লাল-কালো পিঁপড়ায় আটকে আছি আমরা

তৃষ্ণা হোমরায়: ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় লাল পিঁপড়া-কালো পিঁপড়ার গল্প আমরা প্রায় সবাই জেনেছি। কমবেশি সবাই সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও গেছি। লাল পিঁপড়া হচ্ছে হিন্দু, তাই কামড় দেয়। আর কালো পিঁপড়া হচ্ছে মুসলমান, কামড় দেয় না। তখন বুঝতে পারিনি পিঁপড়ার নামে ধর্মের শ্রেণি বিভাগের মাহাত্ম্য। বুঝতে পারিনি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও বয়ে বেড়াতে হবে এই তিক্ততার বিষ।

Tanwi Trishna
তৃষ্ণা হোমরায়

মাত্র কয়েকদিন আগের একটি ঘটনা ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে আমার চিন্তা-চেতনা, আমাদের পুরো পরিবারকে। ঘটনাটি অধিকাংশের চোখে হয়তো নিছকই একটি ঘটনামাত্র, বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু আমাদের মনকে বিক্ষিপ্ত করে তুলেছে এটি।

ধানমন্ডির একটি নাম করা স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে আমার এক ছোট বোনের ছেলে তুর্য (ছদ্মনাম) টিফিন পিরিয়ডে ক্লাসের একটি ছেলে ওর টিফিন খেতে চায়। ও কিছুটা দিলেও, ছেলেটি আরও চায়। বিপত্তি বাধে তুর্য আপত্তি করায়। শুরু হয় কথা কাটাকাটি এবং টিফিন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা। এক পর্যায়ে সেটি হাতাহাতিতে পরিণত হয়। তখন ওই ছেলে তুর্যকে মারতে শুরু  করে এবং ক্লাসের অন্য বাচ্চাদেরও বলতে থাকে, ‘আয় ওকে মারি। ওকে মারলে কিচ্ছু হবে না। ও হিন্দু। ওকে মেরে একেবারে  ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দেব….’।

বিষয়টি স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জানালে তিনি তুর্য’র মা অর্থাৎ আমার বোনকে এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার পরামর্শ দেন বলেন, ঊনি  প্রাইভেটলি ওই ছেলের বাবা-মাকে ডেকে কথা বলবেন!! এতো গেল একটি ঘটনা।

আমার ছেলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। ক্লাসের ৫/৬ জনের সাথে ওর খুব বন্ধুত্ব। এর মধ্যে অদ্রি নামে একটি ছেলে আছে। ক্লাসের অন্য ছেলেরা ওদেরকে অদ্রির সাথে মিশতে এবং ওর খাবার খেতে মানা করে। কারণ কী? কারণ,  ‘ও হিন্দু’।

এগুলোকে হয়তো ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দেয়া যেত। কিন্তু পর পর যখন এ ধরনের বেশকিছু ঘটনা কানে আসতে থাকে, তখন সেটা সত্যিই ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এর মধ্যে আমার এক সহকর্মীর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে চোখ আটকে যায়। ঊনি লিখেছেন, “জঙ্গিদের নৃশংসতার ঘটনাগুলো ঘটে যাবার পর আজকাল ব্যাপারটা নিয়ে সবাই আলোচনা করছে, কারও সাথে দেখা হলেই এই বিষয়ে তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথাগুলো বলছে। আমি যতগুলো ঘটনার কথা শুনেছি তার মাঝে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি জঙ্গিদের নিয়ে নয়, ছোট শিশুদের নিয়ে। বাচ্চাদের একটা স্কুলের শিক্ষকেরা আবিষ্কার করলেন, হঠাৎ করে একটা শিশু কেমন যেন মারমুখী হয়ে গেছে এবং স্কুলে এসে যখন-তখন অন্য বাচ্চাদের মারতে শুরু করেছে। কিছুদিন পর আবিষ্কার হলো সবাইকে মারছে না, ঘুরে-ফিরে সে নির্দিষ্ট কিছু শিশুকে মারছে এবং যাদেরকে মারছে তারা সবাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। স্বাভাবিক কারণেই মারকুটে শিশুর সাথে শিক্ষকেরা কথা বললেন এবং জানতে পারলেন, বাসা থেকে তাকে বলা হয়েছে হিন্দুরা ‘কাফের’ এবং কাফেরদের মারতে হবে। তাদেরকে মারলে সওয়াব হবে।

যে দুধের শিশুটি এরকম একটা ধারণা নিয়ে বড় হচ্ছে, বড় হওয়ার পর তাকে নৃশংস একজন জঙ্গি বানানো নিশ্চয়ই পানির মত সহজ……’’ শিশুমনে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা আর বিভাজন তৈরি করে একটি সমাজ নষ্ট করার কী অপূর্ব আয়োজন!!

পরিবার আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটোই শিশুর পাঠশালা। একটিতে গঠিত হয় তার মানসিক কাঠামো আর অন্যটিতে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বিকশিত হয় চিন্তা-চেতনা। পারিবারিকভাবেই আমরা শিশুর মনে তুলে দিচ্ছি বৈষম্যের দেয়াল। বুনছি সাম্প্রদায়িকতার বীজ। আর তার প্র্রকাশ ঘটছে স্কুলে, খেলার মাঠে, আড্ডায়। আর স্কুল থেকে যে বিভেদ, বিদ্বেষ শিশুর মজ্জায় ঢুকছে তার দাম দিতে হচ্ছে গুলশান কিংবা শোলাকিয়ার মতো বিস্ফোরক ঘটনার মধ্য দিয়ে।   

লেখক: সাংবাদিক, একাত্তর টেলিভিশন

শেয়ার করুন:

পরিবারই শিশুর প্রথম পাঠশালা। আর পরিবার থেকেই যদি শিশু এমন শিক্ষা পায়, তবে এই শিশুর ভবিষৎ কেমন হবে তা আমরা অনুমান করবে পারি!

এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা সঠিক পথে নেই।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.