উদ্ভট এক ইচ্ছার ঘোর………

সেবিকা দেবনাথ: ছোটবেলায় আমি ছেলে হতে চাইতাম। নিজেকে ছেলে করে তোলার আশায় ছেলেরা যা করতো আমিও তাই করতে চাইতাম। বলা যায় অনেকটা নকল করারই চেষ্টা করতাম। মেয়ে বলে ‘এটা করা যাবে না’, ‘ওটা করা যাবে না’ এমন বিধিনিষেধ আমার পরিবারে খুব একটা ছিল না। কিন্তু আশেপাশের শুভাকাঙ্খিরা প্রায়ই আমার মাকে সতর্কবার্তা দিতো।

Sebika 2ঠাট্টার সম্পর্কীয়রা প্রায়ই মাকে বলতো, ‘তোমার মেয়েরে ঈশ্বর ভুলে মেয়ে বানাইছে।’ তাদের এমন মন্তব্যের পেছনে অবশ্য বেশ কিছু যুক্তিও ছিল।

আমার বন্ধুর তালিকায় মেয়ের চেয়ে ছেলের সংখ্যাই ছিল বেশি। ছেলেদের সাথে সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াতাম। মার্বেল, ডাঙ্গুলি, সাত চাড়া খেলতাম। ওদের সাথে পাল্লা দিয়ে গাছে চড়তাম। এ বাড়ি-ও বাড়ির দেয়াল টপকে ফুল চুরি করতাম। বাজি ধরে দাঁত দিয়ে নারকেলের ছোবড়া ছাড়াতাম। ফ্রকের চেয়ে আমার ভাল লাগতো শার্ট-প্যান্ট পরতে।

পূজায় যখন ফ্রক, স্কার্ট পেতাম তখন আনন্দ হতো ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে থাকতো ওই শার্ট-প্যান্টে। আমাদের পূজার জামা সব সময়ই ঢাকা থেকে কেনা হতো। বাবু (বাবা) পূজার বাজেট ঘোষণা করার পর ঢাকা থেকে বড় মামা-ছোট কাকু আমাদের জামা-কাপড় কিনে নিয়ে যেত।

নরসিংদী থেকে মাও কিনে দিতো কিছু। আমার অন্তর্যামী মা সবসময়ই আমার ইচ্ছার প্রাধান্য দিয়েছেন। পূজায় পাওয়া দুই/তিন সেট জামার মধ্যে এক সেট থাকতো গেঞ্জি/শার্ট-প্যান্ট। আমি ওই গেঞ্জি/শার্ট-প্যান্ট পরেই ঘুরে বেড়াতাম বেশি। সালটা ঠিক আমার মনে নেই। তবে জামাটার কথা এখনও মনে আছে আমার। ঢাকা থেকে আমার জন্য আনা হলো ‘শ্রীদেবী’ ড্রেস। এখন যেমন ‘কারিনা’, ‘ক্যাটরিনা’ তেমন আর কি। জামাটা চোখে ভাসে এখনও। হাল্কা নীলের মধ্যে নেভি ব্লু ও লাল রঙের স্ট্রাইপ করা গেঞ্জি। সাদা রঙের প্যান্ট। প্যান্টটা থ্রি-কোয়ার্টার থেকে একটু লম্বা। প্যান্টে বেশ কয়েকটা পকেট ছিল। তাতে ছিল চকচক করা স্টিলের কিছু বোতাম। এমন জামাকাপড় পেয়ে খুশিতে টগবগ আমি। ইচ্ছা করছিল পূজার আগেই জামা পরে ঘুরে বেড়াই।

ছোট মামা এলে তার শার্ট পরে বসে থাকতাম। হাঁটুর সীমা অতিক্রম করা ওই শার্ট পরেই চলে যেতাম বাইরে। বাসায় রেখে যাওয়া মামা-কাকার শার্ট পরেও ঘুরে বেড়িয়েছি অনেক। আমার অদ্ভুৎ এই কাণ্ড দেখে হাসতো অনেকেই। আমার ঠাকুরদা মোটেও তা পছন্দ করতেন না। কিন্তু তাতে কী, আমাকে তো দমে গেলে চলবে না। এমন একটা ভাব ছিল আমার মধ্যে।  

এখন যে কথাগুলো বলবো তা হয়তো শুনতে অশ্লীল মনে হবে। কিন্তু সত্যিটা তো সত্যিই থাকে। তাই না? ছেলে হবার নেশা আমাকে এতোটাই পেয়ে বসেছিল যে ছেলে-মেয়েতে লিঙ্গের পার্থক্যটা আমি বুঝতে চাইতাম না। ছেলে বন্ধুরা যেভাবে দাঁড়িয়ে পিসু করতো, আমিও চাইতাম ওদের মতো করতে। পারতাম না বলে মনোকষ্টে কেঁদেছিও অনেক।

মাকে প্রায়ই বলতাম, ‘মা আমি ছেলে হবো’। মা বলতো, ‘বোকা মেয়ে, তুই তো আমার ছেলেই’। পাশের বাড়ির পুতুল দিদা একদিন বলেছিল (তখন অবশ্য বুঝতে পারিনি কথাটা ঠাট্টা ছিল), সুবচনীর পূজা করলে মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়। মায়ের কাছে বায়না ধরি ওই পূজা করার। আমাকে ছেলে হতেই হবে।

আমার কথা শুনে মা তো পুরাই ‘থ’। কেমন করে মা আমার মাথা থেকে পূজার ভূত নামালো তা ঠিক মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে এরপরই আমার উপর আছর করলো আরেক ভূত।

একদিন দেখলাম পাশের বাড়ির জীবন কাকু ও বাড়িওয়ালি দিদার মেয়ে ঝর্ণা পিসি একসাথে বসে আছে। পত্রিকা হাতে নিয়ে কী যেন বলাবলি করছে। কাছে গিয়ে যা শুনলাম তার সারমর্ম যা বুঝেছিলাম তা হলো, একটা মেয়ে কেমন করে যেন ছেলে হয়ে গেছে। ওই খবরটা যেন মেয়ে থেকে ছেলে হবার আমার ইচ্ছাকে আরও তীব্র করে তুললো।

কাকুর কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, মেয়েটা কেমন করে ছেলে হলো? কাকু জানালো, অপারেশনের মাধ্যমে ওই অসাধ্য সাধন হয়েছে। কথা শুনে মনে মনে বললাম, একে একে আমার ইচ্ছা পূরণের পথ খুলে যাচ্ছে। এবার নিশ্চয়ই আমি ছেলে হতে পারবো। দুপুর বেলায় মা তখন রান্না করছিলো। দৌড়ে গিয়ে মায়ের কাছাকাছি ঘুরঘুর শুরু হলো আমার।

মা বুঝলো কিছু একটা বায়না আছে। কাছে ডেকে জানতে চাইলো কিছু বলতে চাই কি না। সার্জারি করাতে কত টাকা লাগে এর বিন্দু-বিসর্গ না জেনে (তা বোঝার বয়সও আমার তখন হয়নি) মাকে বললাম, ‘মা আমারে এক লাখ টাকা দাও। পরে দিয়ে দিবো।’

আমার কথা শুনে মা হাসবে না কাঁদবে এটাই বোধ হয় ভেবে পাচ্ছিল না। অবাক হয়ে বললো, ‘কী!!! এতো টাকা দিয়ে তুই কী করবি?’ আমার সোজা সাপ্টা উত্তর, ‘আমি ছেলে হমু মা। অপারেশন করালে মেয়ে থেকে ছেলে হওয়া যায়। ছেলে হয়ে রোজগার করে তোমারে টাকা ফেরত দিমু।’

মায়ের মুখ তখন শক্ত হয়ে গেলো। রাগী গলায় বললো, ‘এ কথা কে বলছে তোরে?’ আমি যেন সত্যবাদী যুধিষ্ঠির। স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘জীবন কাকু। পত্রিকায় দিছে। মেয়ে থেকে ছেলে হওয়া যায়’।

হাতের খুন্তি তুলে মা আমাকে বললো, ‘ভাগ এখন।’ পরে জীবন কাকুর সাথে মায়ের কী কথা হয়েছিল তা আমি জানি না। তবে কাকু আমাকে দেখলে প্রায়ই বলতো, ‘তুই এমনই থাকিস। ছেলে হওয়ার দরকার নাই মা।’

তখন প্যাকেট আটার চল ছিল না। গম ভাঙ্গিয়ে আটা করে নিতে হতো। বাড়ি থেকে গম এসেছে আমাদের নরসিংদীর বাসায়। বাজারে ওই গম ভাঙ্গাতে নিয়ে যাবার লোক পাচ্ছিল না মা।

মার মুখে কয়েকবারই এই কথাটা শোনার পর মাকে বললাম, ‘মা আমি নিয়ে যাই?’ বাজারের অলি-গলি, কার কোন দোকান সবই আমার মুখস্ত। আমার নাম-ধাম, কার মেয়ে, কার ভাতিজি, কোথায় থাকি এক কথায় আমার ঠিকুজি কুষ্ঠি অনেকেরই মুখস্ত। তাই কোন সমস্যা হবার কথা না।

তবুও মা আমাকে দিয়ে ওই কাজটা করাতে ভরসা পাচ্ছিল না। আসলে দুষ্ট ছিলাম তো! কিন্তু আমার তখন মনে হয়েছিল আমি মেয়ে বলেই মা ভরসা পাচ্ছে না। ছেলে হলে ঠিকই পারতো। আমি এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইলাম না। আমাকে প্রমাণ করতে হবে ছেলেরা যা পারে আমিও তা পারি। নাছোরবান্দা আমার প্যানপ্যানানিতে মা রাজি হলো। তবে শর্তজুড়ে দিয়ে।

শর্ত হলো, পরিচিত রিকশাচালক কাকার রিকশায় আমাকে যেতে হবে। দোকানের সামনে কাকা দাঁড়িয়ে থাকবেন এবং গম ভাঙ্গা হয়ে গেলে কাকার রিকশায়ই আমাকে বাসায় ফিরতে হবে। অপমান লাগছিল। ছেলেরা তো অপরিচিত রিকশাওয়ালার রিকশায় যায়।

মনে হয়েছিল, পরিবেশ বিমাতা সুলভ আচরণ করছে আমার সাথে। তবুও রাজি হলাম। সাধারণ এই কর্ম সম্পাদনের পর আমার ভাবের অন্ত ছিল না।

আমার যতদূর মনে পড়ে (স্মৃতিশক্তি এখনও প্রতারণা করা শুরু করে নাই) ছোটবেলায় যতবার বর-বৌ খেলতাম আমি ততবারই ‘বর’ হতাম। আমার এই খেলা খেলার পূর্ব শর্তই ছিল আমাকে ‘বর’ বানাতে হবে। খেলার ছলেও বাড়ির কর্তার মত যে আমার আচরণ ছিল তা এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে।  ছেলেদের মতো পকেটে হাত দেয়ার ভঙ্গি করে চলাফেরা, চাকরি করা, বাজারে যাওয়ার অভিনয় করতাম।
ওসব কথা এখন মনে পড়লে একা একাই পেট ফেটে হাসি পায়।  

আস্তে আস্তে উদ্ভট এই ইচ্ছায় ভাটা পড়তে লাগলো। মেয়েরাও যে সব পারে এই ধারণার বীজটা মা-ই আমার মাঝে বুনে দিয়েছেন। মা-ই শিখিয়েছেন, ছেলে-মেয়েতে কোন তফাৎ নাই। মায়ের শিক্ষা নিজের মধ্য কতটুকু ধারণ করতে পেরেছি তা জানি না। তবে সন্তানদের তিনি সেভাবেই বড় করার চেষ্টা করেছেন।

তখন কেন আমি ছেলে হতে চাইতাম এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। মেয়ে হয়েছি বলে কেউ যে আমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতো তেমনও নয়। কিন্তু আমার একটা কথা এখনও মনে আছে, বড়দের কাছে শুনতাম ছেলে না হলে নাকি বংশ রক্ষা হয় না।

আমি আমার বাবার বংশ রক্ষা করতে চাইতাম। (পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তখন আমরা তিন বোন। ভাই জন্মায়নি) বাবার সুনাম হবে এমন কিছু করতে চাইতাম। এই ইচ্ছাটা আমার এখনও আছে। শুধু ছোটবেলায় ছেলে হবার ইচ্ছাটার কথা মনে পড়লে এখন ভীষণ হাসি পায়। ছেলে বা মেয়ে হিসেবে নয়, আমি আমার বাবা-মায়ের যোগ্য সন্তান হতে চাই।

###

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.