ডিভোর্স এখন লজ্জা না, বরং আত্মসম্মানের

বিথী হক: দস্তখত মানেই নিশ্চিত প্রাপ্তি নয়। আজকে একটা ভরসা তৈরি হয়েছে, যে ক’দিন গুরুত্ব দেয়া যায় সে ক’দিন গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে এটাই বিয়ে। অবশ্য বেশিরভাগ মানুষ জোর করে এক ছাদের নিচে ঘুমিয়ে চারপাশের মানুষগুলোকে কিছুটা নিশ্চিন্ত রাখতে চায়। মিডল এজ ক্রাইসিস এলে তারপর কত কি বহির্ভূত সম্পর্ক বের হয়ে আসে, তার সবটাই সবার জানা।

4আমার এই লেখা কোনভাবেই তালাকের বৈধকরণ করছে না। বিচ্ছেদ মানেই নি:সন্দেহে বেদনা। তাই অপ্রয়োজনীয় তালাক কখনোই কাম্য নয়। কিন্তু আগে নারীরা দাঁতে দাঁত চেপে স্বামীর মার খেয়ে, শাশুড়ীর হাতে কিল ঘুষি খেয়ে বছরের পর বছর নিজের অস্তিত্ব ভুলে থাকত। এভাবে থেকেও দু’বেলা খাবার জুটে যাচ্ছে, স্বামীর ঘর ছাড়লে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? বাবা-মা’র সংসারে ভাই-বোনদেরও সংসার হয়েছে, কারো কাছে গলগ্রহ হয়ে থাকার চেয়ে তাই দু’বেলা মারের সাথে দু’মুঠো খাবারই সই! স্বামীর মারের চেয়ে বাপের বাড়ির অন্ন অপমানজনক। কী লজ্জা, কী লজ্জা!

বিগত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে তালাক দেয়ার চিত্রটা পাল্টে গেছে। এখন ৩০ শতাংশ পুরুষের বিপরীতে ৭০ শতাংশ নারীরা তালাক দিচ্ছে। আপাত:দৃষ্টিতে বিষয়টা অনেকের কাছে দু:খজনক হলেও আমার কাছে সুখকর। চিন্তা করা যায়, এতো এতো নারীরা আগে কষ্ট-যন্ত্রণা সহ্য করে স্বামীর পায়ের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতো। সেসব মেয়েরা এখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, আত্মসম্মান টার্মটার সদ্ব্যবহার করছে।

কিন্তু তাও একটা “কিন্তু” থেকে যায়। সেখানে নারীদের সরল কিছু আবেগ পুরুষদের চতুর পরিকল্পনার কাছে হেরে যেতে থাকে। তারা প্রেমিক হয়ে, বন্ধু হয়ে, স্বামী হয়ে বোঝাতে থাকেন- বিয়ের পর বাইরে কাজ করার মত পারিবারিক অভাব তাদের নাই। বিয়ের পরে তাই তাকে রাজরানী হয়ে ঘর আলো করে রাখতে হবে, হুকুম করা মাত্র তার সকল ইচ্ছে পূর্ণ হবে। এই গেল পাওনা কর্তৃত্ব বুঝে নেয়ার ঘটনা। প্রত্যেকের শুরুটা ঠিক এই একভাবেই।

Bithy 2স্কুল, কলেজে থাকার সময় মেধাবী, ভাল গান করা, বিতর্ক করা, অভিনয় করা মেয়েটা রাজরানী হয়ে থাকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে নিজেকে ভোঁতা, মরচে পড়া, লোহার মত ভারী এবং অকর্মন্য করে তুলতে থাকে। বিয়ের সময় পড়াশোনাকে বিদায় জানানোর পর ততদিনে তার ভেতর থেকে লেখাপড়ার বাকি ইচ্ছে আর স্বপ্নের কানাকড়িও অবশিষ্ট থাকে না। রাজরানী করে রাখতে রাখতে পতি-পরমেশ্বর একদিন বিরক্ত হয়। “তুমি তো রান্নাবান্না ছাড়া কিছুই পারো না” বলে খোঁটা দেয়া শুরু করে। প্রতিনিয়ত অপমানিত হতে থাকা রাজরানী নত হয়, হতেই থাকে। তাকে তো বাঁচতে হবে কারো না কারো ভরসায়, এসব ছোটখাটো অপমানে কি আসে যায়?

আক্ষেপ করতে থাকে, ‘ইশ আজ যদি কয়টা সার্টিফিকেট থাকতো, তাহলে এত অপমান সহ্য করে এই নরকে পড়ে থাকতাম না’। গাছের তলায় রাত কাটিয়ে দু’বেলা যা খুশি খেয়ে কাটিয়ে দিতাম। যদিও এই আক্ষেপ তাকে কখনো পথ দেখায় না।  

কিন্তু এই আক্ষেপ এখন অনেকাংশে কমে এসেছে। ৭০ শতাংশ নারী তালাক দিচ্ছে, তার মানেটা নিশ্চয়ই দুর্বোধ্য নয়। নারীরা তার মানে এখন আর সর্বংসহা হয়ে বাকী জীবন কাটানোর পক্ষপাতী নয়, নারীরা তার মানে পাছে লোকে কিছু বলে প্রবাদে অঞ্জলি দিচ্ছে না, নারীরা তার মানে নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছের গুরুত্ব দিচ্ছে!

নারীদের তালাক দেয়ার শতকরা হিসাব দেখে যেসব সভ্য সুশীলরা আঁৎকে উঠছেন, কলিকাল এলো বলে দুনিয়ার মুন্ডুপাত করছেন তাদের জন্য অনেক বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে। আপনাদের যুক্তি, পুরুষরা তালাক দিতে না চাইলেও কেন স্ত্রীলোক তালাককেই সর্বশেষ পন্থা বানাচ্ছেন!

–আহা এতোকাল ধরে যে আপনারা দাপটের সাথে পুরুষতন্ত্রের শক্তি প্রয়োগ করে চার-পাঁচটা পত্নী, দেড়শ-দু’শ উপপত্নী রেখে আপনাদের কত সামর্থ্য সেটা প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছেন তখন থেকেই কিন্তু নারীরা সহ্য করে এসেছেন।

ব্যতিক্রম না গুনলে ক’জন স্বামী স্ত্রী দ্বারা নির্যাতিত হবার নজির আছে? ক’জন পুরুষ স্ত্রীর দ্বারা যথেচ্ছ ব্যবহৃত হয়ে মানসিক দাসত্ব স্বীকার করার দৃষ্টান্ত আছে? যুগের পর যুগ ধরে চেষ্টা করতে করতে অবশেষে নারীরা ‘আত্মসম্মান’ শব্দটার সাথে পরিচিত হচ্ছে। আগে কেন নারীদের এতো তালাকের শরণাপন্ন হতে হয়নি, এখন কেন হচ্ছে তার উত্তর দিতে এই একটা বাক্যই যথেষ্ট।

বন্দীপাখি একবার মুক্তির স্বাদ পেয়ে গেলে তাকে পুনরায় খাঁচাবন্দী করা প্রায় দু:সাধ্যই বটে। নারীরা বুঝতে শিখছে রাজরানীর লেবাসে পুরুষতন্ত্র তাদের সোনার খাঁচায় বন্দী করার পাঁয়তারা করেন, তাদের মাটির পৃথিবী এর চেয়ে ঢের সুন্দর। শিকল তো শিকলই, সেটা স্বর্ণের কী চাঁদির তা দিয়ে কী আর হবে!

বিয়ে হয়ে গেছে মানেই জীবন শেষ হয়ে গেছে, এরকম করে এখন খুব কম নারীরাই ভাবেন। ভুল তো ভুলই। সেটা একশ বার করলে, একশ বারই শুধরানো যায়; এখানে এখন আর অমোঘ বলে কিছু নেই! আমার কাছে তালাক পাওয়া বা তালাক দেওয়া নারী মানেই এখন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, আত্মপ্রত্যয়ী, দৃঢ়চেতা, স্বাবলম্বী এবং আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন একজন রুচিশীল নারী; যার কাছে প্রত্যেকটা নারীর অনেক কিছু শেখার থাকে এবং ভবিষ্যতেও এই প্রয়োজন কখনো ফুরাবার নয়।

শেয়ার করুন:

আমার কাছে তালাক পাওয়া বা তালাক দেওয়া নারী মানেই এখন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, আত্মপ্রত্যয়ী, দৃঢ়চেতা, স্বাবলম্বী এবং আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন একজন রুচিশীল নারী
—-এটাতেই আপত্তি। তালাক দেওয়া নারী মানেই ???? এটা হতে পারে না।

লেখক যেভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে আমি তাঁর বিপরিত ভাবে কিছু বলতে চাই। ইসলাম তালাকের অধিকার দুই জনকেই দিয়েছে। আর বর্তমানে মেয়েদের তালাক দেওয়ার হার যেটা বেড়ে তা আত্মসম্মানের নয় বরং পরকীয়ার ও ভারতীয় চ্যানেলের। ভারতীয় চ্যানেল গুলো বহু পুরুষ ও বহুগামী নারী আসক্তি কারণেই হচ্ছে। কোন নারী যদি স্বামী ও তাঁর বাড়ীর দ্বারা অযাচারের স্বীকা র হয় প্রয়োজনে সে তাঁর স্বামীকে তালাক দিতে পারবে। কিন্তু পরপুরুষের আসক্তি হয়ে তালাক কি ভাবে আত্মসম্মানের হতে পারে? সংসার মতো হৃদয়হীনা সিদ্ধান্ত কোন আনন্দের বিষয় হতে পারে না। এই সংসারে তো শুধু স্বামী স্ত্রী থাকে না এখানে সন্তানও থাকে। মা বাবার ছাড়া ছাড়ি হলে সন্তনানের মনে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া কি ধরণের হয় তা মনে হয় লেখকের জানা নেই অথবা তিনি এর শিকার হয়েছেন। যার কারণে অন্যদের বেলায় তা চাচ্ছেন। এখানে লেখক নারীদের এবং পুরুষদের তালাক দেওয়ার যে সম্মানের হিসাবে দেখতেছেন তা সমাজের জন্য সুখ নয়। এটা সমাজ ব্যবস্থার ভেঙ্গে পড়ার সংকেত।

Womenchapter যে লেখা ছেপেছে,তার সব দোষ লেখকের,প্রকাশকের না!!!!!ভালই বেশ ভাল।এমন সুড়সুড়ি পেলে অনেকেই ঘর ভাঙার পরিকল্পনা করবে,এইটাই প্রকাশকের ইচ্ছে মনে হয়,চক্রান্ত চলছে,গভীর চক্রান্ত

যে ছবিটা দেয়া হয়েছে, সেটা কি বাংলাদেশের?
বাংলাদেশের মানুষ কি ভাষায় কথা বলে?
যদি এটা বাংলাদেশের ছবি হয় এবং বাংলাদেশের মানুষ যদি বাংলা ভাষায় কথা বলে তবে এ ডিভোর্সের সঙ্গে ‘আত্মমর্যাদার’ বা আত্মউত্থানের সম্পর্কটি খুবই ক্ষীন। ব্যপারটি উদ্বেগ জনক!

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.