সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলন: আমার কিঞ্চিৎ দ্বিমত

শাশ্বতী বিপ্লব: একটি গড়পরতার কয়লা নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (৫০০ মেগাওয়াট) গড়ে বছরে ৩.৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করে। আমরা সবাই জানি, কার্বন ডাই অক্সাইড গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর অন্যতম প্রধান কারণ।

Shaswati 4১০,০০০ টন সালফার ডাই অক্সাইড তৈরি করে, যা থেকে এসিড বৃষ্টি হতে পারে এবং শস্য, বন ও মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১০,২০০ টন নাইট্রোজেন অক্সাইড মিশ্রিত ধোঁয়া ফুসফুসের টিস্যুকে পুড়িয়ে দেয় এবং এ্যাজমাসহ শ্বাসযন্ত্রের নানা ক্রনিক অসুখ তৈরি করে।

৫০০ টন বায়ুবাহিত কণা মানুষের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে, ব্রঙ্কাইটিস হয়, ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাসসহ অকাল মৃত্যুর কারণ ঘটে। ছোট ছোট বায়ুবাহিত কণা রক্তনারীতে মিশে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

ছাই ও কাদার যে সলিড বর্জ্য তৈরি হয় তাতে আর্সেনিক, পারদ, ক্রোমিয়াম ও কাডিয়াম থাকে যাতে মাটির গুণাগুণ নষ্ট করবে, পানি দুষণের কারণ হবে।পানিতে মিশে যাওয়া পারদের কারণে লার্নিং ডিসএবিলিটি, ব্রেইন ড্যামেজ এবং স্নায়ুবিক ডিজঅর্ডার হবে। আর্সেনিক এর কারণে ক্যান্সার হবে। সীসা, ক্যাডিয়ামসহ আরো অন্যান্য টক্সিক ভারী ধাতু মানুষ ও প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে সমূহ ক্ষতি করবে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতাসহ ডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডার হবে, নার্ভাস সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কার্বন মনোঅক্সাইডের কারণে মাথাব্যথা, স্ট্রেস ও হৃদযন্ত্রের অসুখ বৃদ্ধি পাবে।

কয়লায় ইউরেনিয়াম এবং থোরিয়াম নামে অল্প পরিমাণে তেজস্ক্রিয় উপাদান আছে। কয়লা যখন পোড়ানো হয়, তার ছাইয়ে এই উপাদানগুলো থাকে। যা কিনা বাতাসে এর পরিমাণ স্বাভাবিক লেভেলের চাইতে কমপক্ষে দশ গুন বাড়িয়ে দিবে।

river-in-sundarbansদূষণ কমানোর যে ব্যবস্থা সেটাও ঝুঁকিহীন নয়। আর্সেনিক, এ্যালুমিনিয়াম, বোরন, ক্রোমিয়াম, ম্যঙ্গানিজ, নিকেলসহ অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থেকে দূষণ কমানোর জন্য ব্যবহৃত ব্যাগপাইপ এবং স্ক্রাবার থেকে মাটির নীচের পানি ও ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেম দুষিত হতে পারে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের জন্য যতটুকু ক্ষতিকর, মানুষের জন্যও কম ক্ষতিকর নয়।

আর এইখানেই এই আন্দোলনের সাথে আমার কিঞ্চিৎ দ্বিমত।

মাত্র ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বদ্বীপে জনসংখ্যা ১৬ কোটি। মানুষ আর প্রকৃতি এখানে জড়াজড়ি করে থাকে। উত্তরে, পূবে, পশ্চিমে যেখানেই স্থাপন করা হোক সেখানেই মানুষের জীবনযাপন, মাটি, পানি, কৃষিকাজ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। রামপালে কয়লা নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সুন্দরবনের জন্য যেমন বিপর্যয় ডেকে আনবে, অন্য কোথাও হলে বিপর্যয় ডেকে আনবে মানুষের। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা আমার কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সমানভাবে (!) তেমনি গুরুত্ত্বপূর্ণ মানুষকে রক্ষা করাও।

Sundarbanতাই আমার মতে মূল প্রতিবাদ হওয়া দরকার কয়লা নির্ভর উৎপাদনের বিরুদ্ধে, তা যতো সাশ্রয়ী হোক না কেন। আমাদের বিদ্যুৎ দরকার, কিন্তু সেটা মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি করে নয়। ইদানিং Integrated gasification combined cycle (IGCC) সহ আরো কিছু  প্রযুক্তির কথা বলা হচ্ছে যা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ কিন্তু দুষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে সক্ষম।

আমার জ্ঞান কম, অনেকের চাইতেই এবিষয়ে কম জানি। কিন্তু আমার স্বল্পবুদ্ধিতে এটাই আমার অবস্থান। গল্পটা পুরোটাই বলা উচিত মনে করি। আংশিক সমাধান কোন সমাধান নয়।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.