নারী, তোমার জন্যে

সাদিয়া নাসরিন: “মেয়েরা তখনই নিজের নিজের স্বাতন্ত্র্য আর যোগ্যতায় বাঁচতে চায় যখন স্বামীর সাথে বোঝাপড়া কম থাকে”……“বিবাহিত জীবনে অসুখি মেয়েরাই বেশি বেশি অধিকার নিয়ে সচেতন হয়’’……“আমি কেন চাকরি করবো, আমার স্বামী এতো ভালো রোজগার করে, একটা চাইলে পাঁচটা দেয়”…… “চাকরি করার চেয়ে বাচ্চাদের মানুষ করা মেয়েদের জন্য অনেক জরুরি”…….“মেয়ে হয়ে জন্মেছ, মেয়ের মতো বাঁচো, কথায় কথায় ঘাড় উঁচু করো না, মেয়ে মানুষের এতো সাহস দেখানো ভালো না”………না, কোন ছেলে বন্ধু বা আত্মীয়দের মুখে  শুনিনি  কথাগুলো। এ কথাগুলো মেয়েদের, এরা আমার মা, খালা, ফুফু, এমন কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রি পাওয়া মেয়ে বন্ধু ।

Sadia Nasrin
সাদিয়া নাসরিন

“পেট্রিয়ারকি” বা পুরুষতন্ত্রের ধরনটাই এমন। শার্ট-প্যান্ট এর ভিতরে যেভাবে থাকে তার চেয়েও ভয়ানক রুপে থাকে শাডির ভাঁজে। শার্ট-প্যান্ট এর ভেতরে থাকা “পেট্রিয়ারকি” কে মোকাবেলা করা যায়, কিন্তু শাড়ির ভাঁজের পেট্রিয়ারকি তো ধোলাই হয়ে যাওয়া মগজ। নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।

শৈশবে মা-বাবার উচিত-অনুচিতের গোলক ধাঁধা পেরিয়ে স্কুল-কলেজে “ভালো মেয়ে” হবার মোহ, তারপর মানুষ হয়ে বাঁচার কফিনে শেষ পেরেকটা টুকে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে স্বামীর শেখানো “আদর্শ বউ/মা” হবার চোরাবালিতে ডুবতে ডুবতে একটা মানুষ যখন শুধু মেয়ে মানুষ বা নারী হয়ে যায়, তখন তার মগজে থাকা পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বাসগুলো আর মোকাবেলা করা যায় না। এদের সাথে আর কোন তর্ক চলে না। এদের যুক্তি, বুদ্ধি, মেধা সব নিয়ন্ত্রিত হয় একটা পকেট থেকে, যে পকেটে টাকা থাকে।

কখনো ধর্ম, কখনো ভালবাসা, কখনো আবেগ দিয়ে পুরুষতন্ত্র এই নারীদের যুক্তি বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের স্বার্থে…এরা কিচ্ছু বুঝে না…এরা খালি বেসে যায়, ভেসে যায় আর ফেঁসে যায়।

এক সময় এসব নারীদের জন্য আমার দুঃখ হতো। এখন আর হয় না। এখন বরং করুণা হয়, ক্রোধ হয়। নিত্য মরাকে কে রোজ কবর দেয় বলুন? একটু নিশ্চিন্তে নিরাপদে টিকে থাকার জন্য নিজের পুরো জীবনটা অন্যের হাতে তুলে দিয়ে এরা  প্রমাণ করতে চায় এদের বিবাহিত জীবনে সুখ উপচে পড়ছে?

আমি বরং বলি, এরা লোভী আর এরা দুর্বল বলে নিজের অধিকার বোধটুকুও সমর্পণ করে বসে আছে পরের টাকায় খাওয়া পড়ার লোভে। এরা কী জানে সুখি দাম্পত্য মানে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ নয়, বরং নিজেদের পারস্পরিক ন্যায্যতা এবং অধিকারগুলোকে সম্মান দেয়া?

এরা কি আদৌ কোনদিন ভেবেছে নিজের স্বাতন্ত্র্য আর যোগ্যতায় বাঁচা ঠিক কাকে বলে? নারী-পুরুষ নয়, বরং মানুষের সম-মর্যাদায় গড়ে উঠে যে সংসার, সে সংসারের সোনার আলো কি এরা দেখেছে কোনদিন?  স্ত্রীকে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে না রেখে তাঁর যোগ্যতাকে প্রমাণ করার অধিকার আদায়ে যে পুরুষ  সহযোদ্ধা হন, সে পুরুষ কেমন হয় তাঁরা কি দেখেছেন কখনো?

স্বামীর পকেটকে নিজের পকেট মনে করে যাঁরা নিশ্চিন্তে আরামে নিরাপদে সুখ সুখ খেলা করছেন তাঁদের বলি, পিতা, স্বামী, পুত্র কারো পকেটই আদতে তোমার নয়। দাতা-গ্রহিতার সম্মান কোনদিন এক নয়। স্বামী কিছুটা সম্মান দেয়ার ভান করবে, কারণ তুমি ছাড়া তার টাইমের ভাত হবে না, সোসাইটি-অফিস-পার্টি হবে না, নিশ্চিন্ত যৌন সুখ হবে না…সুতরাং তোমাকে তার চাই, তোমার জন্য নয়,  তার সবকিছু পরিপাটি থাকার জন্য।

বিশ্বাস না হলে, একবার নিজের দেহঘড়ি বন্ধ করে দেখো তো, একদিন রান্না-সংসার-সোসাইটি-বিছানা সব বন্ধ করে দেখো তো সব ঠিকঠাক থাকে কিনা? যে ঘরকে নিজের মনে করে শহীদ হয়ে যাচ্ছো তুমি, একবার স্বামীকে রাগিয়ে দেখো তো, সে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে বলে কীনা?

মাঝরাতে সন্তানসহ ঘর থেকে বের হয়ে আসতে বাধ্য হয় যে নারী, সেও একদিন তোমার মতো স্বামীর ঘরকে নিজের ঘর বলে মনে করতো।

নিজের সব যোগ্যতা, স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়ে যে তুমি ছেলে-মেয়েদের “মানুষ” করছো, একবারও কি ভেবেছো  পঁচিশ ত্রিশ বছর আগে ঠিক এভাবেই তোমার মা ও  দাঁতে দাঁত চেপে সংসারের আগুন গিলে আগুন হজম করেছিল তোমাকে “মানুষ” করবে বলে?

ত্রিশ বছর আগে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়ে স্কুলের বারান্দায় বসে তোমার মা স্বপ্ন দেখতেন “এই দিন  দিন নয় আরো দিন আছে, এই দিনেরে নিবে তুমি সেই দিনেরো কাছে” ……আজ ত্রিশ বছর পরে  তুমি তোমার মেয়েকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়ে স্কুলের বারান্দায় বসে একই গান গাও, ত্রিশ বছর পরে তোমার মেয়েও যখন একই ভাবে তার মেয়েকে “মানুষ” বানানোর জন্য হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়ে স্কুলে বসে থাকবে, ভেবেছো, তখন  তোমার এতো শ্রম, ত্যাগের কী হবে ?  এই দিন সেই দিনের কাছে কে নিয়ে যাবে??????

Feminism collageস্ত্রীর কামাই খেলে যে সব মহান পুরুষের পৌরুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে তাঁদের স্ত্রীরা গর্ব করেন এবং নিজেদের  স্ব-মহিমায় সন্তান প্রতিপালনে নিযুক্ত করেছেন,  তাঁদের কাছে সবিনয়ে জানতে চাই,  আপনারা কেন আপনাদের কন্যা সন্তানদের জন্য এতো সময়-পয়সা নষ্ট করছেন?

বলা তো যায় না, আপনার কন্যার জন্যও  হয়তো এমন কোন পুরুষ অপেক্ষা করছে, যে আপনার মতোই ভাবে, মেয়ে মানুষের কামাই খাওয়া না-জায়েজ, মেয়ে মানুষের কাজ বাচ্চা-কাচ্চা সামলানো আর স্বামীর সোসাইটি মেইনটেইন করা !!!

যাঁরা মনে করেন “বিবাহিত জীবনে অসুখি মেয়েরাই বেশি বেশি অধিকার নিয়ে সচেতন হয়’’ তাঁদের জন্য ছোটবেলায় পড়া “স্বাধীনতার সুখ” কবিতাটা আবার লিখলাম। পড়ুন, ভাবুন এবং শিখুনঃ

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,

“কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই,

আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পড়ে

তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”

বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তায়?

কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।

পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,

নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.