কে তোমাকে চেনে?

ইশরাত জাহান ঊর্মি: বল্লরী আমাকে বলে, আসো একদিন বসি। আমি একপায়ে খাড়া। আগে আমরা প্রায়ই বসতাম, কোন কফিশপ অথবা ফাস্ট ফুডের দোকানে। ও আমার আগের অফিসের কলিগ। বল্লরীর কথা আমি আগেও বলেছি। খুব সাধারণ একটা মেয়ে। ডেস্কে চাকরি করে। স্বামী-সংসার নিয়ে সুখী হতে চাওয়া। কিন্তু শ্বশুড়বাড়ির লোকেদের শঠতায় জীবনে নানান ক্রান্তিকাল পার করেছে।

Urmiএকবার সংসার ছেড়ে বেশ কিছুদিন একলা বাসা ভাড়া করেও থেকেছে। আবার ফিরেও এসেছে। সম্ভবত ওর একলা বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া, মেয়েকে একলা মানুষ করতে চাওয়ার দৃঢ়তায় ওর শ্বশুড়বাড়ির লোকজন এবং স্বামী কিছুটা ভড়কে গিয়েছিল। এখন তাই ওকে একটু সমীহই করে। আমরা আগে প্রায়ই বসে নিজেদের গল্প করতাম। আমি অফিস চেঞ্জ করায় অনেকদিন বসা হয় না।

আজ আমরা গুলশান আড়ং-এর গ্রাসরুট ক্যাফেতে বসি।

আগেই পৌঁছে গেছিলাম, আমি দূর থেকে ওর হেঁটে আসা দেখছিলাম। ও এমনিতেই আগুন সুন্দরী, আজ  লাল রং এর সালোয়ার কামিজে যেন জ্বলজ্বল করছে। ক্যাফের অনেকেই ফিরে ফিরে তাকায়। রূপের সাথে স্ট্রংনেস যুক্ত হলে সম্ভবত সেই সৌন্দর্য্য হয় তুলনাবিহীন! আমি যেন সাধারণ একটি মেয়ে বল্লরীর   ধীরে ধীরে “হয়ে ওঠা” দেখি চোখের সামনে।

ও বসলে কফি আর সালাদের অর্ডার দিয়ে বলি,

: কীরে এতো সুন্দর হচ্ছিস দিন দিন, প্রেমে পড়েছিস না কি কারো?

বল্লরী আমার দিকে স্পষ্ট তাকায়, বলে,

: কেন আপা? আমাকে দ্রষ্টব্য হতে হলেই কেন মনে করবে যে অন্য কারোর সাহায্য লাগবে? প্রেমে পড়তে হবে কেন? আমার সৌন্দর্য্য আমার একলার চর্চা। এখানে কোন প্রেমিক পুরুষের কোন ভূমিকা নাই।

আমি একটু থতমত খাই। সাধারণ বল্লরী, কবে থেকে এরকম নারীবাদী যে হয়ে গেল! বলি,

: আরে তোমার হলোটা কি? আমি তো ইয়ার্কি করলাম!

বল্লরী আত্মগত, বলে,

: আপা শমিত এর সাথে ঝগড়া করেছি।

শমিত ওর স্বামী। সাধারণ টিপিক্যাল স্বামীরা যেমন হয়। আমি বলি,

: আবার? কেন বল্লরী, তোমাকে না নিষেধ করেছি, ঝগড়া করো না। ওতে কোন ইতর বিশেষ হয় না।

ও কথা বলে না। তাকিয়ে থাকে। আমি সংকোচ কাটিয়ে ওর হাত ধরি, বলি,

: কী হয়েছে, বলো তো? খারাপ কিছু বলেছে?

বল্লরী এখনও যেন আত্মগত, বলে,

:  শমিত কাল আমাকে বলল, তুমি এতো বহি:মুখী হয়ে গেছো, অফিস নিয়ে ইদানিং বেশি মেতে থাকো, আর জামা-কাপড়-শাড়ি-গয়না কিনছোই, তোমার খুব বাইরের নেশা হয়েছে।

আমি তো ওর অফিসেই ছিলাম। ডেস্কের বাঁধা ডিউটি। অফিস নিয়ে নতুন করে মেতে থাকার তো কিছু নেই। আমি মনে মনে শমিতের উপর বিরক্ত হই। পুরুষগুলার খাসলত, মেয়েরা যে শান্তিমতো কাজ করবে তারও উপায় নাই। বল্লরী বলে,

:  শমিত আরো কী বলে জানো? বলে, তোমার আসলে মুক্ত স্বাধীন জীবনই ভালো লাগে, তুমি আসলে বাইরের জীবনই ভালোবাসো, আমারে বিয়ে করছিলা সাইনবোর্ড লাগাতে..

আমি আঁচ করতে পারি, “মুক্ত-স্বাধীন জীবন” সে ভালো অর্থে ব্যবহার করে নাই। আমি বলি,

: বল্লরী, আমি তো জানি তুমি এরকম না। তুমি সংসার কত ভালোবাসো! মন খারাপ করো না।

বল্লরী আমাকে অবাক করে দিয়ে অদ্ভুত স্বরে বলে,

: আপা, কথা মনে হয় শমিত মিথ্যা বলে নাই। আমি আসলে বাইরের জীবনই ভালোবাসি। আচ্ছা, ঊর্মি আপা, মুক্ত স্বাধীন জীবন যদি আমি চাই-ই, যদি বাইরের জীবন ভালোবাসি, তাহলে কি সেটা খুব অন্যায় চাওয়া? আমার যদি ইচ্ছাই করে যে, আমি উড়ে-ঘুরে বেড়াবো, সেটা কি খুব অন্যায্য কিছু চাওয়া? আমার আর সত্যিই সংসারে মন বসছে না। পড়াশোনা তো বিশেষ করি নাই, করলে বিদেশে কোন চাকরি নিয়ে চলে যেতাম। খুব ট্রাভেল করতে হয় এমন একটা চাকরি করতাম, এয়ারপোর্ট বা মেট্রো স্টেশনে বসে সারাদিন মানুষ দেখতাম, তাড়াহীন! একটা বিবাহিত, আপাত: সুখী, সন্তানের মায়ের এরকম চাওয়াটা খুব বিসদৃশ তাই না আপা?

আমি বুঝতে পারি না ওর সমস্যাটা। এটা কি মিডল ইনকামের দেশে পরিণত হতে যাওয়া একটা রাষ্ট্রের মেয়েদের সংকট? আমি বলি,

: অন্যায় কীনা জানি না, তবে বল্লরী, একসময় তো কাজ ফুরিয়ে যায়! তখন ঘরে ফিরতে হয় সোনা। তুমি পশ্চিমে তাকিয়ে দ্যাখো, কথায় কথায় আমরা যে “পশ্চিমে এমন হয়” বলে উদাহরণ দিই, সেই পশ্চিম, সেখানেও মানুষ কিন্তু  একক পরিবার বা লিভ টুগেদার থেকে আবার ফিরে আসছে যৌথ পরিবারের কনসেপ্টে, বিয়ের কনসেপ্টে।

ও বলে,

: তুমি যে বললে, একসময় ঘরে ফিরতে হয়, কোন ঘরে ফিরতে হয় আপা? যেখানে ঘুমন্ত অজগরের মতো শুয়ে থাকে স্ত্রীর প্রতি স্বামী আর তার পরিবারের অন্য লোকেদের অসম্মান? সারাক্ষণ কাঁটা হয়ে থাকতে হয় যে এই বুঝি অজগরটা জাগলো আর খেয়ে নিল আমার সমস্ত অর্জন! আমার সত্যিই  এই সংসার আর ভালো লাগছে না।

বল্লরী। খুব সাধারণ একটা মেয়ে। সারাক্ষণ কোনো জামার সাথে কোন কানের দুল মানাবে সেই নিয়ে গবেষণা করা মেয়ে, বিরিয়ানীতে কোন মশলাটা দিলে ঠিক দোকানের মতো স্বাদ হয় সেই গবেষণা করা মেয়ে। ওকে আমার কেন যেন খুব অচেনা লাগতে থাকে হঠাৎ।

আড়ং-এ ঈদের ভিড়। মেয়েরা কেনাকাটা করছে। আমার হঠাৎ পূর্নেন্দু পত্রীর কবিতা মনে পড়ে,

ডাইনিং টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট ডিনার খাচ্ছো রোজ

সে তোমাকে চেনে?

যে খাট পালংকে শুয়ে তুমি চাঁদ সদাগর

সে তোমাকে চেনে?

যে আয়নাকে শরীরের সব তিল, সর্বস্ব দেখালে

সে তোমাকে চেনে?

যেন মেয়ে দেখা এতো বেছে ঐ পর্দা কিনেছিলে

ও তোমাকে চেনে?

এই কালো টেলিফোন, ওয়ার্ডরোব, লং-প্লেয়িং, টিভি

এইসব থাক থাক বই, নেপালী মুখোশ

কে তোমাকে চেনে?

একমাত্র কার্পেটের ধুলোটুকু, রোদটুকু ছাড়া

দরজার জানালার ছেঁড়াখোঁড়া আলোটুকু  ছায়াটুকু ছাড়া

কে তোমাকে চেনে!

আমি আর বল্লরী দুইজন চুপ করে বসে থাকি। আমরা যেন আমাদের চিনি না আজকাল!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.