মহাপ্রয়াণে ‘হাজার চুরাশির মা’ খ্যাত মহাশ্বেতা দেবী

উইমেন চ্যাপ্টার: ১৯২৬ সালে মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম হয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ববঙ্গের ঢাকায়। স্কুলও শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। দেশভাগের পর দেশান্তর ঘটে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়। সেখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন আজ এই কিংবদন্তী।

Mohasweta debiআনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, দীর্ঘ রোগভোগের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বিশিষ্ট এই সাহিত্যিকের বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

বাংলাদেশ সময় দুপুর পৌণে চারটায় লেখিকার মৃত্যু হয়। গত ২২ মে ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ে মহাশ্বেতা দেবী ভর্তি হন দক্ষিণ কলকাতার একটি হাসপাতালে।
তারপর থেকে তিনি হাসপাতালেই ছিলেন। বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার পাশাপাশি শ্বাসকষ্টেও ভুগছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। তাঁর মৃত্যু সংবাদে গভীর শোকের ছায়া নেমেছে গোটা বাংলায়।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টুইটারে এক শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘‘ভারত এক মহান লেখিকাকে হারালো, বাংলা এক মহান মাকে হারালো। আমি এক জন ব্যক্তিগত পথপ্রদর্শককে হারালাম। মহাশ্বেতাদি শান্তিতে থাকুন।’’

শুধু বাংলায় নয়, বর্তমান সময়ে ভারতের সবচেয়ে প্রবীণ সাহিত্যিকদের অন্যতম ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। গোটা দেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে সমসাময়িক কালে সবচেয়ে সম্মানিত নামগুলির অন্যতমও ছিলেন তিনি। জ্ঞানপীঠ, পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণে সম্মানিত হয়েছিলেন। তাঁর লেখা অনেক উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ১৯৭৯ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের জন্য পুরস্কার পান তিনি।

Mahaswetaবনেদী শিল্প-সাহিত্য পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন মহাশ্বেতী দেবী। বাবা মনীষ ঘটক ছিলেন সুপরিচিত একজন কবি এবং সাহিত্যিক। সেই বাবারই ছোট ভাই বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক। মহাশ্বেতার মা ধরিত্রী দেবীও লেখক ছিলেন। একাধারে একজন সমাজকর্মী ছিলেন তাঁর মা। যাঁর ভাইয়েরাও ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রথিতযশা। একজন ভাস্কর শঙ্খ চৌধুরী এবং অপরজন একটি সাপ্তাহিকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শচীন চৌধুরী।

মহাশ্বেতার দেবীর ছেলে নবারুণ ভট্টাচার্য শুধু বাংলায়ই নন, সারা ভারতবর্ষেই বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় একজন কবি ও লেখক।

শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীয় থেকে ই্ংরেজিতে বিএন অনার্স করেন মহাশ্বেতা। তারপর ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করেন। এরপর সুপরিচিত চিত্রনাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যকে বিয়ে করেন, যিনি আইপিটিএ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৪৮ সালে জন্ম হয় নবারুণ ভট্টাচার্যের, ১৯৫৯ সালে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় বিজন ভট্টাচার্যের সাথে। 

মহাশ্বেতা এক সাক্ষাতকারে বলছিলেন, বিজন ভট্টাচার্যের সাথে ছাড়াছাড়ির পর তিনি বিয়ে করেন অসিত নামের একজনকে। ছেলে নবারুণ তখন কিশোর। সবকিছু তখন নতুন। অনেককিছুর সাথে মানিয়ে চলতে হয়েছে। এ বিয়েটাও টেকেনি। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। নির্মল নামের একজন আসেন তাঁর জীবনে। নির্মল ছিলেন বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী এবং মেয়ের মানসিক সমস্যা ছিল। নির্মল তাঁকে খুব উৎসাহ দিতেন। মূলত নির্মলের উৎসাহেই তাঁর লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া। 

মহাশ্বেতা আরও জানান, তিনজনের কেউই আর বেঁচে নেই। তারপর থেকে তাঁর নিজের একান্ত বাসাটিই হয়ে উঠে অতি আপন। একধরনের শূন্যতা কাজ করলেও লেখালেখিই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে। 

এরপর থেকে তিনি তাঁর লেখালেখি, আন্দোলন নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আজ ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই বৃহস্পতিবার সমস্ত ব্যস্ততা থেকে তিনি চিরদিনের ছুটি নেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে  অরণ্যের অধিকার,  হাজার চুরাশীর মা, হাজার চুরাশীর মা,অগ্নিগর্ভ, অগ্নিগর্ভ, রুদালী,  উনত্রিশ নম্বর ধারার আসামী, প্রস্থানপর্ব, ব্যাধখন্ড, ৬ই ডিসেম্বরের পর, নীলছবি (১৯৮৬, অধুনা, ঢাকা), গণেশ মহিমা ইত্যাদি

উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে স্যালুট এই আজীবন সংগ্রামী লেখক মহাশ্বেতা দেবীকে।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.