মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসে যে মেয়ে

জেসমিন চৌধুরী: আমার নতুন স্যামসাং এসথ্রি’টা যখন সেবার টয়লেটের পানিতে পড়ে গেল, তখন অনেকেই হাসলেন। আমার বস বললো, ‘হোয়াট আ’ম মোর ইন্টারেস্টেড ইন নোয়িং ইজ হোয়াট ইউ ওয়ার ডুইং উইথ ইয়র মোবাইল ইন দ্য টয়লেট। এনিথিং ইন্টারেস্টিং জেস? আই মাইট ট্রাই ইট মাইসেলফ।’

আজ হঠাৎ মনে হলো লিখি না হয়, আসলেই যদি কেউ ট্রাই করতে চায়!

Jesmine Chow 2
জেসমিন চৌধুরী

ঘন্টায় সতেরো টাকা রেটে যখন কথা বেচি, তখন ক্লায়েন্টের সাথে বাড়তি কথা বলার অনুমতি বা ইচ্ছা কোনটাই থাকে না। কিন্তু সেই ক্লায়েন্ট যদি হয় মৃত্যু পথযাত্রী, তার বয়স যদি হয় কম, তার মুখে যদি ঝুলে থাকে মিষ্টি এক টুকরা হাসি, তাহলে কথা না বলে থাকাটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

আমাকে দেখে রিসেপশনিস্ট একগাল হেসে বলে, ‘আ’ম গ্ল্যাড ইট’স ইউ এগেন, শি ইজ ইন রুম থারটিন’। তারপর গলা নামিয়ে, ‘দ্য কনসালটেন্ট ইজ লেট। ইউ নো হোয়াট দে আর লাইক!’

সে নিজে লেট করলে পরিণাম কী কী হতে পারে বিড়বিড় করতে করতে রিসেপশনিস্ট আমাকে অশুভ তেরো নম্বর কামরার দরজা দেখিয়ে দিল।

এই মেয়েটার জন্য আমি আগেও কাজ করেছি, যদিও খুব অল্প সময়ের জন্য। প্রথমবার তার শারীরিক অবস্থা বুঝিয়ে বলতে হয়েছিল, সেবার মাত্র কয়েক মিনিটেই কাজ শেষ হয়েছিল। আরেকবার কী একটা ইনফেকশনের জন্য তাকে বিছানাসুদ্ধ একটা ঘেরাটোপের ভেতরে রাখা হয়েছিল। আমাকে একটা প্লাস্টিকের ওভারল পরে বাইরে দাঁড়িয়ে ভাষান্তরের কাজ করতে হয়েছিল।

তার আলো বিচ্ছুরিত হতে থাকা চুলবিহীন মাথা থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। তবুও যথোপযুক্ত পেশাদারি নির্লিপ্ততা আর গাম্ভির্য্য নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম যে কমপক্ষে আরো চারদিন সে বাড়ি ফিরতে পারবে না। ইনফেকশন পুরাপুরি কমে না গেলে বাচ্চারাও তাকে দেখতে না আসাটাই ভাল। প্লাস্টিকের ওভারল পরে দূরে দাঁড়িয়ে মা’কে দেখার মতো নির্লিপ্ত তারা নয় নিশ্চয়ই।

এই কয়টা কথা বলতে আমার পাঁচ মিনিটেরও কম সময় লেগেছিল, আমি ওই অপ্রীতিকর অবস্থা থেকে দ্রুতই বেঁচে গিয়েছিলাম। পাঁচ মিনিটে কাজ শেষ, পয়সা পাবো এক ঘন্টার। আমি খুশি। নিজের নীরোগ দেহ নিয়ে এক হাসিখুশী চেহারার মৃত্যু পথযাত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে কে অপরাধবোধে ভুগতে চায়?  

কিন্তু এবার আমার ভাগ্য ততোটা ভাল বলে মনে হচ্ছে না। আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকাই আর কনসালটেন্টকে গালি দেই মনে মনে। কেন এত দেরি করছে বেটা? আর রিসেপশনিস্টটারও তেমন কাণ্ডজ্ঞান নেই মনে হচ্ছে, আমাকে বসানোর আর জায়গা পেল না সে?  

প্রথমে আমি মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার ভান করি। কিন্তু মেয়েটির চড়ুই পাখির মতো চঞ্চল চোখ দুটো যে আমার উপরেই ঘুরাঘুরি করছে তা আমি না তাকিয়েও টের পাই। উঁচু খাট থেকে ঝুলে থাকা তার পা দুটো অনবরত দুলছে, দরজার আর আমার মাঝখানের শূন্য জায়গাটায় আলোর দ্রুত তারতম্য দেখে বুঝতে পারি। কেন সে এমন করে পা নাচায়? কিসের এতো সুখ তার মনে? মেয়েটাকে কষে একটা থাপ্পড় দিতে ইচ্ছা করে।

‘ও আফা, আফনে থাকইন কই?’

‘ম্যানচেস্টারে থাকি।’

আমি না তাকিয়েই উত্তর দেই, অনিচ্ছা সত্ত্বেও।

মৃত্যুপথযাত্রীর সাথের ম্যানারিজম আমাকে ছোটবেলায় শেখানো হয়নি, লেভেল থ্রি ইন্টারপ্রিটিং ট্রেনিং এর সময়ও না। বিশেষ করে যদি তারা মৃত্যুর প্রতি এতোটা উদ্ধত, এতোটা উদাসীন হয়। আমি ভেঙ্গে পড়া মানুষকে সাহস দিতে শিখেছি, প্রচণ্ড সাহসী মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছি, কিন্তু এই উদ্ধত মেয়েটার সাথে কী করতে হবে আমি আসলেই জানি না।

‘ম্যানচেস্টারো তো আমরা হকলেউ থাকি, আফনে কুন টাউনো থাকইন?’

অদ্ভুত কাণ্ড তো, আমি কোথায় থাকি জেনে তার কী লাভ? কেন এই বৃথা শ্রম?

‘কইবার নিয়ম নাই,’ আমি প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে বলি।

‘ও আফা, রাগ করইন্না যে, একলা একলা বালা লাগে না হসপিটালোর মাজে, মাতবার মানুষ নাই, ইংরাজিও মাত্তাম ফারি না।’

এইবার আমি চোখ তুলে তার দিকে তাকাই। আগের বার ঘেরাটোপের ভেতরে তাকে ভালমতো দেখতে পাইনি, শুধু তার চকচকে মাথাটাই দেখেছিলাম। এতো কচি বয়সের মেয়ের আবার দুটো বাচ্চা থাকে কী করে? মেয়েটা কি দেখতে অনেকটা আমার মেয়ে ইলার মতো, নাকি আমার আবেগপ্রবণ মন এই সুযোগে একটু দুঃখবিলাস করে নিতে চাইছে?

আমার ভিজে যেতে থাকা মনকে আমি স্মরণ করিয়ে দেই, আমি এখানে শুধু কথা বেচতে এসেছি, মায়া দেখাতে নয়।

‘আফনার কফালটা বড় বালা গো আফা, বাংলাও ফারইন, ইংরাজিও ফারইন। আমি বেঙ্গর কুন্তাউ ফারি না।’  

মেয়েটার কথাবার্তায় এবার আমার সন্দেহ হতে শুরু করে, সে কী আসলে বুঝতে পারছে না যে সে মরতে যাচ্ছে খুব শিগগিরই? জানবে না কেন, আমি নিজেই একবার তার অবস্থা তাকে বুঝিয়ে বলেছি। সে জানে সব চিকিৎসা সত্ত্বেও তার অবস্থা গত কয়েক মাস ধরে খারাপের দিকেই যাচ্ছে, অথচ ইংরজি না পারাটাই তার বড় দুঃখ হলো?

‘আইচ্চা আফা, ইংরাজি হিকতে কতদিন লাগব কইনচাই?’

‘ইকটা তো কওয়া কটিন, তুমি কতটুক মাত্তায় চাও?’

‘ওউ দরইন জিপির টাই গেলাম। শফিং গেলাম। । আমার দুইও ফুড়িয়ে মাশাল্লা বিদেশিন্তর লাখান ইংরেজি মাতে। তারার লগে মাতলাম থুড়া থুড়া ‘

‘তাইলে বেশিদিন লাগত নায়। তিন তাকি ছয় মাসর মাজে হিকিলাইবায়।’

‘অত কমদিন আফা? হাসা কইরানি আফনে?’

তার চোখে খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠতে গিয়েই আবার বিজলির মতো মিলিয়ে যায়,

‘কিন্তু অখন কুনো আর ফারমুনি? শরিল তো বালা নায়, কেলাসো যাইমু কিলা আফা?’

সে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে একটা উত্তরের জন্য। সে কি জানে না রিটরিক প্রশ্নের উত্তর হয় না?  অসভ্য মেয়েটার উপরে আমার বিরক্তি সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকে।  

‘আল্লায় অসুখ কমাইলে ইংরাজি হিকমু। কলেইজো যাইমু। পড়াশুনা না জানলে আবার মানুষনি আফা? মানুষ অইলা আফনারা, নিজর কাম করইন, ফরর কামও করইন।’  

আমি আর পারি না, আমার সমস্ত ভেতরটা যেন এবার উলটে বেরিয়ে আসতে চায়, আমি আমার পেশাদারী গাম্ভির্য্য হারিয়ে ফেলি, আমার চোখ জ্বালা করতে থাকে। অশুভ তেরো নম্বরের এই ছোট কামরার সবদিকে মেয়েটার আশাবাদী দৃষ্টি যেন লেপে আছে, আমি আমার অশ্রুভাসা চোখ কোথায় ফেরাবো?

‘ও আফা আফনে কান্দইন কেনে? অসুক কমতো ও তো ফারে? ডাখতর হখলে কুনো হখলতা জানিয়া বইসেনি।’  

ঠিক তখনই নার্স আর কনসালটেন্ট এসে রুমে ঢুকে। জীবনে প্রথমবার কাজ শুরু করার আগেই কমফোর্ট ব্রেক চাইতে হয় আমাকে।

বাথরুমের দিকে ছুটে যেতে যেতে ভাবি, আমার সবগুলো চাকরিতেই বিভিন্ন সময় এভাবে অসহায় বোধ করেছি আমি। অসহায়ের মত কেঁদেছি। পৃথিবীর কোনো কাজই কি আমার জন্য নয়, কোন কাজই কি আমি পেশাদারিত্ব নিয়ে, শুকনা চোখে করতে পারবো না?  

বাথরুমের ভেতর ঢুকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে পড়তে আমি ‘টুপ’ করে একটা শব্দ শুনি, তারপরই ব্যস্ত হয়ে পড়ি ব্যাগ থেকে কমোডে পড়ে যাওয়া আমার নতুন মোবাইল ফোন নিয়ে। চড়ুই পাখি চোখের মৃত্যু পথযাত্রী মেয়েটার জন্য নির্গত অশ্রুবিন্দুগুলো খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়।  

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.