আবারো গান হবে, গল্প হবে, প্রিয় আনিস ভাই

শারমিন শামস্: চ্যাটবক্স ঘেঁটে দেখি। আনিস ভাইয়ের সাথে প্রথম প্রথম আলাপের সময়গুলোতে কী নিয়ে কথা বলতাম আমরা। মনে আছে, তারও আগে, বাংলাদেশের খেলা চলছিল ভারতের সাথে। মুস্তাফিজের তখন ফাটানো অবস্থা। ফেসবুকে এক বন্ধু আনিস মাহমুদ নামে একজনের স্ট্যাটাস শেয়ার দিয়েছে। স্ট্যাটাস হলো, ‘ম্যারি মি মুস্তাফিজ’।  হাসতে হাসতে খুন আমি।  সেই আনিস মাহমুদের সাথে ফেসবুকেই আমার পরিচয়।

Anis bhai 2চ্যাটবক্সে আমাদের গল্পের বিষয় কি? বিষয়বস্তুগুলো অনেকটা এরকম- দুনিয়াদারি কি সবসময় সুন্দর? জীবন কি সারাক্ষণ আনন্দময়? না তো। জীবন তো ক্লেদে ক্লেশে ভরা, নানাবিধ টেনশনে এলোমেলো। তবু তো জীবন! এই জীবন টেনে চলি। এরই মাঝে জীবনকে ভালোও লাগে। ভালোও বাসি তাকে। বাঁচার ইচ্ছেটা বেড়ে যায়। মুহূর্তগুলো রঙিন লাগে। কেন লাগে। চারপাশে যারা প্রিয়জন তাদের জন্য লাগে। একটা রবীন্দ্রসংগীত প্রাণভরে গাইতে পারার আনন্দে লাগে। একটা দুর্দান্ত কবিতা লিখতে পারার তৃপ্তিতে লাগে। তার মানে হলো, আসলে জীবন সুন্দর।

তো আনিস ভাইয়ের সাথে ফেসবুকেই কথা হয় শুধু। এদিকে আমরা প্রতিবেশি। মাত্র দেড়হাত দূরে থাকেন আনিস ভাই।  একদিন বিকেলে ফোন, মুনা তুই আছিস বাসায়? আমি আসছি।

সেই প্রথম দেখা। ডিসেম্বর মাস। হাতে লাল সবুজ বাংলাদেশের পতাকা একখানা- আমার জন্য উপহার। আর আমার কন্যার জন্য দুই হাত ভরা চকোলেট। কফি খেতে খেতে দুনিয়ার গল্প করতে করতে আমাদের মনেই থাকে না আজই প্রথম দেখা হয়েছে আমাদের। যেন কত কালের চেনা আমরা। আনিস ভাই বললেন, আমাকে তুই একটা গান গাইতে বলতে পারিস। হাসতে হাসতে বললাম, গাও একটা গান।

Anis bhai 1যতক্ষণ গান হলো, আমি হয়তো সেই প্রথম জানলাম, আচমকা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাওয়া বোধহয় একেই বলে! ভাবির সাথেও কথা হলো ফোনে। তারপর চলে গেলেন আনিস ভাই। এরপর আনিস ভাই আমার শ্রেষ্ঠতম বন্ধু হয়ে গেলেন কখন, আমি নিজেই তা জানি না। বয়সের ব্যবধান ট্যাবধান কিচ্ছু ম্যাটার করলো না। আনিস ভাই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড-আমি জানি, আনিস ভাইও জানে।

আমার বন্ধু হওয়ার নানা ধরনের জ্বালা যন্ত্রণা আছে। সেইসব জ্বালা যন্ত্রণা মুখ বুঁজে এবং হাসিমুখে সহ্য করে গেছেন, এবং এখনও যাচ্ছেন। তাই কবিতা কি গদ্য, ফটোগ্রাফি কি ফিল্ম, সংগীত কি চিত্রকলা- সবখানে, সর্বত্র এই মানুষটার সাবলীল উপস্থিতি, অগাধ জ্ঞান প্রজ্ঞা আমাকে প্রতিদিন প্রেরণা যুগিয়েছে, সাহস দিয়েছে, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। এই মানুষটা আসলে কী? আমি সত্যিই অবাক হয়ে ভাবি মাঝে মাঝে। আনিস ভাই, তুমি নিজেও কি জানো, তুমি আসলে কী?

পৃথিবীতে কিছু মানুষের ভালো থাকার, সুস্থ থাকার অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়তা আছে। এরা না থাকলে একলা চলা, দুর্গতিতে থাকা, কষ্টে বিষন্নতায় ভোগা মানুষেরা আরো একা আরো অসহায় হয়ে যায়। আমার ভাই, আমার বন্ধু, আমার গুরুজন, আমার পরম হিতৈষী আনিস মাহমুদ সেই দুর্লভ গোত্রের মানুষ। তাকে দেখলেই মন নিমেষে ভালো হয়ে যায়। তাকে ভালো না বেসে পারে, দুনিয়ায় এমন মানুষ আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।

13874579_10208517846276508_573567152_nএকজন ভালো মানুষ, একজন পবিত্র আত্মার মানুষ হবার চেয়ে বিশেষ কিছু আর হতে পারে না। কিন্তু আনিস ভাই এর বাইরেও একজন তুমুল পড়ুয়া, চিন্তাশীল মানুষ- যাকে আমি ডাকি জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বলে।  যিনি জানেন না, এমন কোন বিষয় আছে, ভাবতেই কষ্ট হয়। জীবনে যতবার কাজে কর্মে পরামর্শে ঠেকে গেছি, আনিস ভাইয়ের জ্ঞান আর জানাশোনার পরিধি আমাকে উদ্ধার করেছে।  নিজের পেশাগত জীবনে সফল সুনামধন্য এই মানুষটা। অথচ এত অহংকারহীন, এত সরল, কোমল, এত শান্ত আর স্থির তিনি, যার কাছে দুই মিনিট বসে থাকা মানেই নিজেকে রিফ্রেশ করে আবার জীবনযুদ্ধে যোগ দিতে পারার শক্তি সঞ্চয় করা।

আনিস ভাই আজ ভীষণ অসুস্থ। আমার জানা নাই কীভাবে তাকে সুস্থ করে তোলা যাবে। কত তাড়াতাড়ি।  ক্যান্সারের মত কঠিন ব্যাধি এই অসামান্য মানুষটাকে আক্রমন করেছে। আমি জানিনা, কীভাবে কী হবে। শুধু ঈশ্বরের কাছে দুই হাত তুলে বলতে পারি, পৃথিবীতে কিছু মানুষের ভালো থাকা আর দীর্ঘজীবন নিয়ে অবস্থান পৃথিবীকে সুন্দর করে, শক্তিমান করে। তুমি এই মানুষটাকে সুস্থ করে দাও হে ঈশ্বর!

আমি জানিনা, কীভাবে কী হবে! কিন্তু যেকোন মূল্যে সুস্থ হতে হবে, ভালো থাকতে হবে আনিস ভাইকে। এই পৃথিবীর আরো আরো অনেক অনেক দিন প্রয়োজন তাকে। শান্ত স্থির দেবির মত রুবা ভাবির প্রয়োজন তাকে। শত শত আদিবাসী ভাইবোনের প্রয়োজন তাদের প্রিয় আজুকে।  আর আমার তাকে প্রয়োজন অন্তহীন। তাই তাকে সুস্থ হতে হবে। আগের মত প্রাণবন্ত হতে হবে। একটানা বিছানায় শুয়ে থাকা, ষোল কেজি ওজন হারানো, শুকনো মুখের আনিস ভাইকে আমি দেখতে চাইনা। 

আমার ডকুমেন্টরির সাবটাইটেল করতে হবে জেনে যে মানুষটা বাড়ি বয়ে এসে পেনড্রাইভে ভরে নিয়ে গেল জিনিসপাতি, তারপর মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে চোস্ত ইংরেজিতে সাবটাইটেল তৈরি আর একটা পর একটা ফাইল এসে হাজির হচ্ছে ইনবক্সে- সেই অসীম প্রাণশক্তি আর দুর্দান্ত মেধাবী মানুষটাই তো আমার আনিস ভাই। ভরাট কণ্ঠে যখন তুমি গান ধরো, জীবন যখন শুকায়ে যায়/ করুনাধারায় এসো/ সকল মাধুরী লুকায়ে যায়/ গীতিসুধারসে এসো…তখন এ জগৎ এ জীবনযাপন এই পথঘাট সব পাল্টে যায়, ভর করে এক অপার্থিব আলো।

‘‘গান গাইতে পারলে আমার ভিতরটা এত পূর্ণ লাগে, জানিস!’’- কোন এক সন্ধ্যায় চ্যাটবক্সে এই কথা লিখেছিলেন আনিস ভাই। আমি জানি, গান গাওয়ার মুহুর্তে তোমার মুখের দিকে তাকালেই যে কেউ বুঝতে পারবে। আনিস ভাই, সুস্থ হয়ে ওঠো খুব তাড়াতাড়ি। অপার্থিব আলোপড়া তোমার ওই মুখখানা দেখতে ইচ্ছে করছে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে যে গেয়ে চলেছে একটার পর একটা গান।

সুস্থ হও আনিস ভাই, আমার লেখা, আমার ফিল্ম, আমার যা তা কবিতা, আমার এলোমেলো বকবকানি শোনার জন্য তোমার সেই ঝকঝকে স্মার্ট হেঁটে আসার ছবি আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। আর আমি যা দেখি, ঈশ্বর তার বাইরে যান না কখনো, জানো তো তুমি সেটা?

এখানে একটা লিংক সংযুক্ত করা হলো, যেখানে আনিস ভাইয়ের পাশে আমরা দাঁড়ানোর অঙ্গীকার করেছি। চাইলে যে কেউ হাত বাড়াতে পারেন। বাড়াবেনও নিশ্চয়ই। https://www.facebook.com/events/926727740788467

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.