ওথেলোউদ্দিন

মাসকাওয়াথ আহসান: ডেসডিমোনাকে হত্যার পর ব্রিটিশ কতৃপক্ষ ওথেলোকে দুটো অপশন দেয়, হয় বিচারের মুখোমুখি হও, নইলে ভারতীয় উপমহাদেশে পানিশমেন্ট পোস্টিং-এ যাও। ওথেলো প্রাণ বাঁচাতে চার্চের ফাদারের কাছে গিয়ে কনফেশান দেয়। ফাদার ওথেলোকে বাথটাবে গোলাপের পাঁপড়ি মেশানো পানিতে স্নান করিয়ে পরিশুদ্ধ করেন। এরপর ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে তাকে পৌঁছে দেয়া হয় সুতানুটি বন্দরে।

Maskwaith Ahsanকলিকাতায় পোস্টিং। অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি। ফলে কাজ-কর্ম তেমন কিছুই নেই। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সামনের বারান্দায় হেলান চেয়ারে বসে উলবোনা তরুণীটিকে দেখে; আর বই পুস্তক পড়ার অভিনয় করে। কলিকাতা ক্লাবে সৌভাগ্যক্রমে তাদের দেখাও হয়। ওথেলোর প্রেম ভাগ্য কবেই বা খারাপ ছিলো। অনুষ্ঠানে মেয়েটি শকুন্তলার চরিত্রে একটু নেচে দেখায়। সুতরাং তাহার নাম দিলাম শকুন্তলা। ওথেলোর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয় বন্ধুত্বের অধিক। মাঝে মাঝে লুচি-পায়েস-রসগোল্লা-পাঁচফোড়ন দেয়া সবজি নিয়ে সে হাজির হয় প্রতিবেশী ওথেলোর বাসায়। ওথেলো পিয়ানোতে বসে। শকুন্তলা সেই সুরের সঙ্গে নাচে। সময় এগুতে থাকে ঘাসফড়িং-এর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে। ওথেলো দেন দরবার করে শকুন্তলার বাবার জন্য “রায় বাহাদুর” টাইটেল জোগাড় করে দেয়।

হঠাতই ওথেলোর মনে সন্দেহ জাগে কলিকাতা ক্লাবে শকুন্তলা এক দাড়িওয়ালা কবির সঙ্গে গল্প-গুজব করে; কী কথা তাহার সনে! হয়তো একটা কিন্তু আছে। কবি লোকগুলো সুবিধার হয়না। পেলব সব কোবতে লিখে মেয়েদের মন গলিয়ে ফেলে!  বাড়ীতে ফিরে ওথেলো দাড়ি রাখার এবং কবিতা লেখার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কবিতা লিখতে গেলেই ডেসডিমোনাকে মনে পড়ে; মনে পড়ে কীভাবে ওথেলো তার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করতেই জীবন থেকে হারিয়ে গেলো স্নিগ্ধ শিশিরের মতো জীবন্ত মুখখানা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা; দিস্তার পর দিস্তা কবিতা লেখার চেষ্টা করে গোটা বাসাটা দুমড়ানো গোল গোল কাগজে ভরে ফেলে।

হঠাতই শকুন্তলা আসে। শংকিত হয়ে জিজ্ঞেস করে কী হয়েছে! ওথেলো শকুন্তলাকে জার্মান শেফার্ডের মতো শুঁকে বলে, তোমার গায়ে সিগেরেটের গন্ধ কেন?

শকুন্তলা অবাক হয়। সিগ্রেটের গন্ধ পেলে কোত্থেকে?

—তুমি কী ঐ কবির সঙ্গে গল্প করতে গিয়েছিলে, একি তার সিগ্রেটের গন্ধ।

–কোন সিগ্রেটের গন্ধ নেই। আমি কারো কবিতা শুনতে যাইনি।

–আর একটা কথা যদি বলো; তোমার গলা চেপে ধরবো।

–তুমি এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছো কেন!

–কে জানে হয়তো আমি তোমাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভালোবাসি।

–শকুন্তলার চোখে জল ছল ছল করে। ওথেলো বলে, তুমি সন্ধ্যায় এসো শকুন্তলা। তোমার জন্য একটা কবিতা পেশ করবো।

আনন্দে তিড়িং বিড়িং করতে করতে শকুন্তলা বাড়ী ফিরে যায়। কিন্তু ওথেলোর নাক থেকে সিগ্রেটের গন্ধটা যায় না কিছুতেই। বরং ফিরে ফিরে আসে সন্দেহের ঝাপটা দেয়া নিকোটিনের গন্ধটা। হঠাত পিয়ানো বেজে ওঠে। ওথেলো চমকে তাকিয়ে দেখে ডেসডিমোনা বসে।

–ওথেলো এক ভুল তুমি জীবনে ক’বার করবে! কেন অযথা সন্দেহ করছো শকুন্তলাকে! সে তো আমার মতো নির্দোষ।

—কিন্তু সিগ্রেটের গন্ধ যেটা পেলাম ওর গায়ে; সেটা তো ঐ কবির।

–আচ্ছা ধরে নিচ্ছি শকুন্তলার কবির সঙ্গে একটা প্রেম আছে। তুমি সরে যাও। কাউকে সন্দেহ হলেই খুন করতে হবে কেন!

—ডেসডিমোনা তোমার সঙ্গে যেটা ঘটেছে সেটার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু এই সিগ্রেটের গন্ধে কোন ভুল নেই।

–ওথেলো, মেয়েরা পুরুষের মত অবিশ্বস্ত নয়। তুমি বেশতো আমাকে খুন করে এসে এখানে শকুন্তলার গন্ধ খুঁজছো!

—তুমি এখন আসতে পারো ডেসডিমোনা। গিয়ে কোন নারীবাদী সংগঠনে যোগ দাও; আমাকে বিরক্ত করো না।

—আমি তোমাকে শকুন্তলাকে খুন করতে দেবো না কিছুতেই। তুমি বরং আজ সন্ধ্যায় সম্পর্কটা চুকিয়ে ফেলো। প্রেম না থাকুক; বন্ধুত্ব থাকুক। খুনাখুনির দরকার নাই।

—কিন্তু খুনের কবিতার পাণ্ডুলিপি যে প্রস্তুত।

–কী হয় ঐ কবিতা বলে বলে খুন করে দর্শকের হাততালি নিয়ে!

–ঠিক আছে। তবে তাই হোক ডেসডিমোনা।

শকুন্তলাকে খুব গোছানো নৈশভোজ শেষে ওথেলো জানায় তাদের আসন্ন ছাড়াছাড়ির কথা । শকুন্তলা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। ওর প্রেমে তো কোন খাদ ছিলো না। ওথেলোর নাকে কোত্থেকে ভেসে আসা সিগ্রেটের ধোয়ায় এভাবে সম্পর্ক ভেসে যাবে শকুন্তলা তা কল্পনাও করতে পারেনি।

—কথা দিচ্ছি ওথেলো আমি আর হতচ্ছাড়া কবি-চিত্রকর-গায়ক কারো সঙ্গে কথা বলবো না।

ওথেলো শকুন্তলার গলাটা স্নেহের আঙ্গুলে জড়িয়ে ধরে, –বন্ধুত্বটুকু থাকুক। মনে করো আমরা ক্রিকেটের ব্যাটিং পার্টনার। আমি রান আউট হয়ে গেছি এই জুটি থেকে।

চোখ মুছতে মুছতে শকুন্তলা বাড়ি ফিরে যায়। সারারাত বসে শকুন্তলার জন্য পিয়ানো বাজায় ওথেলো। কাঁধের কাছে ডেসডিমানোর উষ্ণ প্রশ্বাস টের পায়। পরদিন ওথেলো তার দপ্তরে অনুরোধ করে পোস্টিং চেঞ্জ করার জন্য। শকুন্তলা যে শহরে আছে; সেখানে থাকা ঠিক হবে না। অফিসের অনেকে সন্দেহ করে, কাউকে খুন টুন করেননি তো ওথেলো!

—নাহ নাহ; এবার স্বেচ্ছায় কর্মস্থল ত্যাগ।

ঢাকায় পোস্টিং হয় ওথেলোর। সুন্দর সবুজ শহর। হাসিখুশী মানুষের শহর। অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি হওয়ায় তার তেমন কাজ-কর্ম নেই। তবে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মেলামেশায় বিশেষ দক্ষতার কারণে স্থানীয় পত্রিকায় ওথেলোকে নিয়ে “সুপার সিভিল সার্ভেন্ট” শিরোনামে খবর প্রকাশিত হয়। ওথেলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির দাওয়াত পেতে থাকে। সেখানে মানপত্র পাঠ হয়, হে মহামানব, আপনার আলোক পদভারে প্রকম্পিত এ জনপদ; মানুষের জন্য আপনার ভালোবাসা আকাশের মত উদার, সমুদ্রের মত বিশাল, পাহাড়ের ন্যায় উচ্চ।

এক অনুষ্ঠানের শেষাংশে সংগীত পর্বে চোখে কাজল দেয়া এক গভীর অক্ষীর তরুণীকে দেখে ওথেলোর প্রেম উথলিয়া ওঠে। কিন্তু এই জনপদের সংকট হচ্ছে নারী-পুরুষ মেলামেশার জন্য বিবাহ আবশ্যক। একটু গল্প-গুজব বা প্রেমের সুযোগ নাই বললেই চলে। তবু গাড়ী পাঠিয়ে দুরদানান্নিসাকে একদিন দুরু দুরু বুকে নিজের বাংলোয় নিয়ে আসে। ওথেলো অনুরোধ করে, একটা গান শোনাবে দুরদানা।  দুরদানা বলতেই ওথেলোর মনের মধ্যে ডেসডিমোনা নামটি এসে হানা দেয়।

দুরদানা বলে, গান গাইতে পারি এক শর্তে; আপনি অন্যদিকে তাকিয়ে থাকবেন।

ওথেলোর অবাক লাগে। তবু ঠিক আছে।

দুরদানা গাইতে থাকে,

“জোছনা করেছে আড়ি, আসেনা আমার বাড়ি।

গলি দিয়ে চলে যায় লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি।

গান শুনে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায় ওথেলো। জিজ্ঞেস করে, তা তোমার বাড়ি যেতে আমাকে কী কী করতে হবে?

—আপনাকে ওথেলোউদ্দিন হতে হবে। দাড়ি তো আছেই; মানিয়ে যাবে। এরপর বিয়ের পয়গাম পাঠাতে হবে।

শর্ত শুনে ওথেলোর প্রেমের শখ মিটে গেলেও সে ভাবে, এই সুরেলা কন্ঠের নারীর জন্য এতোটুকু করাই যায়। দুরদানার আব্বাকে “খান বাহাদুর” টাইটেল জোগাড় করে দিয়ে ওথেলোউদ্দিন দুরদানার সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়। গানে-কবিতায়-রিনি রিনি হাসিতে কেটে যায় কতগুলো মাস। কিন্তু এক অফিশিয়াল পার্টিতে সংগীত পরিবেশনের পর মুগ্ধ ভক্তদের সঙ্গে দুরদানাকে গল্প করতে দেখে ওথেলোউদ্দিনের মাথাটা চক্কর দিতে থাকে। সে হাওয়ার মাঝে দুরদানার গলাটা খুঁজতে থাকে; যেভাবে সে ডেসডিমোনাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিলো।

পার্টি থেকে বাংলোয় ফিরে ব্যালকনিতে গম্ভীরভাবে সিগার টানতে থাকে ওথেলোউদ্দীন। দুরদানাকে এড়িয়ে চলে। দুরদানা জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে; তুমি কী কোন কারণে রাগ করেছো!

—তুমি তো ইয়াং বৃটিশ অফিসারদের হার্ট থ্রব হয়ে উঠেছো!

—মানে!

—মানে বোঝো না! আমাকে বলেছিলে তুমি গান গাইতে পারো যদি তোমার দিকে না তাকাই; ওখানে গানের পর ভক্তদের সঙ্গে তো গলে পড়ছিলে!

–কী বলো এসব!

–হোরাশিওটাকে দেখলাম তোমার পিছে পিছে ঘুর ঘুর করছে! প্রেম-ট্রেম হলো নাকি!

—তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে; যাও মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢেলে এসো।

দুরদানা তখন গভীর ঘুমে। ডেসডিমোনা আসে। ব্যালকনিতে ওথেলোউদ্দিনের মুখোমুখি বসে।

–তুমি আবার ভুল করছো ওথেলো। দুরদানা নির্দোষ; এসবই তোমার মনের কল্পনা।

–তুমি কি আমার পিছু ছাড়বে না ডেসডিমোনা!            

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.