এখনো বনের গান বন্ধু হয়নিকো অবসান- ৪

লীনা হাসিনা হক: কিছুই ভালো লাগছে না আজকাল। না কারো কথা শুনতে ইচ্ছে করে, না কিছু বলতে ইচ্ছে করে। আমি তো সারাজীবন বকবকানো মানুষদের দলে- কারণে-অকারণে বকবক করে অপরের মাথার সাথে নিজেরও মাথা ব্যথা বানিয়ে ফেলি, তাহলে কেন এই মানসিক অবসাদ?

Gulshan 7শঙ্কিত হয়ে লক্ষ্য করছি শুধু আমার নিজের নয়, আমার আশে-পাশের বেশিরভাগ মানুষেরই মন খারাপ, বিষাদে অবসন্ন।
সবাই ভাবছে, খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছে বেশি দেরি হয়ে যায়নি তো! কিশোর ছেলেটি, তরুণী মেয়েটি স্বাভাবিক জীবনের বাইরে কিছুতে জড়িয়ে পড়েনি তো!

আমার যে সহকর্মিটি অফিস থেকে সন্ধ্যা সাতটার আগে বেরই হতেন না, তিনি এখন পাঁচটা বাজতেই কাজ গোছান, যে বন্ধূ সপ্তাহে প্রায় চার দিনই অফিসের পরে কোন ক্যাফেতে আড্ডা দিতে ডাকাডাকি করতো, সে এখন অফিস শেষ হওয়ার পরেই বাড়ি ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যারা এমনকি শনিবারেও পুরো দিন না হলেও আধা বেলা অফিস করতেন যেনো তিনি বা তাঁরা অফিসে না এলে আকাশ ভেঙ্গে পড়বে, এখন আর শনিবারে অফিসে আসার অস্থিরতা প্রকাশ করছেন না।

Baba Collageতাহলে? তাঁরা কি সময়মতো বাড়ি ফিরে নিজের পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছেন? কিশোর সন্তানের সাথে গল্প করছেন মন খুলে, যেমনটি এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানও অনুরোধ করেছেন?
আমি সমাজবিজ্ঞানী নই, নই মনস্তত্ববিদ, নৃবিজ্ঞানী নই, আমি আসলে কেউ-ই নই, তবু জানতে চাই কাছের কিছু পরিবারের কাছে। নিজের জন্যই এই জানতে  চাওয়া।  চিত্র যা পাই তা কিছুটা বিষণ্ণ।

আমার পরিচিতির মধ্যে বেশির ভাগ বাবা মা’ই স্বীকার করেছেন, গুলশান এবং শোলাকিয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে সন্তানদের সাথে বেশি করে অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর চেষ্টা তারা করছেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তা যেন কোথায় আটকে যাচ্ছে!

সন্তানরা কী চিন্তা করে সেটা অনেক মা-বাবাই পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছেন না। হোঁচট খাচ্ছেন সন্তানের সাথে গল্প করতে গিয়ে। এমনকি কোনো কোনো মা-বাবা বলেছেন, তাঁদের সন্তানদের মুখের ভাষাও যেন অন্য রকম হয়ে গেছে। যদিও বা অনেক সন্তান সময় কাটাচ্ছে মা-বাবা পরিবারের সাথে, কিন্তু কিছু একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে , জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে।

জানতে চাই, তাঁরা কি নিজের ছেলেবেলার গল্প কখনো করেছেন সন্তানদের সাথে? কেমন ছিলো সেই সময়কার জীবন? সন্তান কি জানে তার বর্ধিত পরিবার সম্পর্কে? সন্তান কি চেনে পরিবারের যে অংশ গ্রামে থাকে, কি বাংলাদেশেরই অন্য ছোট শহরে থাকে? উত্তর যা পাই, তা মন খারাপ করিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট। মফঃস্বল শহরের কাছের আত্মীয়দের সম্পর্কে না জানলেও বিদেশে যদি কোনো দূরসম্পর্কিয় আত্মীয় থাকেন, সেই তাঁদের সাথে অনেক পরিবারের ক্ষীণ হলেও যোগাযোগ আছে! বলা তো যায় না, কখন কোন কাজে লাগে!

গত কদিন কথা বলার চেষ্টা করেছি এইসব পরিবারের সন্তানদের সাথেও। আমার সৌভাগ্য আর পরিবারের দুর্ভাগ্য যে কাছে-পিঠের মানুষজন আমাকে কেনো যেনো হালকা ছিটগ্রস্থ হিসাবেই জানেন। মা-বাবা বা ছেলেমেয়েরা পাগল ভেবেই হয়তো আমার সাথে কথা বলে কিছুটা মন খুলেই।

সেই সূত্রেই জানা যে, বেশিরভাগ ছেলে মেয়েই তেমন কোন শারীরিক শিক্ষা বা খেলাধূলার সাথে জড়িত নয়। কিছু ছেলে হয়তো পুল খেলতে যায় কিন্তু তাকে কি খেলা বলা যাবে? অনেকেই সাঁতার জানে না। ক্রিকেট হয়তো কিছু ছেলে খেলে কিন্তু ফুটবল প্রায় খেলেই না। দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, কানামাছি, চিবুড়ি এসব খেলার কথা বাচ্চারা প্রায় জানেই না! আর মেয়েরা তো বাস্কেটবল আর টেবিল টেনিস ছাড়া আর কোন খেলার সাথেই জড়িত নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি বলতে এইসব কিশোর-তরুণরা ‘মার্কা’ ছাড়া আর তেমন কিছুর খবর রাখে না। এই প্রজন্মের কাছে ‘রাজনীতি’ আর ‘দুর্নীতি’ সমার্থক।  মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি , কমরেড মনি সিংহের নাম জানে মাত্র কয়েকজন।

চে গুয়েভারার ছবি যুক্ত টি-শার্ট বা টুপি ব্যাগের কল্যাণে অনেকেই নামটা জানে, এর বেশি কিছু তেমন নয়। গল্পগুচ্ছ পড়েছে মাত্রই হাতেগোনা কয়েকজন, ‘ফেলুদা’ পরিচিত অনেক্র কাছেই কিছু সেখানে সত্যজিত রায়ের চেয়ে ‘সব্যসাচী চক্রবর্তীর’ পরিচিতিই প্রধান।

কনিকা চক্রবর্তীর নাম প্রায় কেউই জানে না, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে চেনে তবু অনেকেই। অল্প কয়েকজন যারা ছোটদের গানের আসরে গিয়েছিল, তারা মিঠু- মন্টির সাথে সাথে ‘খালামনি’ ফেরদৌসী রহমানকে চেনে। আব্বাসউদ্দিন, আব্দুল আলীম সম্পর্কে বেশিরভাগেরই পরিষ্কার ধারণা নাই , যদিও বেঙ্গল ফোক মিউজিক ফেস্টিভ্যালের কল্যাণে পূর্ণ দাস বাউলের নাম জানে, তাঁর কোন গানের কলি জানতে চাইলে, ‘দিল কি দয়া হয় না’ এর বেশি আর কেউ কিছু বলতে পারে না। অল্প কজন মেয়ে যারা নাচের  সাথে আছে তারা মুনমুন আহমেদ, শিবলী মোহাম্মদ বা শামীম আরা নিপার কথা জানে। গহর জামিল বা লুবনা মরিয়মের কথা তেমন করে জানে না বেশীরভাগ। লীলা স্যামসনের নাম বলতে পারলো এই লিজেন্ডের সাম্প্রতিক বাংলাদেশে এসে পারফর্ম করবার কারণে।

তার মানে কি এই বাচ্চারা বই পড়ে না, সিনেমা দেখে না, গান শুনে না? ভুল সবই ভূল। তারা গান শুনে, বই পড়ে, মুভি দেখে, নাচও উপভোগ করে তবে সেটা অন্য ভাষায় । অনেকেই আমাকে ছোট মনের মানুষ বলতে পারেন, কূপমণ্ডুক। হয়তো আমি তাই-ই। কিন্তু কোন যুক্তিতেই আমি বুঝতে পারি না, কেন আমার সন্তান ‘হাসজারু’ কি ‘ক্ষীরের পুতুল’ বা ‘ ডাকঘর’ এর অমলের কথা জানবে না?  

এমন যে হতে পারে এসবই কি আমাদের জানা ছিলো না? আপনি আচরি ধর্ম পরেরে বলিও। আমি নিজেই যে চেয়েছি আমার সন্তান চোস্ত ইংরেজিতে কথা বলতে শিখুক, ইংরেজি সিনেমা সাব টাইটেল ছাড়া বুঝতে পারি না আমি কিন্তু আমার সন্তান যেনো ভালভাবে বুঝতে পারে। ‘সুকুমার রায়’ কি ‘অবনী ঠাকুর’ না পড়লেও তেমন ক্ষতি নাই, কিন্তু জে কে রাউলিং না পড়লে কেমনে হবে! সেখানেও ঘাপলা আছে।

আমি কি কখনো হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন বা লিটল হাউস অন দি প্রেইরি কিনে দিয়েছি আমার সন্তানকে? নাকি কখনো গল্প করেছি কেমন করে ‘লিটল উইম্যান’ এর ‘জো’ এর মতন হতে চেয়েছিলাম আমি? জেন অস্টিন পড়ছে আমার সন্তান, খালিদ হুসাইনীর ‘মরিয়ম’ চরিত্রটির জন্য তার মমতা আছে জেনেই আমি বিগলিত। সে যে কোনদিন জানলো না আশাপূর্ণা দেবীর ‘ সুবর্ণলতা’ র কথা, কী রবি ঠাকুরের ‘হৈমন্তী’ কে সে চিনলো না, তাতে তো বিশ্ব নাগরিক হওয়া আটকে গেলো না, না হয় পরে কোন একসময় পড়ে নেবে ইংরেজি অনুবাদ!

স্টিফেন হকিংস প্রায় গুলে খেয়েছে কিছু কিছু প্রতিভাবান ছেলেমেয়ে, জগদীশ চন্দ্র বসুর কথা তেমন করে প্রাণে ধরে না কেউ।  

জানি, আমি খুবই ক্ষুদ্র মানসিকতার একজন মানুষ, নইলে এসব তুলনা কেন মনে আসে আমার!
এইসব পরিবার উচ্চ এবং উচ্চমধ্যবিত্ত, কোন না কোন সময়ে ছুটি কাটাতে ধারে কাছের দেশ তো বটেই, অনেকে ইউরোপ-আমেরিকা বেড়াতে যান পরিবার নিয়ে। রাঢ়িখাল বা ব্রজযোগিনী, শিলাইদহ বা কাজির সিমলা নৈব নৈব চ…  
বুঝতে পারি তাল কেটেছে বহু আগেই, সুর নাই, তবু জোড়া তালি দিয়ে চলছিলাম হয়তো। গ্লোবাল নাগরিক হিসাবে আত্মজকে তৈরি করতে চেয়ে আমি নিজেই যে তাকে শেকড় থেকে উপড়ে ফেলেছি। অসম্ভব মেধাবী এই সব ছেলেমেয়েরা- অনেকেই বিভিন্ন বিষয়ে সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের সাথে প্রতিযোগিতায় ওয়ার্ল্ড হাইয়েস্ট নম্বর পেয়েছে। নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেছে অনেকেই, কেউ কেউ যাবার অপেক্ষায়।

কিন্তু কেন আমার মনে হয় বৃক্ষ নয়, আমরা যেন পরজীবী অর্কিড তৈরিতে নিজেদের মন প্রাণ ঢেলে দিয়েছি। অর্কিড- যে আরেকটি গাছের জীবনরসে সিঞ্চিত হয়ে ফুল ফোটায় ঠিকই, কিন্তু নিজের শেকড় বিচ্ছিন্ন এই উদ্ভিদ পৃথিবীর সাথে নিজের যোগসূত্র পায় কি? শূন্যের উপরে ঝুলন্ত অবস্থায় যা পায় তাই সে আঁকড়ে ধরে।

কী ঘর বানাইলাম আমি শূন্যেরও মাঝার! আমি জানি না।  ১লা জুলাই এর ঘটনা ধাক্কা দিয়েছে জোরেই। সে ধাক্কার জেরেই হয়তো এখন তাল ঠিক করে সুরে ফেরার চেষ্টা। বেটার লেট দ্যান নেভার। জানি পারবো আমরা, সময় লাগবে, কষ্ট হবে, বেদনা, হেরে যাওয়ার ভয়, সবকিছুর পরও পারবো আমরা।
এখনো বনের গান বন্ধু হয়নিকো অবসান।
(চলবে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.