‘মানুষ না গরু, বুঝি না’

momotaj
মমতাজ বেগম

সুপ্রীতি ধর:

চোখ ছলছল, উদাস দৃষ্টি। কথা বলেন কম, কানে একেবারেই শোনেন না। মেয়ের সাহায্য নিয়ে কথা বলি। তার প্রতি আগ্রহের কারণ শুনে বলে উঠেন, ‘মানুষ না গরু, বুঝি না। ঘর নাই, বাড়ি নাই, কই থাকি, কেমনে থাকি, জানি না। সেদিনের কথা এখন আর কই না, কইলে মাথা খারাপ লাগে’-বলছিলেন একাত্তরের বীরাঙ্গনা মা মমতাজ বেগম।

পেটে একটা বাড়তি থলে নিয়ে কাটিয়ে দিলেন জীবনের ৩৮টি বছর। এই থলে দিয়ে প্রতিনিয়ত পায়খানা বের হয়। গত ২৯ জুন ভয়াবহ ডায়রিয়া নিয়ে ভর্তি হন সোহরাউয়ার্দী হাসপাতালে। আছেন ৮ নং ওয়ার্ডের ২১ নম্বর বেডে।

মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পড়ার চেষ্টা করি। কী যন্ত্রণা, কী কষ্ট এই বুকে? তিনি কী জানতেন, তাঁর এই আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা একটা স্বাধীন দেশে বাস করছি, অথচ কিছু কিছু মানুষ এই দেশটাকে নিয়েই আবার জুয়া খেলছে? এই দেশটার জন্যই তো, তাই না? তাঁর লাভটা কী হলো? একাত্তরের যন্ত্রণা সারা শরীরে বহন করে চলেছেন নিরুদ্দেশের পথে।

১৯৭৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাঁচটি অপারেশন হয়েছে রেক্টোভ্যাজাইনাল ফিস্টুলার। এখন ডাক্তাররা তার পেটের মধ্যে টিউব লাগিয়ে দিয়েছেন, এখান দিয়েই পায়খানা হয়। ডিহাইড্রেশন আর অপুষ্টিও তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। স্যালাইন চলছে। হাতে শিরা পাওয়া যায় না বলে ক্যানুলা লাগানো, তাতে কষ্ট পাচ্ছিলেন মমতাজ বেগম। ডাক্তার আর সিস্টারকে বলে-কয়ে ক্যানুলাটা অন্য হাতে নেয়ার ব্যবস্থা করালাম। একটু হাসি যেন খেলে গেল যন্ত্রণাকাতর মমতাজ বেগমের মুখে। বললেন, ‘লক্ষ বছর বাঁচো তোমরা’।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিংগা ইউনিয়নের লতিফপুর গ্রামে মমতাজ বেগমের বাড়ি। বাড়ি তো নয়, ছাউনি বলা চলে। তাঁর স্বামী রমিজ উদ্দিন জানান, বাড়ির ভিটেটুকু ছাড়া তার কোন সম্পদ নেই। এ যাবত মানুষের সহায়তা নিয়েই চিকিৎসা চলেছে মমতাজ বেগমের। এখন তিনি সর্বস্বান্ত।

সোহরাউয়ার্দীতে তাঁর সাথে আছেন মেয়ে নীলুফার বেগম। একাত্তরে তিনি ছিলেন বেশ ছোট, তেমন কিছু মনে নেই। পরে বড় হয়ে দাদা-দাদীর কাছে শুনেছেন মায়ের ওপর নির্যাতনের কাহিনী। তিনি জানান, গত দুই মাস ধরে ভাত কী জিনিস খেয়েও দেখেনি মা। কিছু সহ্য হয় না, হজম হয় না। ২০দিন ধরে ডায়রিয়া হওয়ার পর গাজীপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে অবস্থা খারা প হলে এখানে নিয়ে আসেন।

নীলুফার মায়ের কথা এখন আর বলতে চান না। তাছাড়া পাশের বেডের রোগীর আগ্রহও তাকে দমিয়ে দেয় কথা বলা থেকে। কিন্তু মমতাজ বেগমের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘পেটে তখন পোলা আছিল। বাড়িতে আমরা ১৮জন বউ-ঝি ছিলাম। রাজাকার-পাক বাহিনীরা আইয়া সবাইরে ঘরের মধ্যে নিয়া গেল। সবাইরে মারধর করলো, আর আমারে ধইরা নিয়া গেল। বোঝা গেল, স্মৃতি অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি বলে চলেন, শ্বশুর দৌঁড়াইয়া গেছিলেন জামায়াতে ইসলামির নেতার বাড়িতে। নেতার পা ধইরা কইছিলেন, ভাই, আমার বউটারে ছাড়াইয়া আনেন। নেতা আনে নাই। তারপর আমার পেটের বাচ্চাডা মইরা গেল। হেই থাইক্যাই আমার সব আউলা হইয়া গেল’।

গত ৪২টি বছর ধরে মমতাজ বেগম ফিস্টুলার মতোন মরণ যন্ত্রণা সহ্য করে চলেছেন। ডায়রিয়া হলে পুরো বাড়িঘর ছেয়ে যায়, গন্ধের কারণে কেউ পাশে থাকে না। মেয়ে মাঝে-মধ্যে এসে সেবা করে যায়। তার কথা, ‘মা-তো, তারে ফালাইয়া দিতে তো পারি না’।
নীলুফার জানালেন, মাসে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে সাড়ে তিনশ টাকা পান। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নিয়ে এখনও টালবাহানা চলছে। আজ দেব, কাল দেব বলে কেবল সময়ই পার করছেন কর্মকর্তারা।

হাসপাতালের খরচ কোনরকমে চালাচ্ছেন নীলুফার। এখানে আসার সময় ২১ হাজার টাকা ধারদেনা করে নিয়ে আসেন। তাই দিয়ে চলছে। গিয়ে কিভাবে সেই ধার শোধ করবেন জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘টাকা নাই বইলা মায়েরে তো ফালাইয়া রাখতে পারি না। এমনিতেই এতোটা বছর মা আমার কষ্ট করতেছে। তবুও তো বাঁইচা আছে, এটাই সান্ত্বনা’।

পিছন পিছন অনেকটাই আসেন নীলুফার। আমাদের কথায় কোথাও হয়তো একটু আশ্বাসের সুর তিনি পেয়েছেন। হাত চেপে ধরে বলেন, ‘আপা, আপনারা আমার মায়ের জন্য কিছু করবেন তো’! জোর গলায় কিছু বলতে না পারলেও, মনে মনে বলি, চেষ্টা করবো, অবশ্যই চেষ্টা করবো। এটা আমার-আমাদের সবার দায়িত্ব। কিন্তু এই দায়িত্ব কে, কাকে বোঝাবে? রাষ্ট্র যখন দায়িত্ব নেয় না, তখন সেই দায়িত্ব নিতে হয় আমাদেরই। তবুও মৃত্যুর আগে মমতাজ বেগম জেনে যাক, তাঁর কিছু সন্তান এখনও আছে এই দেশে।

নোট: এই লেখাটা লিখেছিলাম ২০১৩ সালের জুলাই মাসে। তার অল্প কয়েক মাস পরই মমতাজ বেগম মারা যান। 

শেয়ার করুন:
  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  
    14
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.