ব্রিটেন প্রসঙ্গ: ‘বিদায় করেছ যারে নয়নজলে’

জেসমিন চৌধুরী: সেদিন রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, আশা করি ব্রেক্সিট হবেনা, ব্রিমেইন হবে, কারণ সম্পর্ক ভাঙাকে আমি কখনোই ভাল চোখে দেখি না, বিশেষ করে যখন সিদ্ধান্তের উপযুক্ততা সম্পর্কে প্রচুর সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। তদুপরি যখন এই সম্পর্ক ভাঙ্গার উপর নির্ভর করে ৬৫ মিলিয়ন মানুষের ভাগ্য যা কীনা পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের উপর প্রভাব বিস্তার করবে।

কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের পৃথিবী বদলে গেছে, আমরা অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মনে নিয়েও ডিভোর্স করেছি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে, আর সেইসাথে জন্ম দিয়েছি নাইজেল ফারাজের মত বর্ণবিদ্বেষী রাজনীতিবিদদের মতবাদ-নির্ভর নতুন ব্রিটেনের সাথে পুনর্বিবাহের সম্ভাবনার।

13336239_10154292980419850_751286349_nস্কটল্যান্ড এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ইইউতে থাকতে চায়, আর ইংল্যান্ড এবং ওয়েলস বের হতে চায়, বিভক্তি আর কাকে বলে!

ছোটবেলা শেখা নানা প্রবাদ প্রবচন মনে পড়ছে, একের বোঝা দশের লাঠি; ইউনাইটেড ইউ স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড ইউ ফল। এসব প্রবাদ প্রবচন তো এদেশের মানুষেরও অজানা নেই, তারপরও এমন একটা সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেল শিক্ষিত সহনশীল বলে খ্যাত এই জাতি?

এটা কি আসলেই ব্রিটেনের সংখ্যাগুরু মানুষের সিদ্ধান্ত?

এ বিষয়ে কী ভাবছে দেশের সাধারণ মানুষ? কী অনুভব করছে তারা? কীভাবে এই সিদ্ধান্ত অদূর ও সুদূর ভবিষ্যতে ব্রিটেনের বা পৃথিবীর মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করবে?

প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেছেন বলে তার অনুসারিরা আহাজারী করছে। নিজের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলে পদত্যাগ করা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতি, কিন্তু তাই বলে কি ক্যামেরনকে হিরো আখ্যা দেওয়া যায়?

ব্রিটেনের, ইউরোপের তথা বিশ্বের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অংগনে আজ যে সাইক্লোন বয়ে যাচ্ছে তার জন্য তার নিজের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ  কি কিছুটা দায়ী নয়? নির্বাচনে জেতার জন্য ইইউ রেফারেন্ডামের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার সময় তিনি ব্রিটেনের সার্বিক মংগলকে, না’কি তার দলীয় চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন? হতে পারে তিনি ধরেই নিয়েছিলেন ব্রিমেইন এর বিপরীতে ব্রেক্সিট টিকবেনা, কিন্তু রাজনৈতিক রেসকোর্সে জুয়া খেলতে গিয়ে দেশের এবং দেশের মানুষের ভবিষ্যতকে বাজি ধরার জন্য ইতিহাসের পাতায় তিনি হিরো না’কি ভিলেন বলে চিহ্নিত হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।

কোন সম্পর্কই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়, এবং ইইউর সাথে অবশ্যই ব্রিটেনের কিছু সমস্যা ছিল যা সমাধানের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এগুলো রিফর্মের মাধ্যমে সমাধান করার পথে না গিয়ে সম্পর্কচ্ছেদের পথে গেল ব্রিটেন। সময়ে একফোঁড়ে যা ঠিক করা যেত, তা না করে যে বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করলাম আমরা তাকি নয়শ’ ফোঁড়েও কখনো শোধরানো যাবে?

আমি রাজনীতি বুঝি না, অর্থনীতিও বুঝি না, সে আলোচনার ভার বিজ্ঞজনদের উপরেই ছেড়ে দিলাম। আমি যা বুঝি তা হলো আমার মত সাধারণ মানুষের অনুভূতি আর ভবিষ্যত নিয়ে ভীতি আর উদ্বেগ, তাই আমি সেকথাই বলবো।

চারদিক থেকে উঠে আসা অসংখ্য প্রশ্ন, নানান দৃষ্টিভঙ্গি, আর বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে একজন অভিবাসী ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবে আরো অনেকের মতই আমি বিস্মিত, ক্ষুব্ধ, এবং ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন।

নিজের চিন্তা ভাবনাকে ঠিক গুছিয়ে নিতে পারছি না আমি। তবে এতো আলোচনা-সমালোচনার ঝড়ে অস্বচ্ছ হয়ে উঠা দৃষ্টির কাছেও একটা জিনিষ স্পষ্ট- অসাম্প্রদায়িকতা এবং সহনশীলতায় বিশ্বাসী ব্রিটিশ জাতি আজ বিভক্ত, ভেঙ্গে পড়ছে সামাজিক সংলগ্নতার কাঠামো।

টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদ, ইন্টারভিউ এবং মানুষের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া থেকে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, দেশের বেশিরভাগ মানুষ ইইউ ত্যাগের সিদ্ধান্তকে শুধু ভুল ভাবে না, একটি অপরাধ বলেই মনে করে।

তাহলে এর সপক্ষে ভোট দিল কারা? নিশ্চয়ই মঙ্গল গ্রহ থেকে রাতারাতি আগত এলিয়েনরা নয়। এ নিয়েও চলছে নানান বিতর্ক। কেউ বলছেন বেশীর ভাগ অভিবাসীরাই ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, কেউ বলছেন বর্ণবাদীরা এর জন্য দায়ী, আবার অন্যরা বলছেন, দেশের দরিদ্র মানুষরা এবং রাজনীতিবিদদের অদক্ষতায় বীতশ্রদ্ধ নাগরিকরা একধরনের প্রতিশোধমূলক মনোভাব থেকে কিছু না বুঝেই ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, দারিদ্র জর্জরিত এলাকাগুলোতেই ব্রেক্সিটের জয় হয়েছে বেশি। নাইজেল ফারাজ এবং বরিস জনসনের মতো চতুর এবং সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ যারা বিশ্বাস করেছিলেন ইইউ ত্যাগ করার ফলে প্রতি সপ্তাহে বেঁচে যাওয়া ৩৫০ মিলিয়ন পাউণ্ডের অনেকটাই ‘এনএইচএস’ তথা চিকিৎসা সেবার জন্য ব্যয় হবে।

অথচ ভোটাভোটি শেষ হতেই অন্য সুরে গান গাইছেন তারা। নাইজেল ফারাজ নির্লজ্জভাবে জাতীয় টেলিভিশনে স্বীকার করেছেন লিভ ক্যাম্পেইনের এটা ছিল একটা বড় ভুল, কিন্তু এই ভুলের দায় নিজ কাঁধে নিতে রাজী নন তিনি।

এদিকে অনেক লিভ ভোটার বলেছেন তারা মুসলমানদের এই দেশে আসা বন্ধ করার জন্যই ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। পত্রিকায় পড়লাম ওয়েলসের মুসলিম ব্রিমেইন ক্যাম্পেইনার শাজিয়া আওয়ানকে ভোটের পর ‘তার ব্যাগ গুছিয়ে ইউকে ত্যাগ করতে’ বলা হয়েছে।

আমার পরিচিত মহলে অনেকেই মৌখিক বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। আমার এক বন্ধুর ভাগ্নিকে গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে একজন চেঁচিয়ে বলেছে, ‘এরপর আউট হবে তোমরা’।

নিউক্যাসলে ইংলিশ ডিফেন্স লিগের সদস্যরা ‘স্টপ ইমিগ্রেশন, স্টার্ট রিপাট্রিয়েশন’ ব্যানার হাতে রিফিউজিদের আশ্রয় দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমার সাদা ব্রিটিশ সহকর্মী বা বন্ধুদের সকলেই ব্রেক্সিটের বিজয়ে মর্মাহত, কিন্তু ব্রেক্সিট জেতার পর পথে-ঘাটে অভিবাসী ব্রিটিশরা আগের তুলনায় বেশী অসহনশীল আচরণের শিকার হচ্ছেন তা’ও মিথ্যে নয়।

আজ বাসার পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে আমিও অন্যান্য পথচারীদের আমার স্বভাবজাত মুচকি হাসি উপহার দিতে পারছিলাম না। একটা কথাই ভাবছিলাম, ‘তুমি কি আমার বন্ধু? নাকি তুমি ব্রেক্সিট ভোট দিয়েছ এবং আমাকে বিদায় করতে পারলেই খুশী হও?’ দেশের ১৭ মিলিয়ন মানুষ যখন ইমিগ্রেশন বিরোধী মতবাদের উপর আস্থা রেখে ব্রেক্সিটের জন্য ভোট দেয়, তখন এই দেশ অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ কি’না সে প্রশ্ন  উঠে বৈকি?

আরেকটি নির্বাচনত্তোর বেসরকারী জরিপে দেখা গেছে ১৮-২৫ বছর বয়সের তরুণদের মধ্যে ৭৫% ব্রিমেইনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, কিন্তু বৃদ্ধ ভোটারদের সংখ্যা বেশি হওয়াতে ব্রেক্সিটেরই জয় হয়েছে। তরুণ সমাজের অনেকে বলছেন, তারা ইইউ শূন্য ভবিষ্যত চান না। তারা মনে করেন তাদের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে যদিও সিনিয়র সিটিজেনদের এই ভুলের মাশুল তাদেরকেই গুনতে হবে। তারা ২৭টি দেশে থাকার এবং কাজ করার অধিকার হারাতে যাচ্ছেন এবং এর ফলে অনাগত ভবিষ্যত থেকে হারিয়ে যাওয়া সমস্ত সামাজিক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব এবং অভিজ্ঞতার হিসাব কখনোই ঠিক জানা যাবে না।

যদিও বলা হচ্ছে মেজরিটি ভোটে ব্রেক্সিট জিতেছে, ৭২.২% ভোটার টার্নআউট হিসেবে ধরলে দেখা যায় দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩৭.৪৭% ই ইউ ত্যাগ করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। একটি গণতান্ত্রিক দেশে এতো বড় একটি সিদ্ধান্ত দেশের ৬২.৫৩% মানুষকে বাদ দিয়ে কিভাবে নেয়া যেতে পারে?

যদি শুধুমাত্র ভোটদাতাদের কথা বলি, তাহলেও ৪৮% ব্রেক্সিট এবং ৫২%  ব্রিমেইন ভোট প্রমাণ করে ব্রিটেনের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক এবং প্রকারান্তরে সামাজিক মতবিরোধ ব্যাপক। ছুরি দিয়ে দুইভাগ করে কাটা আপেলের মত বিভক্ত এই জাতির চেহারা এখন মলিন থেকে মলিনতর হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন অনেকে।

ঝড়ের পর ঝড় উঠছে ব্রিটেনের রাজনৈতিক আকাশে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এগারোজন শ্যাডো মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, শ্যাডো ফরেন সেক্রেটারি হিলারি বেনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পদত্যাগের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

অনেকেই লেবার পার্টি লিডার জেরেমী করবিনেরও পদত্যাগ দাবি করছেন। কিছুটা কৌতুককর শোনালেও লণ্ডনবাসীরা মেয়র সাদিক খানকে চাপ দিচ্ছেন ইউকে ত্যাগ করে ইইউতে যোগ দেবার জন্য।

স্কটল্যান্ড আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ইউকে থেকে স্বাধীন হবার বিষয়টিও এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এর চেয়ে অস্থিতিশীল অবস্থা এদেশের রাজনীতি আগে কখনো দেখেছে কি’না আমার জানা নেই। এই অবস্থায় যদি শেষ পর্যন্ত ইইউ’র সাথে বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, ব্রিটেনের বিভক্ত জনতা এই বিশাল মতপার্থক্য নিয়ে কিভাবে সহ-অবস্থান করবে, কিভাবে এগিয়ে যাবে উন্নতি এবং সংহতির পথে?

এক বিশাল ম্যারাথন বিতর্কে লিপ্ত আজ ব্রিটেনবাসী, প্রত্যেকেই আঙ্গুল তুলছেন অন্য কারো দিকে। দায় এড়াতে একের পর এক পদত্যাগ, বরখাস্ত চলছে। মাঝ দরিয়ায় নৌকা ভাসিয়ে লাইফ জ্যাকেট পরে পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছেন রাজনীতিবিদরা। কে দায় নেবে নৌকায় বসে থাকা বিষণ্ণ বিহ্বল জাতির?

এম পি ডেভিড ল্যামি ব্রিটিশ সংসদের কাছে এই রেফারেন্ডামের ফলাফলকে বাতিল করার আবেদন জানিয়েছেন। এক মিলিয়নের উপর ব্রিটিশ নাগরিক দ্বিতীয় রেফারেন্ডামের জন্য পিটিশন দাখিল করেছেন, এবং এই মর্মে আবেদনকারীদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

কিন্তু আসলে কি এটা সম্ভব? কবিগুরু এবিষয়েও গান রচনা করে রেখে গেছেন,

‘বিদায় করেছ যারে নয়নজলে

এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে গো’

তার পরেও মনে আশা আর প্রশ্ন জাগে, হাউস অব কমন্স কি এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে? রাজনৈতিক ভূমিকম্পে কম্পিত ব্রিটেনের মাটিতে কি অচিরেই স্থিতি আসবে, নাকি একের পর এক আফটার শকে কাঁপতে থাকবো আমরা সাধারণ মানুষরা?

জেসমিন চৌধুরী, Freelance ESOL tutor and translator

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.