বন্ধু তোমায় দিলাম আজকে ছুটি

জেসমিন চৌধুরী: এই কয়দিন কিছুই লিখিনি, শুধু একজন বন্ধুর জন্য একটা বক্তৃতা অনুবাদ করা ছাড়া। তাও করেছি, কারণ ওটা ছিল একটা ইউরোপিয়ান কনফারেন্সে উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশে চলতে থাকা গুপ্তহত্যা সম্পর্কিত একটি বক্তব্য।

এই লেখাটাও খুব গোছানো কিছু হবে না, কারণ আমি গুছিয়ে ভাবতেই পারছি না এখন।

13336239_10154292980419850_751286349_nঅনেক কিছু করার কথা ছিল আমার, অনেক কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল- একটা গল্প, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা প্রার্থনা সংগীতের অনুবাদ, একটা নাটক এডিট করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমি এসব কিছুই করছি না।

আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি সুখী স্বাভাবিক শৈল্পিক জীবন বাঁচার বিরুদ্ধে, নিরাপদ দিন যাপনের বিরুদ্ধে। দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া জঙ্গি খুনের পরও আমার সুশীল বন্ধুদের নীরবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি আমি।

এই বিষয়ে আমার একটা ফেইসবুক স্ট্যাটাসে আমার এক বন্ধু মন্তব্য করেছেন, এদের নীরবতার কারণ হচ্ছে দেশের বেশির ভাগ মানুষ হয় ভয় পায়, নয়তো বা কোন না কোনভাবে এইসব হত্যাকে গ্রহণযোগ্য ভাবে, নিদেনপক্ষে এদেরকে মারার পেছনে হত্যাকারীদের নিজস্ব যে কারণগুলো রয়েছে তার সাথে কিছুটা হলেও একমত পোষণ করে।

কথা সত্য। দেশের বেশির ভাগ মানুষের নীরব সমর্থন ছাড়া এভাবে একের পর এক খুন খারাবি হতেই পারে না, তাদের নীরবতা তাদের সমর্থনেরই সাক্ষ্য বহন করে। আর করবে না’ই বা কেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজেই তো বলেছেন, ধর্মের বিরুদ্ধে কথা শুনলে তারও ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিছু লিখি না, যদি না আমার কোন মানবিক বিশ্বাসের প্রকাশকে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরোধিতা বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু নিজের বিশ্বাস বা অবিশ্বাস নিয়ে যে কারো লেখায় আমি কোন সমস্যা দেখি না।

চাপাতিওয়ালাদেরকে নয়, বরং সেইসব বন্ধুদের বলছি যারা বলে থাকেন, ‘কেন এরা ধর্ম নিয়ে এতো কথা বলে? এসব শুনলে তো আমাদেরও খারাপ লাগে’, ধর্মবিরোধী কথাবার্তায় কষ্ট না পেয়ে নিজের বিশ্বাসকে আরও পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করলে কেমন হয়?  

ধর্মবিশ্বাসেরও বোধ হয় পুষ্টিকর বিরোধিতা রয়েছে যেন তা একটু-আধটু সমালোচনা সইতে পারে।

যে পৃথিবীতে নানান রকমের ধর্মবিশ্বাস আছে, আবার অবিশ্বাসও আছে, সেই পৃথিবীতে সবাই সবার অনুভূতিতে প্রতিনিয়তই নীরবে বা সরবে আঘাত করে চলেছে। আপনি যখন একটি ধর্মকে একমাত্র সত্য ধর্ম বলে ঘোষণা করছেন তখন বাই ডিফল্ট অন্য সব ধর্মকে মিথ্যা ঘোষণা করা হচ্ছে, ফলে কারো না কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগছেই।

তাছাড়া অনুভূতি তো অবিশ্বাসীদেরও আছে। কখনো ভেবে দেখেছেন কি, যাদের ধর্ম বলে কিছু নেই দিনরাত ধর্মের গুণগান শুনলে তাদের অধর্মানুভূতিতেও আঘাত লাগতে পারে? যারা কিছু বিশ্বাস করে না, তাদেরকে প্রতিনিয়তই নিজের অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের পোস্ট দেখতে হয়। প্রতিক্রিয়া স্বরূপ বেচারারা লেখালেখির বাইরে তো আর কিছুই করে না। তবু তাদের উপর আপনাদের এতো রাগ কেন?

অবশ্য রাগতো হবারই কথা, যারা মরছে তারা কি আর মানুষ? তাদের কেউ নাস্তিক, কেউ গে, কেউ হিন্দু।  এরা তো অনন্ত কাল ধরে আগুনে পুড়বেই, সাপের কামড় খাবেই; দোযখে অনন্ত যন্ত্রণা ভোগ করবে, কিন্তু মৃত্যুর স্বস্তিটুকুও পাবে না।

এহেন মানুষগুলোকে কুপিয়ে মেরে ফেলার মধ্যে তেমন খারাপ কি থাকতে পারে? আমাদের বিশ্বাসে যদি মরণোত্তর অনন্তকাল ধরে চলতে থাকা ভায়োলেন্সের জন্য সমর্থন থাকে, তাহলে আমাদের কর্মে কিছু ভায়োলেন্স থাকতে দোষ কি?

মানুষের মত মানুষ  মরলে তো আমরা ঠিকই সচেতন হয়ে উঠি, সাঁড়াশি অভিযানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রেরও হুঁশ আসে।

আমরা সেই সাহসী জাতি যারা প্রায় খালি হাতে দেশ স্বাধীন করেছিলাম। আমি বিশ্বাস করি দেশের সব মানুষ যদি এক হয়ে এইসব হত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারতাম তাহলে গুটিকয় সন্ত্রাসী এভাবে দেশময় আতংক সৃষ্টি করতে পারতো না।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, যেসব বিশেষ ক্ষেত্রের বা গোত্রের মানুষদের কুপিয়ে মারা হচ্ছে, আমরা তাদের সাথে নিজেদের পরিচিতি মেলাতে পারছি না, একাত্ম বোধ করতে পারছি না, তাই প্রতিবাদের হুংকারে কেঁপে উঠছেনা দেশ। যে মানুষ আমার মত নয়, যার বিশ্বাস আমার বিশ্বাস থেকে ভিন্ন, তার মৃত্যু আমার চোখে অশ্রু আনবে কেমন করে? আমি কি আর যেমন তেমন মানুষ?

আমি জানিনা কোথায় কিভাবে লড়তে হবে কিন্তু আমি জঙ্গিদের সাথে সাথে আমার সুশীল বন্ধুদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করতে চাই। একটু বোকা বোকা শোনাচ্ছে?  আমি আসলে বেশি বুদ্ধিমান না, আমি ভদ্রমহিলা না, আমি সুশীল না। আমি ঢাকা শহরে রিক্সা ড্রাইভার পিটানি ট্রাফিকের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে হাতাহাতি করেছি, চোখ দেখানি র‍্যাব কর্মকর্তাকে উলটা চোখ দেখিয়েছি, শাহবাগের পথে শুয়ে দিনের পর দিন গলা ফাটিয়েছি।  আমি নীরব পার্টি না। আমি নীরবতার ভাষা বুঝিনা।

আমি আমার সকল ভদ্রমহিলা মহোদয় সুশীল বন্ধুদেরকে ছুটি দিলাম। আমি আপনাদের বিষয়ে হাত ধুয়ে শুকিয়েও ফেলেছি। আবার ভেজানোর ইচ্ছা রাখিনা। শুধু এইটুকু বলব, চুপ থাকতে চান থাকেন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর ভূপেন হাজারিকার মানবতার গান কবিতাও লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েন আর শুনেন, কিন্তু শেয়ার করে মানবতা প্রদর্শনের চেষ্টা কইরেন না। আপনাদেরকে ছুট্টি দিলাম।

Jesmin Chowdhury, Freelance ESOL teacher and translator

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.