আমিই ঐশী, ঐশীও আমিই

আতিকা রোমা: বেশ কিছুদিন থেকে ভেবেই যাচ্ছি এই লেখাটা লেখা উচিৎ। কিন্তু সময় ও সাহসের অভাবে লিখতে পারছি না। সাহস করতে পারছি না কারণ বার বার ঐশীর মাঝে খুঁজে পাচ্ছি আমার অতীতকে।

Roma
আতিকা রোমা

হ্যাঁ আমি দীর্ঘ ১২ বছর বা এক যুগ সাঙ্ঘাতিক রকমের মাদকাসক্ত ছিলাম। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে পরিবারে একজন ছেলে সন্তান মাদকাসক্ত হলে যা না সমস্যা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি সমস্যা হয় মাদকাসক্ত কন্যা সন্তানকে নিয়ে। তাকে না নিয়ে যাওয়া যায় ডাক্তারের কাছে, না করানো যায় চিকিৎসা। সবটাই লোক-লজ্জার ভীষণ এক ভয়। এই ভয় অতিক্রম করা পরিবারের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না, তা আমি নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি।

প্রথম যেদিন ঐশীর সংবাদটা পড়লাম, নিজের মধ্যে এক ধরনের বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গিয়েছিল আমার। ঐশী তার বাবা-মাকে মেরেই ফেলেছে। অথচ প্রত্যেকটি মাদকাসক্ত সন্তানের ক্ষেত্রেই এই একই জিনিসটি ঘটে, তাদের প্রথম শত্রু হয়ে যায় তাদের বাবা-মা এবং তারা নিরন্তর বাবা-মায়ের মৃত্যু কামনা করে। আমিও করেছি হাজার বার। কিন্তু সম্পর্কগুলো সেই পর্যায়ে যায়নি, তাই আর খুন করে মেরে ফেলাটা হয়নি। অথচ বিভিন্নভাবে তাদের মৃত্যু কামনা সব সময় অব্যাহতই ছিল।

একজন মাদকাসক্ত মানুষ তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই না পারাটাই তাকে মানুষ থেকে অমানুষ করে দেয়। অল্পতেই অস্বাভাবিক রাগ, রাগাত্বক আক্রমণ যেন যার ওপর রাগ করা হয়েছে, চাইলেই তাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলা যায়।

১২ বছর পর যখন আমি একটু একটু করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি, বার বার সেই অস্বাভাবিক আচরণগুলো আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে কতো ভুল ছিলাম আমি প্রতিটি পদে পদে। কিন্তু ঐ সময় সেই রাগগুলোকেই সহজাত মনে হতো, সেই রাগ ও জিদগুলোর জন্য ভীষণ গর্ববোধ করতাম। কিন্তু আজ যখন স্বাভাবিক জীবনে সেইসব দিনের কথা ভাবি, বার বার লজ্জিত হই। আমি জানি ঐশীরও এখন তাই হচ্ছে।

Oishi 2সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গার মাদক বিক্রির স্পটগুলো আমি চিনতাম। বন্ধুর সংখ্যা ছিল অগনিত। এ দেশে হাত বাড়ালেই খুব সহজে মাদক পাওয়া যায়। মাদক নিয়ন্ত্রণের কোন উদ্যোগ সেভাবে আজ পর্যান্ত চোখে পড়লো না। অথচ অল্প বয়সে যে ছেলেমেয়েরা এতে আসক্ত হচ্ছে, সমাজ তাদের দিকে শুধু ঘৃণাই ছুঁড়ে দিচ্ছে।

আমি বলি এই ঘৃণা সেইসব মানুষদের জন্য হওয়া উচিৎ যারা এই মাদকাসক্তদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ না করে তাকে আরও একা করে দিচ্ছে।

একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির প্রধান নির্ভরতার জায়গা তার পরিবার। আমার মাও আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। কিন্তু একটা পর্যায়ে আবার বুকে তুলে নিয়েছেন। আমার কপালটা খুবই ভাল যে আমি একজন সাহসী মাকে জীবনে পেয়েছি। এরপর আছেন আমার আপা। যিনি আমার হাতটা অনেক শক্ত করে ধরে আছেন যার জন্য আমি আর দ্বিতীয় বার পিছলে পড়ে যাইনি। কিন্তু সবার কপাল এতো ভাল না। সবাই এই হাতগুলো, বুকের স্নেহগুলো পায় না। যেমন হয়তো পায়নি ঐশী।

এখন মৌলিক একটি প্রসঙ্গে আসি। কেন ঐশীকে ফাঁসি দিতে হবে? বা কেন ঐশীকে ফাঁসি দেয়া যাবে না? উত্তর হিসেবে প্রথম দল বলছে, এটা ন্যয় প্রতিষ্ঠার জন্য জরুরি। অনেকেই এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং ভয়ে আর মাদক গ্রহণ করবে না।

দ্বিতীয় পক্ষ বলছে, ঐশীর ছোটো ভাইটির জন্য হলেও তাকে ফাঁসি দেয়া যাবে না। আমি বলবো, না, ঐশীকে ঐশীর নিজের জন্যই ফাঁসি দেয়া যাবে না। মাদকাসক্ত সময়টি স্বাভাবিক নয়। এটা ভয়াবহ এক আবেগীয় অসুস্থতার মূহুর্ত। একটি অস্বাভাবিক সময়ে একজন অস্বাভাবিক মানুষ এবং খুব অল্প বয়সে না বুঝেই জীবনের চরম একটি ভুল করে বসেছে। তাকে ফাঁসি দিয়ে আর যাই হোক কোন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এটা সম্ভব না।

ঐশী দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে ফাঁসির মঞ্চের দিকে। অথচ ক’দিন আগে কোনো এক পত্রিকায় পড়েছিলাম, মেয়েটি তার উকিলকে বলেছে, দেখবেন আমার ফাঁসি হবে না শেষ পর্যন্ত। আমি আশান্বিত হয়েছি। মনে হলো, আমিও মনে হয় সেই ফাঁসির মঞ্চ থেকে শেষ অবধি রক্ষা পেয়ে গেলাম। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারছি বাস্তবতা ঐ ছোট্ট মেয়েটির অনুমানের চেয়ে অনেক ভয়াবহ।

ঐশী যা শাস্তি পাবার তাতো পাচ্ছেই। যদি ফাঁসি না হয়, তো বাকি জীবনটা তাকে এই শাস্তির মধ্য দিয়েই যেতে হবে। তাকে নতুন করে শাস্তি দিয়ে একটা প্রাণের অপচয় না করলেও চলে। যেদিন দেখলাম কবি নির্মলেন্দু গুণ ঐশীর ফাঁসির আদেশ বাতিলের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন, নিজের অজান্তেই চোখে জল জমেছিল, মনে হয়েছিল ঊনি আমার জীবনদানের জন্যও এই ভিক্ষা চাচ্ছেন।

আজ আমার এই সুস্থ জীবনের জন্য বার বার সৃষ্টিকর্তার কাছে ধন্যবাদ জানাই। আমার মতো আর একটু সময় যদি আজ ঐশী পেত, নিশ্চই ঘটনাটা এমন হতো না। সে তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো।

মাদকাসক্ত সময়ের অন্যতম একটি অভিশাপ হলো বন্ধু মহল। এরা এহেন কুপরামর্শ নেই যা দেয় না। আসলে তাদের অবস্থাও একই। তারাও সবাই অস্বাভাবিক। কাজেই তাদের প্ররোচনাগুলোও সেরকমই হয়। এক্ষেত্রেও হয়তো তাই ঘটেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে যাই বলুক না কেন, ঐশী একটি সাঙ্ঘাতিক অপরাধ করে ফেলেছে, নিজের অজান্তেই।

আমরা যারা মাদকাসক্ত ছিলাম বা আছি, আমরা কেউই ঐশীর চেয়ে আলাদা কেউ নই। আমিতো নই-ই। যতো বার ঐশীর খবর পড়ি মনে হয় আমার কথাই আলোচনা হচ্ছে। আমরা আলাদা কোন সত্ত্বা নই, আমরা একই। আমিও ঐশী, ঐশীও আমি, মিলেমিশে একাকার। আজ ঐশীর জন্য দুহাত তুলে প্রাণ ভিক্ষা চাচ্ছি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে।

দয়া করুন, এই ছোট মেয়েটিকে দয়া করুন। একটা বার বড় আকারের একটি মিরাকেল করে দিন প্লিজ। মেয়েটিকে বাঁচতে দিন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.