সময় পাল্টেছে, তাই বলে মানুষের মানসিকতা পাল্টায়নি। শুধুমাত্র পদ্ধতিগত পরিবর্তন এসেছে। এই একুশ শতকে এসেও ছেলে এবং ছেলের পরিবার মেয়ে এবং মেয়ের পরিবারকে বিভিন্নভাবে পদ্ধতি পরিবর্তন করে ছোট করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

Sanzidaছেলের পরিবার বলতে শুধু ছেলেই থাকবে তাতো নয় বরং ছেলের পরিবারের মেয়ে সদস্যরাও পরিবারের বৌদের প্রতি বিরূপ আচরণ করে থাকে। এবার একটু বিশ্লেষণ করা যাক। ছেলে বিয়ে করানোর সময় পরিবারের সদস্যরা প্রচুর মেয়ে দেখবে এবং তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করবে। গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের উচ্চশিক্ষিত ধনী পরিবার পর্যন্ত ঘটনা প্রায় একইরকম হয়ে থাকে। মেয়ের গায়ের রং কেমন, চেহারার গঠন কেমন, উচ্চতা, শিক্ষিত কীনা, মেয়ের মা, বাবা, ভাই, বোন থেকে চৌদ্দ গোষ্ঠী পর্যন্ত কে, কী করে ইত্যাদি ইত্যাদি হাজারও প্রশ্ন থাকে মেয়ের পরিবারের উপর।

মেয়ের পরিবার যেন ভুলেও ছেলের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করবেন না, তাহলে জীবনেও মেয়ে বিয়ে দিতে পারবেন না, অগত্যা সে আপনাদের বোঝায় পরিণত হবে। ছেলে শিক্ষিত না অশিক্ষিত, কালো নাকি ফর্সা, নাক আছে না নাই, লম্বা না বেঁটে, টাক মাথা, না চুল আছে, নেশাখোর নাকি ভদ্র, পাগল নাকি সুস্থ, পরিবারে কুটনামির রেওয়াজ আছে না, নেই ইত্যাদি প্রশ্ন কিন্তু মুখ ফসকেও জিজ্ঞেস করা যাবে না, তাহলেই মরণ!

আর যদি বিয়ে ঠিক হয়েও যায় তবে তো ছেলেদের পরিবারের চাওয়া-পাওয়া সবে শুরু হলো। আমাদের ছেলে এই, আমাদের ছেলে ওই, মেয়ে বিয়ে দিতে চাইলে এই দিবেন, ওই দিবেন, এসব লেগেই থাকবে। একেবারেই তা বলতে না পারলে মেয়ের ভালো থাকার জন্য, মেয়ের সুখের জন্য আপনি তো সামান্য ‘উপহার’ দেবেনই। ওই যে প্রথমেই বললাম পদ্ধতিগত পরিবর্তন!

বিয়ের পর মেয়েটি হয়ে যায় ছেলের বাড়ির কেনা সম্পত্তি। মেয়ের পরিবার তখন হেলাফেলার বস্তু। মেয়েটার নতুন করে জন্ম হয়, নাকি আসলে তার আগের অস্তিত্ব মৃত্যুবরণ করে সেটা বোঝা কিছুটা অসম্ভব হয়ে পরে।

মেয়েটার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, শখ-আহ্লাদ, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ সবকিছুর মালিক তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা। মেয়েটি তার রক্তের বন্ধনকে বুকে ধারণ করে শ্বশুরবাড়ির একজন হয়ে যায় তাদের ঐতিহ্য, নিয়ম-কানুন, আচার-আচরণ অনুসরণ করার প্রচেষ্টায় ডুবে যায়।

বিয়ের আগে যে মেয়ে মায়ের কাছে বসে সারাদিনের সব ঘটনা প্রাণ খুলে বলতো, বিয়ের পর সেই কথা শোনার আর কেউ থাকে না। যে বাবা মেয়ের মুখটা না দেখলে অস্থির থাকতো, সেই বাবার বুক ফেটে চৌচির হয়ে গেলেও মেয়ে আর তার কাছে আসতে পারে না। এমনও পরিবার আছে যারা মেয়ের মা-বাবার সাথে টেলিফোনে কথা পর্যন্ত বলতে বাধা দেয়।

বিয়ের আগে যে মেয়েটি চঞ্চলতায় পরিপূর্ণ ছিলো, সে বিয়ের পর আস্তে করে শান্ত হয়ে যায়। তখন তার পদে পদে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়, কে জানে আবার কী থেকে কী হয়ে যাবে সেই ভয়ে।

অন্যদিকে ছেলেটির জীবনে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে শুধুমাত্র একজন নতুন মানুষ যোগ হওয়া ছাড়া তেমন কোন পরিবর্তন আসে না। আগে হয়তো মায়ের কাছে এক কাপ চা চাইতো, এখন বৌয়ের কাছে চায়, আগে মা ঘর গুছিয়ে রাখতো, এখন বৌ রাখে। ছেলেটির জীবনে মেয়েটির পরিবার খুব একটা প্রয়োজনীয় কিছু নয়। তারা তো বৌ এর মা-বাবা, তার কীইবা করার আছে।

কালে-ভদ্রে এক-আধদিন ফোনে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে নিলেই হবে। তারা তো মেয়ে জন্ম দিয়েছে, ছেলে নয়। সুতরাং ঊনাদের নিয়ে বেশি মাথা না ঘামানোই বুদ্ধিমানের কাজ। ছেলে নিজে তার পরিবারের খোঁজ-খবর না রাখলেও, বৌ ঠিকমতো তার পরিবারের দেখাশোনা করছে কীনা সেই খোঁজখবর সে ভালোই রাখে। কিছু পরিবার আছে যারা মনে করে বিয়ের পর মেয়েদের মা, বাবা, ভাই, বোন তথা রক্তের কোন সম্পর্কই থাকতে পারবে না, এতে করে ছেলেটির সংসারে অশান্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

ছেলেটি কখনোই কোন এক অদ্ভুত কারণে মেয়েটির পরিবারকে মূল্য দিতে পারে না এবং কীসে যে তাকে বাধা দেয়, সেই কারণটাও অজানা। অপরদিকে ছেলেটির যদি বোন থাকে তার অবস্থান হয় বৌ এর উপরে, ভাবসাব দেখলে মনে হবে তারা কখনোই তাদের মেয়েকে বিয়ে দিবে না, অথবা তাদের মেয়ের অবস্থান অন্য পরিবারে সবার উপরে থাকবে।

বিয়ের পর মেয়েটি তার শ্বশুরবাড়ির সবাইকে আপন করে নেবে, কিন্তু ছেলেটির এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, বরং সম্পূর্ণভাবে ছেলেটির মানসিকতা অথবা ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। যদি ছেলের পরিবার ছেলেটিকে সেই শিক্ষা দিতো এবং মানসিকতায় পরিবর্তন আনতো যার কারণে ছেলেটি তার বৌ এর পরিবারকে মূল্যায়ন করতো, সুখে-দু:খে সবসময় তাদের পাশে দাঁড়াতো, তবে সমাজে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এত দূরত্ব সৃষ্টি হতো না। শ্বশুরবাড়ীর বিরূপ পরিবেশের কারণে আজও আমাদের দেশের মেয়েরা সমাজে পিছনের সারিতেই পড়ে আছে।

 

 

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.