আমাদের সন্তান আসলে কার?

সাদিয়া নাসরিন: হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা কোন সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে এসে বাঁশিতে ফুঁ দিল, আর ঝাঁকে ঝাঁকে আমাদের সন্তানেরা দিক-বিদিক ভুলে সেই বাঁশির সুরে ঝাঁপ দিল বেহেস্তের সমুদ্রে? হঠাৎ বেজে উঠা এক সম্মোহনী সুর মূহুর্তেই কেটে দিল নাড়ী ছেঁড়া রক্তটান? পলকেই ভুলিয়ে দিল দীর্ঘ বছরের মায়ের শরীরের গন্ধ-তাপ, বাবার ওম, বোনের খুনশুটি?

Sadia Nasrin
সাদিয়া নাসরিন

মায়ের স্বপ্ন দিয়ে আকাশ সাজাবে বলে রোজ রাতে আকাশের গল্প শুনে বড় হওয়া ছেলেটা হাতের বাইরে গেলেই হাতছাড়া হয়ে গেলো শুধুই ধর্মের টানে? এমন সম্মোহন? যে সন্তান আমার গায়ে লেপ্টালেপ্টি করে বড় হয়েছে, আমার হাতে হাত ধরে অ আ ক খ শিখে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল, ক’মাসেই সেই ছেলের মগজের দখল নিয়ে নিল কোন এক বাঁশিওয়ালা? বিষয়টি কি এতোই সরল অঙ্কে মেলানো হিসেব? আমি বিশ্বাস করি না। চিত্রকল্প অন্য কোথাও লেখা হয়েছে বহু বছর ধরে সঙ্গোপনে, সাবধানে।

দৃশ্যত আজ বাংলাদেশ রক্তাক্ত পথভ্রষ্ট তারুণ্যের অভিশপ্ত পদচারণায়। যে তারুণ্যের মাথা থেকে মগজ খুলে নিয়ে চাষ করা হয়েছে ধর্মান্ধ রাজনীতির। আমরা ধরেই নিয়েছি সে চাষ শুধু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিমণ্ডলে হয় এবং তারুণ্যে এসেই মৌলবাদী জঙ্গি রাজনীতির ঘেরাটোপে আটকে পড়েছে আমাদের সন্তানরা। কিন্তু আমরা জানতেও পারিনি, আমাদের সন্তানের মগজের বেচাকেনা হয়ে গেছে সেই শিশুকাল থেকে সুকৌশলে। যার ফলটা তারুণ্যে দেখা গেলেও বীজ কিন্তু বপন করা হয়েছে শৈশবের বর্ণ পরিচয়ের সাথেই।

আমার খুব মনে পড়ে, আমাদের বিশাল যৌথ পরিবারের হাঁড়ি ঠেলতে ঠলতে চুলার পাশে বসিয়ে আম্মা শেখাতেন “অ-তে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো, আ-তে আলস্য দোষের আকর”। আমরা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। কিন্ডারগার্টেন নামের এই শিক্ষাব্যবস্থা তখনো গড়ে উঠেনি। হয় মাদ্রাসা, নয় স্কুল। কিন্তু হটাৎ করে এদেশে (খুব সম্ভবত স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলে) বাংলা, আরবী আর ইংরেজির মিশেল দিয়ে এক অদ্ভুত রকমের “কিন্ডারগার্টেন” বা কেজি স্কুল চালু হয়ে গেল ঝাঁকে ঝাঁকে। দেখলাম, আমাদের ছোটরা হঠাৎ করে অন্যরকম বর্ণ পরিচয় শিখছে, “অ-তে অজু কর, পাক হও/ আ-তে আলকোরান হাতে লও”।

আপাত নিরীহ এই বর্ণপরিচয় জনপ্রিয় হয়ে গেল নব্য “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” হওয়া এই বাংলাদেশে। ক্রমান্বয়ে ঈ-তে ঈগল রুপান্তরিত হলো “ঈদ”/ এ-তে একতারা হয়ে গেলো এবাদত। ম-তে মসজিদ, দ-তে দোয়া আর ত-এর তসবি ছড়িয়ে গেলো আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশের বর্ণমালায়।

এই বর্ণমালা সার্বজনীন নয়। এই বর্ণমালা মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জন্ম নেয়া আমার সেক্যুলারিজমের কথা বলে না। এই বর্ণমালা আর বাংলা আরবীর পাঁচমিশালি শিক্ষা ব্যবস্থা খুব ধীরে ধীরে আমাদের শিশু সন্তানের অবচেতন মনোজগতে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করতে থাকে।

আমার ছোট দুই ভাই যে কেজি স্কুলে পড়েছে সেটি শিক্ষা এবং মান বিচারে কক্সবাজারে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। “শহীদ তিতুমীর” নামের সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খুব সচেতনভাবে শিশুদের শেখানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথ হিন্দুদের কবি, আর নজরুল মুসলমানদের।

জীবনের শুরুতেই হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনে পড়ে যাওয়া আমার ছোট ভাইটি যখন অ-তে “অজু” আর ক-তে “কোরান” পড়তে পড়তে তার পাশে বসে থাকা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান বন্ধুদের শুকনো মুখ আড়চোখে দেখে, তখন তার অবচেতন মন এক নিষ্ঠুর জিতে যাওয়া হাসি হাসতে শিখে।  

Gulshan 11একই চিত্র কিন্তু ঢাকার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলেও। যখন আমার সন্তান ইসলামিক রিলিজিওনের ক্লাস করে, অল্প সংখ্যক বিধর্মী(?) শিশু সেইসময় অন্য রুমে গিয়ে “মোরাল এডুকেশনের” ক্লাস করে। ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে যাওয়া সহপাঠিদের কোনা চোখে দেখতে দেখতে তখন থেকেই তো অবচেতনে নিজেকে রিলিজিয়াস সুপিরিয়র ভেবেছে আমাদের সন্তানেরা। আজকের তরুণ নিব্রাসরা যখন বিধর্মীর ধর্ম পরীক্ষা করে তাদের রক্তে হোলি খেলার আনন্দে হাসে, আমরা তখন হতবিহবল হয়ে ভাবি, আমাদের সন্তান এতো জীঘাংসা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল? অথচ জীঘাংসার এই হাসি আমার সন্তানের মগজের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে সেই শিশুকালেই সুপিরিয়রিটির নামে।

না, আমাদের অসাবধানতাবশত বা খামখেয়ালিপনায় আমাদের সন্তানরা এই সঙ্কটে পড়েনি। পরিকল্পিতভাবেই পুঁজিবাদি শিক্ষার বিস্তারে বিনিয়োগ করেছে ৭৫ পরবর্তি মৌলবাদি অর্থনীতি। সাম্প্রদায়িকতার সাবানে আমাদের সন্তানের মগজ ধোলাই করে দেওয়ার চক্রান্তে রাষ্ট্রীয়ভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়। এর ফলে এমন সব স্কুল, মাদ্রাসা এদেশে ছড়িয়ে গেল যেখানে সুন্দর ফুটফুটে সব বাচ্চারা স্কুলে এসেম্বলি করে না, জাতীয় সংগীত গায় না। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার গল্প পড়ানো হয়, কিন্তু কখনো পড়ানো হয়না মাষ্টারদা সুর্যসেন, প্রীতিলতা আর ক্ষুদিরামের বীরত্বের ইতিহাস। ওদের শেখানো হয়নি শহীদ আজাদ-রুমী-মতিউরের বীরগাঁথা গান। বরং ওরা আবেগে আপ্লুত হয়ে গেয়েছে “এই দেশ শাহজালালের…এখানে শহীদ তিতুমীর বাঁশের কেল্লা গড়ে/ঈমানের অস্ত্র নিয়ে খোদার পথে লড়ে”। আর তাই শিশুকালে ধোলাই হওয়া মগজ তরুণ বয়সে ঈমানের অস্ত্র নিয়ে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে কোন অসুবিধা হয়না।

শহরে-গ্রামে ছড়িয়ে পড়া এসব স্কুলে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পড়ানো হয় না, বরং স্কুলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে গিয়ে শিশুদের জানানো হয়, ভারতের চক্রান্তে মুসলমানদের থেকে আলাদা হয়ে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। মফস্বলের কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্ত ঢাকার নাম করা ক্যাম্ব্রিজ কারিক্যুলামের ইংলিশ মিড়িয়াম স্কুলে যখন বলা হয়, “যারা জয়বাংলা স্লোগান দেয় তারা খারাপ ছেলে”, বাসায় জয় বাংলা উচ্চারণে অভ্যস্ত সেই শিশুটা তখন জয়বাংলা বলার কারণে অপরাধবোধে ভুগতে থাকে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্র “জয়বাংলা” এবং রক্ত নদী সাঁতরে আসা স্বাধীনতা তাই এই শিশুদের চেতনায় কোন গৌরব নিয়ে আসে না, বরং গ্লানিতে জর্জরিত করেছে। শিশুকাল থেকে স্বাধীনতাকে গ্লানি মনে করে বেড়ে উঠা এই প্রজন্ম, বিশ্বাস নড়ে যাওয়া এই মগজ কীভাবে রুখবে আজ প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালাকে?  

আমাদের শিশুরা এসব স্কুলে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করতে পারে না। “পাক হানাদার” “রাজাকার” “আলবদর” এই শব্দগুলোর ইতিহাস ওদের জানানো হয় না। স্কুল থেকে বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসের প্যারেড করে না, একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে যায় না। বিজয় দিবস আর স্বাধীনতা দিবসের মধ্যে প্রায়ই গোলমাল করে ফেলে।

এরা এক অদ্ভুত বিতর্ক তৈরি করে ,“জাতীয় সঙ্গীতে যে “ওমা” বলতে হয়, সেই ওমা হলো হিন্দুদের দেবীর নাম। তাই জাতীয় সঙ্গীত গাইলে গুনাহ হবে (!!)”।

হায়রে !!! আমরা শুধু মেনে নিতে থাকি। আর সময় পেরিয়ে গেলে বসে বসে তারুণ্যের ক্ষতে মলম দিতে থাকি। এই ফাঁকতালে আমাদের হাত গলে বের হয়ে যায় আমাদের সন্তানের শৈশব।

এভাবে প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষার মরণ কামড়ে ধর্মান্ধতার নীরব বিষে নীল হয়ে আমার সন্তান যখন লাশকাটা ঘরে বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে থাকলো, তখন আমরা ভাবতে বসি, কোথা থেকে কী হয়ে গেল? কোন এক কাবুলিওয়ালা এসে না দেখা জান্নাতের লোভ দেখিয়ে চুরি করে নিয়ে গেল আমার সন্তান!

তবু আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখি না, কতোটা আমার ভুল আর কতটা জাতির দায়। আমার নাড়িছেঁড়া সন্তান কেন আমাকে পেছনে ফেলে ছুটে যায় জান্নাতের গল্প বলা ভয়ঙ্কর মরীচিকার পেছনে? আমার সন্তান আসলে কার? আমার, নাকি ধর্মান্ধ পুঁজিবাদি শিক্ষার বেসাতি করতে আসা সেই কাবুলিওয়ালার? আমার সন্তান তাহলে কার? আমার, নাকি জেহাদের মরণ বীণ বাজানো সেই বাঁশিওয়ালার?

সাদিয়া নাসরিন/০৫।০৮।২০১৬

 

শেয়ার করুন:

আমাদের সন্তানদের মগজ ধোলাইয়ে মূলে যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দায়ী, শিক্ষা কাঠামোতে গলদ তা তো প্রশাসন, মন্ত্রী, সুশীল সমাজ ও নেতারা মাথায় ঢুকাচ্ছে না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.