আপনার-আমার ছেলেও যদি ‘ফাহিম’ হয়ে যায়!

শাশ্বতী বিপ্লব: পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী নাকি বাবার কাঁধে পুত্রের লাশ। সেইরকমই শিখেছি ছোটবেলায়। যে ভার বহন করে চলেছেন অভিজিৎ, দীপনদের বাবারা। বাবা দিবসের ঠিক একদিন আগে আরেকজন বাবার কাঁধ তৈরি হলো সেই ভার বহনের জন্য, ফাহিমের বাবার।

fahimলাশেরও চরিত্র থাকে। থাকে পরিচয়। তাই ফাহিমের লাশ অন্যদের চাইতে আলাদা। ফাহিম জঙ্গি, হত্যাকারী। চাপাতি হাতে সে হত্যা করতে গিয়েছিল মাদারীপুরের এক হিন্দু শিক্ষককে। ফাহিম পুলিশের ক্রসফায়ারে মারা গেছে। ফাহিমের লাশের জন্য বেদনা নেই, ভালোবাসা নেই। আছে কেবল একরাশ ঘৃণা।

এই যদি হয় ফাহিমের লাশের পরিচয়, তবে ফাহিমের মৃত্যুতে মন খারাপ কেন আমার, আমাদের!! আমরা তো ফাহিমের মতো জঙ্গি হত্যাকারীদের বিনাশই চাই। একজন হত্যাকারী হত্যার শিকার হলে তাতে আমাদের মন খারাপ হওয়ার কথা তো নয়। তবু মন খারাপ হয়েছে।

কেন মন খারাপ হয়েছে? ফাহিমেরও মানবাধিকার ছিল বলে? ফাহিমেরও অধিকার ছিল অপরাধী হিসেবে বিচার পাওয়ার, সেই কারণে? না, সেসব কারণে নয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো “মানবাধিকার”কে হাসি তামাশার বস্তু বানিয়ে ছেড়েছে। ওসব গালভরা বুলিতে ফাহিমদের বা ফাহিমদের হাতে মৃত মানুষগুলোর স্বজনদের কিচ্ছুটি যায় আসে না।

মন খারাপ হয়েছে ফাহিমের কিশোর অবয়বের কারণে। ফাহিমের বিহ্বল দৃষ্টির কারণে। ফাহিমের মাঝে বিভ্রান্ত, অসহায় কিশোর-তরুণ সমাজকে দেখতে পাওয়ার কারণে। ফাহিমের পরিবারের মধ্যবিত্ত চরিত্রের কারণে। ফাহিমের বয়সের সাথে নিজেদের সন্তানদের মেলাতে পারার কারণে। তাই হত্যার বদলে হত্যা আমাদের শঙ্কিত করে তোলে।

ফাহিম মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ফাহিম পুরোপুরি তরুণ হয়ে ওঠেনি এখনো। ফাহিম এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করেছিল। ফাহিমের দিকে তাকিয়ে ছিল তার পরিবার। ফাহিমদের দিকে তাকিয়ে থাকে গোটা দেশ।

জনসংখ্যা অবয়বের পেটমোটা যে অংশটার উপর ভর করে বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে অর্থনৈতিক উন্নতির, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার – ফাহিম সেই অংশটার প্রতিনিধিত্ব করে। ফাহিমের পরিণতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাধু সাবধান! মধ্যম আয়ের স্বপ্নটায় ফাটল আছে অনেক। সেই ফাটল বন্ধ না হলে বালির বাঁধের মতো যেকোনো সময় ভেঙ্গে যেতে পারে স্বপ্নটা।

ফাহিমদের জন্য ধর্মের নামে ফাঁদ পেতে রাখে জঙ্গিগোষ্ঠী। হিংস্র দানব হিসেবে গড়ে তুলতে থাকে তাদের। লোভ দেখায় অর্থের, ক্ষমতার আর পরকালের। ফাহিমরা তাদের কিশোরসুলভ সরলতায়, ধর্মভীরুতায় ধরা দেয় তাতে। যতদিনে ভুল বুঝতে পারে, ততদিনে বের হয়ে আসার সকল পথ বন্ধ হয়েছে।

অন্যদিকে ফাহিমদের মেরে ফেলে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সযতনে লাশ পৌঁছে দেয় পরিবারের কাছে। হতবিহ্বল পরিবারের বলার থাকে না কিছুই। তাদেরও যে অজানা ছিল এই সর্বনাশের খবর। সিঁদ কেটে কখন চুরি হয়ে গেছে তাদের বুকের ধন, সে খবর রাখেনি তারা!!

তাই বাবা-মাদের বলছি, ছেলের খবর রাখুন। ছেলে বলেই তাকে ছেড়ে দেবেন না তার খেয়াল খুশির উপর। ছেলে কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেশে, কী পড়ে, খেয়াল করুন। ছোটবেলা থেকে মনে গেঁথে দিন জঙ্গিদের পরিচয়। ধর্ম আর সন্ত্রাসের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখান। ন্যায়-অন্যায় বোধের ভিত গড়ে দিন।

আমাদের ঘরে-বাইরে শত্রু। আমাদের হাত বাঁধা। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকানো। একমাত্র ঘরের ভিতর থেকে তৈরি হওয়া সচেতনতাই হয়তো বাঁচাতে পারবে ফাহিমদের। সবাই মিলে তো আর দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারবো না। কেনই বা যাবো? দেশটা তো আমার, আমাদের।

আমাদের এদেশেই বাঁচতে হবে। বাঁচাতে হবে আমাদের সন্তানদের। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করুক বা না করুক। আসুন, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করি যতটুকু সম্ভব।  আসুন আমাদের সন্তানদের মগজ অন্য কেউ ধোলাই করার আগে আমরা তাদের মগজের দখল নেই। বাবা-মা হিসেবে এটুকু না করতে পারলে আমার আপনার সন্তানও কোনো এক সুন্দর সকালে জঙ্গি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তার জন্য আপনি তৈরি তো?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.