এক বিয়ে, দুই বিয়ে, তিন-তিনবার বিয়ে!

পৃথা শারদী: সম্প্রতি এক অভিনেত্রী বিয়ে করেছেন। কাকে করেছেন বিয়ে? অবশ্যই কোনো একজন পুরুষকে। ভদ্রলোক বেশ ডাকাবুকো, যতগুলো খবর পড়লাম তার প্রতিটাতেই বিয়ে নিয়ে হেডলাইন হিসেবে একটা লাইনই ছিল “অমুক অভিনেত্রীর বিয়ে’’।

ভেতরের লেখাগুলো বেশ বিব্রতকর, বেশ কষ্টদায়ক। ভদ্রমহিলা বিয়ে করছেন, এটি তার তৃতীয় বিয়ে। তৃতীয় বিয়ে নিয়ে যত না কথা এখানে উঠে এসেছে, তার চেয়ে বেশি উঠে এসেছে তার আগের দুই জীবন কেমন ছিল, আগের দুই জীবনসঙ্গী কেমন ছিল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবচ্ছেদ।

Aupi
অপি করিম

অত্যন্ত বিদূষী এবং অনেক গুণে গুণান্বিতা এই অভিনেত্রীটি আমারও খুব প্রিয়, আমি খুব ধৈর্য্য নিয়ে লেখাগুলো পড়লাম। লেখার শেষে গিয়ে জানতে পারলাম, নাহ, যাকে বিয়ে করছেন, এটা ঊনারও তৃতীয় বিয়ে! তিনি এক সন্তানের জনকও বটে! আরো কিছু জানার ইচ্ছা ছিল কিন্তু বিধিবাম! নিউজ পোর্টালগুলো আর কিছু লেখেনি ভদ্রলোকের আগের দুটো বিয়ে নিয়ে।
বাসায় লাফাতে লাফাতে বললাম, “দেখো, শেষপর্যন্ত ঊনি থিতু হচ্ছেন।’’ আমাকে মুখ বাঁকা করে জবাব দেয়া হলো, “আরে, এটাও তিন মাস পরে ভাংবে।’’ কাজিনদের বললাম,“ঊনার বিয়া হইতেসে’’, তারা শুনিয়ে দিলো, “দুই বার টিকাতে পারে নাই, আর তিনবার।’’

আমি ঘাড় ত্যাড়ার মতো বললাম, “শোন, এইটা যার সাথে হচ্ছে সেই জামাইয়েরও এইটা তিন নাম্বার বিয়া’’। উত্তর আসলো, “ও, তাইলে তো দুইটাই এক! আর জামাইয়ের কপাল খারাপ আগের বউ ভালো ছিল না!’’
সত্যি! বউ ভালো ছিল না তাই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, কিন্তু আমি তো জানতাম এক হাতে তালি বাজে না!
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। ভাবতে লাগলাম সুতোটার প্যাঁচ ঠিক কোথায় !

একটা মেয়ে, তার জীবনে সব একবারই আসবে, আসতে হবে। তার জীবনে প্রেম আসবে একবার (না আসলে আরও ভালো, প্রেম করা মেয়েদের সাথে ছেলেদের ছোঁয়াছুঁয়ি থাকে, বিয়ের সময় ছেলেরা একটা তাজা ফুল চায়)।

Pritha Sharodi
পৃথা শারদী

বিয়েও কেবলমাত্র একবারই হতে হবে মেয়েদের, বেশি বিয়ে হয় খারাপ মেয়েদের, এখানে কোন হেরফের হবেই না। বিয়ের পর পতিদেবই হবেন জীবন-মরণ, শরীরের সুখ, মনের সুখ মিটলে ভালো, না মিটলেও ঠোঁট কামড়ে, দাঁতে দাঁত চেপে সারাজীবন কাটাতে হবে, কারণ একবার ‘সতীত্ব’ (?) গেলে আর কোনো মেয়ের কোন দাম থাকবে না।
মেয়ে, সে তুমি যতই বিদ্যাধরী হও না কেন, ‘সতী’ না হলে তোমার সবটাই ক্ষতি।

যে অভিনেত্রীকে নিয়ে এতো লেখা, এতো সমালোচনা, সেই অভিনেত্রী শিক্ষাগত যোগ্যতায় কোন অংশে পিছিয়ে নেই, অভিনয়ের পাশাপাশি পড়াচ্ছেন, তাও আবার সর্বোচ্চ এক বিদ্যাপিঠে, নিজের পেশায় সময় দিচ্ছেন। এতো যোগ্যতা থাকতেও তার সব যোগ্যতা ম্লান হয়ে গেল তার আগে বিয়ে হয়েছিল তাই!

আচ্ছা, আমরা কতোটা জানি একজন সম্পর্কে? একজনের জীবন সম্পর্কে? বিশ্বাস আত্মসম্মানবোধ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ খুব বড় ভূমিকা পালন করে দুটো মানুষকে এক ছাদের নিচে বেঁধে রাখার জন্য। যখন এই মূল্যবোধগুলোই না থাকে তখন একসাথে থেকে কী লাভ! কী লাভ নিজেকে বিবাহিত পরিচয় দিয়ে?

মানুষ ঠেকে শেখে, কেউ তো চায় না সংসার ভাংতে! একটা মেয়ে যতই শিক্ষিত হোন না কেন, সংসার তার খুব আকাঙ্খার স্থান, সর্বোচ্চ ত্যাগ সে করে ওই সংসারের পিছনে। তবে আত্মসম্মানবোধে আঘাত পেলে সেই আকাঙ্খাও ছেড়ে আসতে হয়।
কিন্তু তাই বলে জীবন থেমে যায়? এক সংসারে ভালবাসা পাননি, এক সংসারে সামান্য শ্রদ্ধাটুকু পাননি, এক সংসারে পাননি আস্থা, পেয়েছেন শুধুমাত্র লাঞ্ছনা, তাই বলে নারী আর নিজেকে গড়বেন না? আর ভালবাসা খুঁজবেন না? নিজের মাথার ছাদটুকু ভাগ করবেন না আর কারো সাথে?

কীভাবে ভাবেন আপনারা? কীভাবে ভাবেন? এক জীবনে একটা ধাক্কা মানে একটা ক্ষত, যখন অন্য কেউ সেই ক্ষততে প্রলেপ বুলিয়ে দিতে আসেন আমাদের উচিত সাধুবাদ দেয়া, শুভকামনা করা, কিন্তু বিনিময়ে আমরা বার বার সেই নারীদের দিচ্ছি ভালবাসা ভাগ করে নেয়ার অপরাধে ধিক্কার!
আসলে আমাদের সমাজ খুব অদ্ভুত, আমরা খুব অদ্ভুত। একজন নারী শিক্ষিত হলে এটা তার যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়, তবে তিনি বিবাহিতা হলে তাকে শ্রদ্ধা করা হয় সম্পূর্ণ অন্যভাবে, আবার সেই নারীই যদি ডিভোর্স নিয়ে বেরিয়ে আসেন নিজের আত্মসম্মান নিয়ে, নিজের মতাদর্শে আঘাত পেয়ে, তাহলে তাকে আমরা টেনে হিঁচড়ে নিচে নামাই, নিক্তি দিয়ে মাপা শুরু করি, ভুলে যাই তাকেই আমরা মাথায় তুলে রেখেছিলাম কিছুদিন আগে।

কাজটা কি ঠিক আদৌ? নিজেই ভেবে দেখুন একবার।

অপি করিম, নতুন জীবনের অনেক অনেক শুভকামনা জানাই আপনাকে আর জানাই সাধুবাদ। এতোটা পথ এতো দৃঢভাবে পাড়ি দেয়ার জন্য, ভেঙ্গে না পড়ার জন্য। মঙ্গল হোক আপনার।
এমন অপি করিম আমাদের সমাজে অসংখ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, যারা জীবনের গ্লানি ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করছেন বা করতে চান। তাদের নিয়ে আমরা না বলি কোন কটু কথা, তাদের একটু শ্রদ্ধা তো করতেই পারি আমরা, নাকি!

শেয়ার করুন:
  • 311
  •  
  •  
  •  
  •  
    311
    Shares

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সবসয়ম চাই মেয়েদের ধাবিয়ে রাখতে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি আমার ধীক্কার থাকবে আজীবন।

নারীরা এগিয়ে আসছে এটাই আশার কথা।
অপি করিম যা করেছে তা নারী সমাজ ইতিবাচকভাবে নিবে। তাতেই নারীর মঙ্গল।
অভিনন্দন অপি করিমকে। আপনাকে ধন্যবাদ।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.