ঐশীই হতে পারতো মাদকের বিরুদ্ধে প্রথম বিপ্লব

সাঈদা সুলতানা এ্যানি: যখনই কেউ, সে যে বয়সেরই হোক জীবনের সংকটতম মুহূর্তের মুখোমুখি হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিৎকার করে ওঠে, মাগো…. !  বাবা…. !!

Anneeআজ ঐশীর তেমন করে ডেকে ওঠার কেউ নেই। অথবা ঐশী ডাকছে, শোনার কেউ নেই। যখনই কারো জীবন গভীর সংকটে, তার নিকটতম আত্মজন মা-বাবাই তীব্র হাহাকারে আর্তনাদে ভেঙে পড়ে। আজ ঐশীর জন্য তেমন কেউও নেই।

ঐশী কে? এক ভালোবাসার সন্তান। জন্মেলগ্নেই বাবামা যাকে ঐশ্বরিক পাওয়া ভেবে নাম রেখেছে ঐশী। ঐশী কেন তার আত্মার অংশ নিকটতমজন মা বাবাকে খুন করলো ?

কারণ ঐশী মানসিকভাবে অসুস্থ। সে মাদকাসক্ত সেটি তার মানসিক অসুস্থতার একটি ক্রিয়া বা বহি:প্রকাশ মাত্র। ঐশী কেন মানসিক ভাবে অসুস্থ? কারণ আজকের বাংলাদেশ অমানবিক, অসম, ভারসাম্যহীন। পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙ্গে পড়েছে। বৃহত্তর পরিবার বলতে আজ আর তেমন কিছু নেই। ভুলে ভরা একাকী পরিবারগুলোর বাবা-মা’রা সন্তানকে সুসন্তান হবার কথা বলার সময় পাননা।

স্নেহ ভালোবাসা প্রেমের কোমল অনুভবগুলো আবছা হয়ে গেছে। ভালোবাসার সময় নেই, অযথা কোলাহলের সময় আছে। কেউ আজ বলে না, ভালোবেসে কোমল হতে হয়। বাড়ি নেই, ঘর নেই, এপার্টমেন্ট আছে। আকাশ নেই। ছাদ নেই। নেই পাশের বাড়ির ছাদ। প্রেমও নেই। হাতে লেখা চিঠি নেই। কিশোরীর বেনী নেই।

চরম ভোগবাদী সমাজে সব কিছু আজ বড় উচ্চকিত। কোন বোধই নীরবে বহে না। পরিমিতির বালাই নেই। ‘যত ইচ্ছা খাও’ এর পিৎজা হাট আছে, উঠোনে অনাড়ম্বর আড্ডা নেই।

সৌন্দর্য বড় চড়া। পাড়ায় গলিতে শতশত অস্বাস্থ্যকর বিউটি পার্লার। কেউ বলেনা, সৌন্দর্য্য, মেধা- মননে- হৃদয়ে, চকচকে চামড়া লকলকে চুলে নয়। কোথায় হারিয়ে গেল পাড়ার লাইব্রেরীগুলো? কোথায় সেই বই? বন্ধুর সাথে অদলবদল করে পড়ার তারাশংকর সত্যজিৎ?

সংস্কৃতির চর্চা নেই। হন্যে হয়ে খুঁজেও একজন গানের ওস্তাদজী পাওয়া যায়না। ক্লাসিকাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ভেসে যায় কাবাব চিকেন ফ্রাই কফির বাতাসে। রেষ্টুরেন্টে খাওয়া এখন এ শহরের একমাত্র বিনোদন। আর বিনোদন অযথা কেনাকাটা।

হারিয়ে গেছে লেস ফিতাওয়ালার হাঁক, সাদা মলমলে বাঁধা পিঠে শাড়ি নিয়ে আসা সেই শাড়িওয়ালা! শাড়ি গুলো লাজনম্র আড়ালে থাকতো। আজ রাস্তা জুড়ে সুপারমার্কেট , নির্লজ্জ হাট করে খোলা সব দোকান। ম্যানিকুইনগুলো বড় উন্মুখ , গ্লাস জুড়ে ডাকে,’ আয় আয়’। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আলোয় ওরাও যেন বড্ড বেশি পোড়ে।

হাজার বছরের লাবণ্যময় বাঙ্গালী নারীর সুঠাম শরীর এখন সেকেলে, এখন সময় জিরো ফিগারের। নারীর উপর পুরুষতন্ত্রের এ এক নিষ্ঠুর অবদমন। ‘নারী তুমি কম খাও’। নারী শক্তির স্ফূরণ যেন না হয়! আজ আর নাদুসনুদুস গড়নের টলটলে চোখের ডলপুতুল নেই। আজ আছে জিরো ফিগারের বারবি ডল। আজ প্রতিটি কন্যা শিশু কিশোরী বারবির মতো জিরো ফিগার চায়। এবং এটি একটি তথ্য, ইয়াবা খেলে জিরো ফিগার রাখা যায় ।

Oishi 2ঐশী একটি সংবেদনশীল বালিকা বলে মনো-সামাজিক এতো অসামঞ্জস্য মস্তিষ্কে, মননে ধারণ করতে পারেনি। ক্রমশ সংক্ষুব্ধ হয়েছে, হতাশ হয়েছে, ভেঙ্গে পড়েছে। মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

কেউ তাকে বোঝেনি ,পরম ভালোবাসায় কেউ তাকে ফেরায়নি। আত্মকেন্দ্রিক এ সমাজে কেউ আজকাল আর এ কাজটা করেনা।

ঐশী এই জটিল মানসিক অসুস্থতা সামাল দিতে পারেনি আর তখনি এই ভয়ংকর সমাজ বন্ধু বেশে তার সামনে তুলে ধরেছে সব ভুলে থাকার মন্ত্র ‘মাদক’।

কারা মাদককে সমাজে সহজলভ্য করেছে? কেন সহজলভ্য করেছে? কেবল ব্যবসা? নিশ্চয়ই নয়।

মাদকের প্রসারের পেছনে কাজ করেছে ঠাণ্ডা মাথার এক দুর্ধর্ষ কুচক্র যারা চেয়েছে এ দেশের তারুণ্য নেশায় বুঁদ হয়ে থাকুক। তারুণ্যের সদাজাগ্রত ঝলমলে মুখকে তারা ভয় পায়।

এবং এসব যাবতীয় কিছুর বলী আজকের ঐশীরা। আজ ঐশীরা ঘরে ঘরে। তীব্র অবমাননা অমর্যাদাকর কষ্টের জীবন নিয়ে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে এই ঐশী হয়তো বেঁচেই যাবে তীব্র কষ্টের এই জীবন থেকে। কিন্তু আরো কতো ঐশী ঘরে ঘরে মাদক নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছে তাদের অবস্থা তো আরো খারাপ, ঘরে ঘরে মৃত্যুদণ্ড জারী হয়েছে, হচ্ছে, ধীরে স্লো পয়জনিং এর মতো।

হায় ঐশী। কী মানবতা বিবর্জিত, হঠকারী তোমার মৃত্যুদণ্ডের এ রায়।

তোমাকে বলছে ঠাণ্ডা মাথার খুনী। তুমি তো অসুস্থ, এই অসুস্থ সমাজই তোমাকে অসুস্থ করেছে। এ রাষ্ট্র কি সেটা উপলব্ধি করবে? তোমার মানবাধিকার ও সুবিচার নিশ্চিত করতে এ সমাজ রাষ্ট্র ব্যর্থ। এ সমাজ ব্যর্থ তোমাকে একটা সুন্দর জীবন দিতেও।

হায় ঐশী !

জীবনযাপনের ধারায় একটা ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। দরকার একটা বিপ্লব।

হায় ঐশী, তোমাকে দিয়ে যদি শুরু হতো এ বিপ্লব !!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.