পরিবর্তন চাই! কিন্তু ‘আমি’ কী করছি??

জিনাত হাসিবা স্বর্ণা: নারীর প্রতি ঘটতে থাকা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযোগ-অনুযোগ-প্রতিবাদ হচ্ছে এবং এটা হওয়া জরুরি। কিন্তু এই দাবিগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘কোনো বায়বীয় পক্ষের প্রতি’ এবং তা বুঝে পাওয়া অনেকাংশেই সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল। ফলে বৈষম্যের অবসান সময়সাপেক্ষ।

অন্যদিকে কিছু পরিবর্তন আছে আমাদের হাতের মুঠোয়; শুধু আমার-আপনার চাওয়া ও সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।

13563572_10208931465657406_557053163_nবছর দুই আগে। অফিস শেষে সহকর্মীরা একসাথে বের হয়ে গুলশান লেকের পাশ ধরে হেঁটে গিয়ে উঠলাম মেইন রোডে। চোখ পড়লো আমাকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া নাজমুল ভাই আর মোমিন ভাইয়ের দিকে। পিঠে ব্যাকপ্যাক। দুই হাত নেড়ে দিব্যি কথা বলতে বলতে হাঁটছেন। অফিসের জরুরি কোনো আলাপ। প্রথমটায় ভালো লাগলো ওদের দেখে, কী নির্ভাবনায় হাঁটছে!

ঠিক ঐ মুহূর্তেই আমি নিজেকেও দেখতে পেলাম। শিরদাঁড়া শক্ত। ব্যাকপ্যাকটাকে সামনের দিকে বুকে করে নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়েছি। হাত দুটোকে পেছন দিকে ক্রস করে রেখেছি ছোটবেলায় ঠিক যেভাবে আব্বুকে মাঝে মাঝে পায়চারী করতে দেখতাম ঘরের করিডোরে।

ব্যাগটা সামনে নেওয়ায় হাঁটতে একটু অসুবিধা হচ্ছে বটে, পিছিয়ে গেছি তাই। তবে সামনের দিকের প্রতিরক্ষা পুরোপুরি নিশ্চিত করা গেছে। কিন্তু পেছনের দিকের প্রতিরক্ষায় থাকতে হবে একদম সজাগ। এক মুহূর্ত এদিক-ওদিক হলেও হাত পড়তে পারে শরীরে। আর যদি ঠেকানোই না যায়, নচ্ছারটাকে মুহূর্তেই ধরে ফেলতে সজাগ থাকা চাই। সবক’টা স্নায়ু টান টান! কানও খাড়া আছে। দেরি করা যাবে না কানের পাশ ঘেঁষে কী বলে গেলো বুঝতে, তাহলেই আর ধরতে পারবো না বেটাকে!

এর আগের ছয় মাসে উত্তর বাড্ডার হোসেইন মার্কেটের সামনে কোমরে, গুলশান-২ ডিসিসি মার্কেটের সামনে বুকে, গুলশান-১ মোড়ে এবং বইমেলার গেটে নিতম্বে অযাচিত কোনো কুৎসিত হাতের চাপে এই দশা আমার!

নিজের এই বিচিত্র চিত্রে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। তারপর মনটা একটু উদাস হলো। একটু কি ঈর্ষাও হলো? মন খারাপ। ঐ ‘নির্ভাবনা আলাপচারিতা’য় আমিও কি অংশ হতে পারতাম না? কেন নয়? পারিই তো! কুৎসিত কোনো লোকের জন্য এতো আগে থেকেই আমার সময় আর শক্তি ব্যয় করার প্রয়োজনটা কী! যখনকারটা তখন দেখবো। ব্যস, এতটুকুই। সময় একটু লেগেছে, কিন্তু চিত্রটা পাল্টে গেছে।

শুধু এ ক্ষেত্রেই নয়। নারীরা ঘরে সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে এবং দিয়ে রাখছি নারীরই হাতে। নির্জীব হয়ে যাচ্ছি এক হাতে রান্না, ধোয়া- মোছা আর গোছগাছ করার দায় নিতে নিতে। অনুযোগ করছি, কেঁদে ভাসাচ্ছি, বিষন্নতায় ভুগছি। কিন্তু পরিস্থতি বদলের জন্য কিছু করছিনা। ছাড় দিচ্ছি না একটুও। ঝুঁকি নেবো না মোটেই।

‘বেঁচে উঠতে’ মন নেই, সম্পর্ক টেকানো চাই যেকোনো মূল্যে! ঘরের ছেলে বা পুরুষ রান্না ঘরে কাজ করবে কিংবা ঝাড়ুটা হাতে নিবে, এটা আমাদের চোখ মানতে রাজি নয়। যে মানুষ কখনো ঘরের কাজ করেনি সে তাতে হাত দিলে ভুল হওয়াই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কালেভদ্রে পুরুষটি কাজ করতে আগ্রহ দেখালে তাকে সেই সময় আর সুযোগ দিতে আমরা অধৈর্য্য। বিরক্ত হয়ে নিজের হাতে তুলে নিচ্ছি কাজটা। কিংবা খুব এক চোট হাসছি!

পরিবারের পুরুষটি হঠাৎ ঘরের কাজে হাত দিলে দেখতে কিছুদিন একটু অদ্ভুত ঠেকবে, কাজ ক’দিন এলোমেলো হবে, সময় না হয় বেশিই লাগবে, পরিবারেরই কিংবা আত্মীয় স্বজনের কটু কথা বা বিরক্তি হজম করতে হবে। এই তো?

কিন্তু আমি যদি সুযোগটা না দিয়ে ব্যাপারটা বিরক্তি বা হাসি-ঠাট্টার দিকে নেই, তাহলে তো কাজটাতে তাকে নিরুৎসাহিত করলাম আমিই। আরো আছে। ‘আমি থাকতে’ এই কাজগুলো ঘরের পুরুষেরা করার সুযোগ পেলে তার দায় আসবে আমার কাঁধে, তাতে আমার ভীষণ ভয়!

জীবনের এতোটা সময় ব্যয় করেছি ‘লক্ষী/ভালো মেয়ে’ হতে। এখন লোকের কাছে খারাপ হবো? কক্ষনো না! -এই ‘ভালো হওয়ায়’ ছাড় না দেওয়ার জন্যেও অনেক সময় এই সুযোগগুলি পায়ে ঠেলি আমরা। যা আমি ‘চাইতে পারি’, তা যে আমি চাই এটা কেউ জানলে পরেই আমি খারাপ- নিজের সঙ্গেই প্রতারণা নয়?

গঞ্জনা আমরা এমনিতেও শুনি। শুনি অচল এবং ক্ষতিকর সামাজিক রীতিগুলো সামলাতে হিমশিম খাই বলে, পেরে উঠি না বলে। এর চেয়ে সেই গঞ্জনাটাই এসব চর্চায় ‘পরিবর্তন’ আনার জন্য শুনি না কেন! কান্না আর বিষন্নতার বদলে তখন মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ মিলবে অন্তত। আটকে থাকা দমটা একটু হলেও মুক্তি পাবে!

নিজের অবদান আর পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ভেবে আপাত মহান যে ‘স্যাক্রিফাইস’ আমি করছি তার মাশুল এই প্রজন্ম গড়িয়ে পরের প্রজন্মে যাবে। নিজের জীবনের আনন্দগুলো চাপা পড়বে। সংসার টিকবে কিন্তু আত্মা বাঁচবেনা। সন্তান বেড়ে উঠবে বৈষম্যে ভরপুর একটা সংসারে। এই দায় শোধ করবে তার ভবিষ্যৎ সঙ্গীটিও। অথচ প্রথাগত কিছু রীতির বিপরীতে নিজের একটা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেই পরিস্থিতি বদলে যাবে, মানুষ হিসেবে নিজের পরিধিটাও বাড়তে শুরু করবে।

নির্ধারিত গণ্ডি ভেঙে আমি-আপনিই যখন ‘বেঁচে নিচ্ছি’ মুক্ত হাওয়ায়, নারীর প্রতি বৈষম্যে ইতি টানতে তখন আর কী লাগে? তাই নিজের দিকে মাঝে মাঝে তাকানো খুব প্রয়োজন! কবে কে পরিবর্তনের জাদুর কাঠি আনবে আনুক-ততোক্ষণে নিজের সিদ্ধান্তের জাদুটাই দেখিনা কেন?!

২৪ জুন ২০১৬

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.