কামগন্ধী গৃহকোণে বকুল ফুল

তাসলিমা আক্তার: নাম কেন নিষিদ্ধ পল্লী, এ এক বিস্ময়! লোকে তো এই পল্লীতেই যাচ্ছে দেদার। নাকি পল্লীর বালারা নিষিদ্ধ, সমাজের কাছে কিংবা সূর্যের আলোয় ভদ্রলোকের কাছে! এ সকল ভদ্রলোকের ঝামেলা আছে।

ব্রোথেল ওয়ার্কারদের নিয়ে কিছু কাজ ছিল এক সময়। কাজের অংশ হিসেবে তখন ব্রোথেলে যেতে হতো মাঝে মধ্যে। আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ রাবার আর লুব্রিকেন্ট ডিস্ট্রিবিউট করতাম। সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলতে যেতাম। চেতনা কার কতটুকু জাগাতে পারতাম, কে জানে!

Saudi sexঠিক মনে করতে পারি, তখন ছিল শেষ সকাল। এগারো কিংবা সাড়ে এগারোটা হবে। এই পল্লীর বাসিন্দাদের ঘুম ভাংগে একটু দেরি করে। তাই সকালটা এখানে রাতভর তুফানের পর প্রমত্ত পদ্মার শান্ত রুপ।
মেয়েটি সবে ঘুম থেকে উঠেছে। চোখ তখনো ফুলে আছে। কন্ঠে ঘুম জড়ানো আলসেমি। দরজার কপাট খুলে সে একটু সরে দাঁড়ালো। আমি ভেতরে গেলাম। মেয়েটির চোখে খানিক বিস্ময় খেলা করে। হয়তো ভাবে, আমি কে?

প্রায়ান্ধকার একটা কক্ষ। ঝলমলে রোদের সকালেও প্রায় কিছুই দেখা যায় না। স্যাঁতস্যাঁতে। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। ঘরের আসবাব বলতে একটি আলনা, একটি চেয়ার, একটি ড্রেসিং টেবিল আর একটি খাট। খাটের উপর ফুলতোলা বাহারি বিছানা চাদর। আমি বসার জন্য ওর অনুমতি চাইলাম। সে একটু কাঁচুমাচু করে বললো, “আপনে এই বিছানায় বসবেন? তার চাইতে চেয়ারে বসেন।” মেয়েটি হয়তো চায় না, বহু পুরুষের বীর্যে মাখামাখি বিছানায় আমি বসি।
ধরে নেই তার নাম বকুল। বকুলের জীবনকাল কুড়ি বছরের বেশি হবে না। বেশ মিষ্টি একটা মায়াময় মুখ। লং স্কার্ট আর একটা টি-শার্ট পরে আছে। বকুল মাথায় আমার সমান। আমি বললাম, বসো বকুল। এরপর আমি আমার রুটিন মতো তার সাথে কথা বলি। ছকে বাঁধা কথা।

Taslima Akter
তাসলিমা আক্তার

বকুলের গ্রামের বাড়ি বরিশাল। পানির দেশের মেয়ে। সে যখন ঢাকায় এসেছিলো তখন তার বয়স চোদ্দ ছিলো। বকুল স্কুলে পড়তো। আসা-যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে থাকতো দুলাল। হিরোদের মত দেখতে। কথাও বলতো কী সুন্দর করে! দুলালকে ভালবেসেছিল কিশোরী বকুল। যেদিন ঢাকায় এসেছিল সেদিন ছিল মঙ্গলবার, ভাদ্রমাস।

দুলালের সাথে দেহজ বিনিময় গ্রামে থাকতেই হতো মাঝে মধ্যে। এবার বিয়ের স্বপ্নে বিভোর কন্যা গ্রাম ছেড়েছে। গোলাপী শাড়ি আর একটি নিজের ঘরের স্বপ্ন। যে ঘরে দুলাল আর বকুল এসে উঠেছিলো সেটি ছিলো দুলালের বন্ধুর ঘর। সে রাতে শুধু দুলাল নয়, আরও অচেনা পাঁচজন মিলেমিশে ভাগ করে নিয়েছিলো বকুলের সুরক্ষিত কিশোরী শরীর। এভাবেই কেটেছিলো আরও কিছুদিন। তারপর আর আসেনি দুলাল। বন্ধুরাও না।

পথে পথে ঘুরেছে বকুল, ভিক্ষেও করেছে। রাতের ফুটপাথে প্রায় প্রতিদিন ধর্ষিত হয়েছে কারো না কারো কাছে। শেষে ইচ্ছে করেই জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে যৌনকর্মকে। বকুল আমাকে বলেছিলো, “শরীরে পুরুষের কামড় সহ্য করা যায় আপা, পেটে ক্ষিদার কামড় সহ্য করা যায় না।” হয়তো তাই।  আমরা যারা ক্ষিদের কষ্ট জানি না, তারা কি করে বুঝবো, কোন কামড়টি অধিক যন্ত্রণার।
বকুলের জন্য বরাদ্দকৃত সময় শেষ। টুকটাক নোট নেয়া হয়ে গেলে আমি উঠে দাঁড়াই। আমি তার মাথায় হাত রেখে বলি,
“ভালো থেকো বকুল, আজ আমি যাই?”
বকুল তার মাথার উপর আমার হাত ধরে থাকে। বকুলদের গায়ে কেউ নিষ্কাম হাত রাখে না। হয়তো তাই তার ভালো লাগে। হয়তো সেই সময় পানির দেশে তার ফেলে আসা বোনটির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল।
আমি হাত ছাড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসি। বকুল দরোজার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।

আমি আমার কাজ সেরে অফিসের দিকে যাচ্ছি। বকুলও কিছুক্ষণ পর তার কাজে যাবে। আমি জীবনে কোনো ভুল করিনি তাই আমার পেশাকে বলা হয় সম্মানজনক পেশা। আর ভুল করা মেয়ের পেশাকে বলে, “নিষিদ্ধ পেশা।”
রোদ তখন মাথার উপরে। আমার বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য শূন্য লাগে। তাকাবো না করেও একবার পেছন ফিরে তাকাই। বকুলের ডান হাতটা তার চোখের নিচে। হয়তো চোখে কিছু পড়েছে, বকুল সেটাই পরখ করছে। আমি প্রাণপণে বিশ্বাস করতে চেষ্টা করি, বকুল কাঁদছে না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.