একজন ফাহিম স্নেহময়ী মাকেও সন্দেহপ্রবণ করে

রোকসানা ইয়াসমিন রেশনা: ফাহিমের প্রতি সমবেদনা, যারা তার এই পরিণতির জন্য দায়ী তাদের জন্য তীব্র ঘৃণা। সমাজের তথাকথিত দৃষ্টিতে ফাহিম খুব ভালো ছেলে ছিল। লেখাপড়ায় ভাল ছিল, নামাজ পড়তো, কারোর দিকে চোখ তুলে চাইতো না। যার জন্য ফাহিম ধরা পড়ার পর তার ছবি দেখে প্রতিবেশীরা ধারণাই করতে পারেনি, এ তাদের ফাহিম। এগুলো সব আমরা জেনেছি এরই মাঝে।

সেই পুরোনো দিন থেকেই একটু বদনামী, ডানপিটে ছেলেদের কিন্তু সবাই বেশ পছন্দ করে। তাদের সামনে যতো নিন্দাই করুক না কেন,  ওপাশ দিয়ে ঠিকই বলে, ছেলেটা একটু বেয়াদব হলে কী হবে, কাজের আছে। কারোর কোন বিপদ হলে ওর কাছে গেলে উপকার পাওয়া যায়। আর ভদ্র ছেলেদের সামনে প্রশংসা করলেও আড়ালে বলে, ভদ্রবেশী মিচকে শয়তান।

কিন্তু সেইদিন থেকে সরে এসে এখনকার প্রজন্মে সত্যিকার বেয়াদবদের সংখ্যা বেড়ে গেছে বলেই হয়তো, আজ ফাহিমদের মতো ছেলেদের উপর আমরা সত্যিকারের ভরসা করতে শুরু করেছি। যার জন্যই ফাহিমের এই অধ:পতনে তার প্রতিবেশীরা ধাক্কা খায়। আমরা যাদের উপর ভরসা করবো তাদের এখন থেকে সন্দেহের চোখে দেখতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। এই বয়সে হৈ-হুল্লোড় না করে কোনো ছেলে ঘরে বসে থাকলে, নামাজ পড়লে, ঠিকমতো লেখাপড়া করলে সন্দেহ করতে হবে সে কোনো জঙ্গী সংগঠনের সাথে জড়িয়ে যায়নি তো? ফাহিমরা এ কোন সমাজ ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের?

আমার পাশের ফ্ল্যাটে মা মরা ১৩/১৪ বছরের দুইটা ছেলে থাকে তার বাবার সাথে। খুবই ভদ্র, শান্ত শিষ্ট। বাইরে কোথাও যায় না। মাঝে মাঝে দুই ভাই বারান্দায় বসে গিটার বাজায়। আমি আমার বারান্দায় কাপড় নাড়তে গেলে চোখে চোখ পড়লেই ফুরুত করে দৌড়ে ঘরে চলে যায়। আমার ছোটা হোম এ্যাসিস্ট্যান্ট ওদেরও বাসায় কাজ করে। কী রান্না করলো খোঁজ নিয়ে ভালো না লাগলে, আস্তে করে একটা কিছু পাঠিয়ে দিই ওদের জন্য। ফল কাটতে বসলেও ওদের কথা মনে পড়ে। মনে হয়, আহারে! আমিও তো যেকোনো সময় মরে যেতে পারি। আমার বাচ্চা দুইটাও তো ঐ রকম অসহায়ভাবে থাকবে।

ফাহিমের ঘটনার পর থেকে আমি ওদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাই। টিচারের কাছে পড়তে বসলে  আমার জানালার কাছে গিয়ে কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকি কী পড়াচ্ছে জানার জন্য। বলা তো যায় না! যে লোকটা পড়াচ্ছে, সে আবার পরকালের লোভ দেখাচ্ছে না তো?

কাল বারান্দা থেকে আমাকে দেখে যখন ভিতরে চলে গেলো, তখন মনে হলো, আমি যে রোজা করি না ওরা তা জেনে যায়নি তো? আল্লাহর আদেশ অমান্য করছি দেখে সুযোগ বুঝে আমাকেও কুপিয়ে যাবে না তো? আরো কতো সন্দেহ।

আহা! ফাহিমরা। তোমাদের যারা সৃষ্টি করছে তারা যে তোমাদের মাথার উপর থেকে মায়ের স্নেহের আঁচলটা পর্যন্ত সরিয়ে নিচ্ছে আস্তে আস্তে, তোমরা কী তা বুঝতে পারছো? একটু চেষ্টা করো না বুঝতে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.