সরকার নয়, ওদের রুখবো আমরা!

শারমিন শামস্: এবারও কি ঈদ আনন্দ করবেন? এবারও কি সেমাই রাঁধবেন? এবারও কি আনন্দমেলা দেখবেন টিভির পর্দায়? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়ে থাকেন, আমার প্রশ্ন আপনাদের জন্য- কেন করবেন? কেন? কেন এইদেশে এখনও হবে ঈদের আনন্দ? কেন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন গণভবন আর বঙ্গভবনে? কেন? উত্তর দিন।

Moonmoon 2আমি সবিনয়ে নয়, আমি আমার সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে চিৎকার করে জানতে চাই, কেন ঈদের আনন্দ করবেন আপনারা?

আজকের এই পরিস্থিতি তো আমরা সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষেরা অনেক আগেই আশঙ্কা করেছিলাম। অসংখ্যবার আপনাদের উদ্দেশে রাগ-ক্ষোভসহ অনুরোধ জানিয়েছি, সতর্ক হতে বলেছি, নিরাপত্তা চেয়েছি। হয়তো জবাব দেবেন, এটি বৈশ্বিক পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। মেনে নিলাম। কিন্তু কেন বারবার আপনারা বলেছিলেন, এই দেশে আইএসআইএস নেই। কেন বারবার অস্বীকার করেছেন পুরো বিষয়টা, কেন এড়িয়ে গেছেন, কেন ব্লগার হত্যাকাণ্ডের একটিরও বিচার হয়নি? কেন একের পর এক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হত্যার পরও পরিস্থিতি সামন্যতমও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন নাই? কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হয়নি আরো? কেন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য নাই? কেন আপনারা বারবার বলেছেন দেশে জঙ্গি নাই? আমরা এইসব প্রশ্নের উত্তর চাই। আপনারা উত্তর দিতে বাধ্য।

কারণ আমাদের ভোট পেয়ে, সমর্থন পেয়ে, আমাদের ট্যাক্সের টাকায় ক্ষমতার মসনদে বসে আঙ্গুল নাচাচ্ছেন আপনারা। আর যখনই কোন হামলা, হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তা আপনাদের টিকিটাও স্পর্শ করছে না। মরে যাচ্ছি আমরা, আমাদের রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব। কেন? কেন সাধারণ, অতি সাধারণ মানুষ আমরা, দুইবেলা খেটে খাই যারা, রাজনীতি, ধর্মনীতির সাতেপাঁচেও যারা নাই, তারা কেন জবাই হচ্ছি? তারা কেন শেষ হয়ে যাচ্ছি? উত্তর দিন।

সারারাত টিভি আর অনলাইনে নিউজ দেখে দেখে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত, বিধ্বস্ত আমরা হয়তো মিনিটখানেক ঘুমিয়েছি, হয়তো ঘুমাইনি। ওই রেস্তোরাতে আটকা পড়ে আছে বহু পরিচিত-অপরিচিত মানুষ। সেখানে আমিও থাকতে পারতাম, পরিবার বা বন্ধুদের সাথে রাতের খাবার খাওয়ার আনন্দ নিয়ে যেতাম, ফিরতাম লাশ হয়ে।

Gulshan 1আমরা বিধ্বস্ত, আমরা উৎকণ্ঠা নিয়ে সারাটা রাত জেগে বসে আছি। প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, দুপুরে সরকারপ্রধান হিসেবে আপনার বক্তব্য শুরু হলো ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে। সাথে সাথে করতালি। এরপর বললেন, ঈদ উপহার চার লেনের রাস্তা। আবারো তুমুল করতালি। হায় সেলুকাস! আমাদের বুক ফেটে যাচ্ছে রক্তক্ষরণে, আর আপনি এখনো এইসব দিয়ে শুরু করেছেন। জানি না, এটা রাজনীতির কোন ভাষা! এ ভাষা পড়ার ক্ষমতা আমাদের নাই।

যাই হোক, অবশেষে বললেন, ১৩ জনকে উদ্ধার করেছেন। বাকি সব মৃত। ছয় জঙ্গি মারা গেছে। একটা ধরা পড়েছে। আপনার ভাষায় এটি সফল অভিযান। আর কিছু বলার নাই। আমি জানি না সফলতার সংজ্ঞা কী! আমি জানি না, রাষ্ট্র চালাতে কী কী কূটকৌশল লাগে। আমি জানি না, কোন আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপে আপনি আজ দিশাহারা। আমি জানি না, কেন একের পর এক হত্যার বিচার হয় না। আমি জানি না, কেন চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

Gulshan 2আমাদের একতাই হয়তো শেষ ভরসা। সরকার তার কাজ করবে তার উপায়ে। তার নিজস্ব হিসাব নিকাশ আছে হয়তো। এসব জানার সুযোগ আমাদের নাই। আমরা শুধু জানি, এই আমাদের দেশ। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান আদিবাসীদের নিয়ে একটা ছোট্ট ছিমছাম ছবির মত দেশ। বোকা বোকা মানুষের দেশ। দুঃখী, কিন্তু প্রতিবাদী মানুষের দেশ। অসহায় কিন্তু সাহসী মানুষের দেশ।

সবাই এগিয়ে আসুন। সবাই এক হোন। সবাই জোটবদ্ধ হোন। সবাই বন্ধু হোন। অনুগ্রহ করে আপনারা ধর্মকে আর আলোচনা বা সমালোচনা কোনকিছুতেই জড়াবেন না। শুধু দেশের কথা ভাবুন। দেশপ্রেমের চেয়ে বড় ধর্ম নাই। মানুষের প্রতি ভালোবাসাই প্রকৃত ঈশ্বরপ্রেম। জগতের সকল প্রাণীর কল্যাণই প্রকৃত ঈশ্বরসেবা। দয়া করুন আপনারা। যার যার ধর্ম পালন করুন নিজের মত করে। অন্যকেও তার ধর্ম পালন করতে দিন। যার নাস্তিকতা চর্চা করতে ইচ্ছে করে, করুক। যদি ইচ্ছে হয় তার জন্যও প্রার্থনা করুন যেন সে তার মতো করে পথ খুঁজে পায়।

কিন্তু এর বাইরে সকলে একজোট হোন, দেশের জন্য মানুষের জন্য। সরকারকে সাহায্য করুন। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখুন। পাশাপাশি নিজের পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশি, বন্ধু, সহকর্মীদের প্রতি নজর রাখুন। সতর্ক হোন, সচেতন থাকুন।

আজ দেশের এই চরম ক্রান্তিকালে বারবার শুধু এই কয়টি কথাই মনে পড়ছে। আর কিচ্ছু না। আর হ্যাঁ, নিজের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যকে আরো বেশি বেশি করে ছড়িয়ে দিন, যে যেভাবে পারেন। চিন্তায়, কর্মে, আচরণে, পোশাকে, চলায় বলায়, অনুষ্ঠানে, পাঠে, মনন চর্চায়- সবখানে ছড়িয়ে দিন এদেশের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে। ভিনদেশি কোন সংস্কৃতিকে, আচরণকে অন্তরে এবং দেহে ধারণ করা থেকে দয়া করে আজ থেকেই বিরত থাকুন। গড়ে তুলুন একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এক হোন। এক হোন। এক হোন।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখিকা , আমি আপনার কষ্ট বুঝতে পারছি. যে রক্তক্ষরন আপনার মনে হচ্ছে তা আমাদের মনেও হচ্ছে । কিন্তু মানুষ কেন ঈদ আনন্দ করবেনা তা বোঝা গেলনা। ঈদ পালন করলে যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্হান নেয়া যাবেনা তা আমার কাছে পরিস্কার না। আপনি বললেন যে যার ধর্ম পালন করবে। আর দেশে দেশে যুগে যুগে বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে মানুষ শুধু শোক করে যাবে এই যুক্তি মানতে পারছিনা. মৃতের ঘরেও খাওয়া দাওয়া চলে। আপনার ঈদ নিয়ে আক্ষেপ করা বাদে সব কথার সাথে আমি সহমত। আশাকরি আপনি ভেবে দেখবেন।

যেখানে জঙ্গীরা ২০ জন জিম্মী (মানুষ) হত্যা করলো, যেখানে ২ জন পুলিশ অফিসার শাহাদাৎ বরণ করলো সেখানে ঈদের শুভেচ্ছাটি খুব জরুরী ছিলো, হাত তালিও। কেন দু:খে ভারাক্রান্ত হয়না আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়!

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.