নদীর ঘাটে ধূলো জমা শৈশব

Sulatana Rahman
সুলতানা রহমান

সুলতানা রহমান: আমাদের একটা নদী ছিলো। শান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের পাড়ে ছিলো বিশাল রেইনট্রি। সেই গাছের মগ ডালে উঠে ঝপাৎ করে নদীতে লাফ দিতাম। তারপর সাঁতার কেটে ওপারে, কার আগে কে যেতে পারে সেই প্রতিযোগিতা। নদীটা মোটেও ছোট ছিল না। ঘন্টাখানেক লাগতো ওপারে যেতে, আবার ঘন্টা খানেক সাঁতার কেটে এপারে আসা। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকায় গায়ের চামড়া কুঁচকে যেতো, চোখ হতো ভয়ঙ্কর লাল। মাথায় নদীর বালুর আস্তর জমতো। ওই সুরত হালে বাসায় ফেরামাত্রই আম্মুর ‘মাইর’ মাটিতে পড়তো না, বাথরুমে ঢুকিয়ে শুরু হতো আম্মুর হাতে ঘষামাজার গোসল, সঙ্গে বোনাস থাকতো মগের আঘাত। তারপর গৃহবন্দী। মানে বাসার দুই পাশের দুইটা কলাপসিবল গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হতো, যাতে বাইরে যেতে না পারি। বারান্দায় বসে তখন কুতকুত খেলা ছাড়া উপায় নাই। এদিকে দুপুর হলেই সঙ্গী সাথীরা দূর থেকে আকারে ইঙ্গিতে ডাকত। অসহায় ভাবে তাকিয়ে দেখতাম তাদের। আম্মুর নির্দেশে সব কিছু রুটিন মতো, দুপুরে খেয়েই ঘুমাতে হবে, সন্ধ্যায় পড়াশোনা। দুপুরে ঘুমানোর সময় আম্মু বাজ পাখির মতো তাকিয়ে থাকতো-নড়াচড়া করি কিনা। সেসময় আবার নিয়ম করে দুপুর বেলায় ইলেক্ট্রিসিটি থাকতোনা। আম্মু বাতাস করতো আর একটু নড়লেই সেই পাখা আছড়ে পড়তো আমাদের শরীরে। শরীরের যে অংশটি নড়তো সেই অংশে আঘাত। আম্মুর কোনও বেত ছিল না, তবে মগ, পাখা, সেই অভাব পূরণ করেছিল। মরার মতো পড়ে থাকতে থাকতে কখন যেনো ঘুমিয়ে যেতাম, কোনও কোনও দিন, আম্মুই ঘুমিয়ে পড়তো। সেই দিন হতো আমাদের ঈদের দিন। নি:শব্দে বিছানা ছেড়ে রুম থেকে বের হতে পারলেই কেল্লা ফতে। বাসার সঙ্গেই ছিলো দুটি সুপারি গাছ। ছাদে উঠে সেই গাছ জড়িয়ে পুররররররররর করে নিচে নেমে যাওয়া। তারপর পুরাই স্বাধীন-বিশ্বভ্রমান্ড আমার! নদীতে ঝপাৎ করে লাফিয়ে পড়া, সন্ধ্যার আগে আগে নদীর পানিতে টান পড়তো। মাছেরা পানির ওপর ভেসে ভেসে সাতার কাটতো, গামছা নিয়ে তাদের তাড়িয়ে বেড়ানো…

আমাদের শান বাঁধানো ঘাটলার একটু দূরেই ছিলো গাঙ্গুলীদের ঘাট, কাঠের। গাঙ্গুলীদের কথা আমার মনে নেই, তাদের দেখিওনি কোনওদিন। আমার জন্মের আগেই তারা বাড়িঘর ফেলে দেশ ছেড়েছিলো। তবু ঘাটলাটির পরিচয় তাদের নামেই। হিন্দু বৌয়েরা গা ধুতে আসতো সন্ধ্যা নামার আগে আগে। নদীর ওপাড় থেকে পূবের আকাশ রঙিন করে ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরতো টিয়া পাখি, নারকেল গাছগুলোতে তাদের ঘর। তাদের সে কি ক্যা ক্যা চিৎকার! অনেকদিন ভেবেছি, এতো টিয়া এক সঙ্গে যায় কোথায়? খুব ভোরে ঠিক মতো ফোটার আগেই তারা উড়াল দেয়, নদীর ওপার যেতে যেতে এক সময় তারা মিলিয়ে যায় দিগন্তে…ভেবে কুলকিনারা পাইনা-দিনভর তারা কি উড়তেই থাকে! গোধূলি বেলায় ঠিক ঠিক ফিরে আসে নিজ ঠিকানায়। আমার বড় রহস্য লাগে টিয়া-যাত্রা। নদীর কিনারের মগ ডালটায় বসে পা দুলাতে দুলাতে দেখি টিয়াদের ঘরে ফেরা। মনে পড়ে, বাসায় ফেরার কথা। সঙ্গে সঙ্গে আত্মা কেঁপে ওঠে আম্মুর ভয়ে। সুপারি গাছ বেয়ে নেমে আসার সময় ভেবেছিলাম, আম্মুর জেগে ওঠার আগেই ঘরে ফিরবো। টিয়াদের মতো সময়-জ্ঞান নেই আমার, আহারে যদি টিয়া হতে পারতাম!
গেট দিয়ে যে ঢুকতে পারবো না, তা নিশ্চিত। আবার সুপারি গাছ বেয়ে পুরররররর করে ওঠা যায়না। কৌশল আছে, কিন্তু সেই কৌশলে আমি ছিলাম আনাড়ি। বটগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বাসার ওপর নজরদারি, তারপর ভোঁ দৌড় দিয়ে কলাপসিবল গেট পেরিয়ে বাসার পেছনে যেতে হবে, নি:শব্দে উঠতে হবে সুপারি গাছ দিয়ে। জ্বিন-পরি’র চোখ ফাঁকি দেয়া যেতে পারে কিন্তু আম্মুর চোখ এড়ানো যাবে না। ওই বয়সে কেবল একটি দোয়া-ই আমার পুরো মুখস্ত-ঠোঁটস্ত ছিলো-বিপদের দোয়া, দোয়া ইউনুস। আম্মুর হাত থেকে বাঁচতে মনে মনে জপতে থাকি-লা ই লাহা ইল্লাহ আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুম মিনহায জোয়ালেমিন। মনে মনে আল্লাহ’র কাছে বলি, আল্লাহ এবারের মতো মাফ করো, আম্মুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দাও। জীবনে আর এই ভুল করবো না।‘ এই একই কথা শুনতে শুনতে বোধহয় আল্লাহও মহা বিরক্ত। বটের গাছের ফাঁক দিয়ে দেখি, আম্মু হনহন করে হেঁটে একবার এই মাথায় যাচ্ছে আরেকবার ওই মাথায়। আমার কান্না পেয়ে যায়-ইশ যদি আরেকটু আগে আসতাম! জোড়ে জোড়ে দোয়া ইউনুস পড়তে থাকি। পেছন থেকে কেউ একজন আমার হাত চেপে ধরে। শরীর থেকে আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার মতো ভয়ে চমকে উঠি। জেঠি মা। আমাদের পাড়ায় ছোটরা সবাই তাকে জেঠি মা ডাকি। জেঠি মা বলে আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলাম। কান্নার তোড়ে আর কিছুই বলতে পারি না। আমার হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এলো কলাপসিবল গেটের সামনে।
‘বউ, দেখো, মাইয়াটা ভয়ে কাঁপতেছে। তুমি কিন্তু ওরে কিছু কইওনা,’ জেঠি মার গলায় আদেশের সুর।
আম্মুর চোখ দু’টোকে মনে হয় বাঘের চোখ। ‘আপনাদের জন্য ওদেরকে শাসন করতে পারিনা। সারাদিন নদীর ঘাটে থাকে। পড়ালেখা তো কিছু হবেনা।‘
জেঠি মা আম্মুকে আর কিছু বলেনা। বলে আমাকে, যা মনু, হাত মুখ ধুইয়া পড়তে বয়। আর সারা দিন নদীর পাড়ে যাসনা।
আম্মুর গেটের তালা খুলতে খুলতে বলে, পান খেয়ে যান।
আমি ভেজা বিড়ালের মতো ছোট ছোট পায়ে কিছুটা স্লথ গতিতে গেট পেরিয়েই এক মূহূর্তও দেরি না করে ভোঁ দৌঁড়। সোজা বাথরুমে। দুই তিন মিনিটের মধ্যেই উচ্চ স্বরে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে পড়তে থাকি, আমাদের ছোট নদী চলে এঁকে বেঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
আম্মু জেঠিমা পান খায়, গল্প করে। আম্মুর রুটিন শুরু হলো। জানি, একটু পরই আসবে পাড়ার কাকী-পিসিরা। আমি ঢুলতে ঢুলতে পড়ি, আমাদের ছোট নদী চলে এঁকে বেঁকে…. ঢুলতে ঢুলতে কখন যেনো টেবিলের ওপরই ঘুমিয়ে যাই। মাঝে মাঝে জেঠিমার কন্ঠস্বর শুনি, কিরে মনু পড়ো না? আমি মিনমিন করে অস্ফুট ভাবে পড়ি….আমাদের ছোট নদী চলে এঁকে বেঁকে…

কিছু দিন আগে সেই লোহালিয়া নদীর পাড়ে দাড়িয়ে দম বন্ধ লাগে আমার। রেইন ট্রি নাই। সেই শান বাঁধানো ঘাট এখন মাটির নিচে, জানি বলে ঠিকই চিনেছি-ওই যে ওখানে ছিলো আমাদের ঘাট। নদী চলে গেছে বহু দূর। টিয়া পাখিরা ওপারের যে দিগন্তে মিলিয়ে যেতো সেই ‘ অ নে ক দূর’ কে মনে হয়, ওই তো কাছে! ‘সেই আর এই’-এর দূরত্ব কেবল ত্রিশ বছর! দীর্ঘ শ্বাস কতটা দীর্ঘ হলে ত্রিশ বছর ছোঁয়া যায়? নদীর দমকা বাতাসে উড়তে ইচ্ছে করে, ওই যে টিয়ারা যেখানে যেতো।
‘মনু কহন আইছো?’ প্রশ্ন শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি জেঠিমা। সেই আগের মতোই আছে, শুধু চামড়া গুলো একটু থুড়থুড়া হয়ে ঝুলে গেছে। প্রণাম করে জড়িয়ে ধরি, কেমন আছো জেঠি মা?
ভালোই আছি। মনু তোর মায় আয় নাই? তোর মা’র শরীর কেমন? ময়না দুলারী কেমন আছে? সবাই এক লগে থাহো? তোর মায়রে দেহিনা কত বচ্ছর! আমাগো কতা ভুইল্লাই গ্যাছে। তোগো দালানডা অন্ধকার হইয়া গেছে। ওই দালানের দিকে চাইলেই বেবাক কতা মনে পড়ে। মনু, তোর আব্বুর কতা কি মনে আছে তোর? তোগো সবাইরে কোলে কান্দে লইয়া নদীর পাড়ে হাঁটতো। তুই তো ছোড আছিলি….জেঠি মা একের পর এক প্রশ্ন করে যায়, মনে করিয়ে দিতে চায় ভুলে যাওয়া সব কিছু…….

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.