‘বাপ-দাদার মতো আমিও এই দেশে থাকতে চাই’  

সেবিকা দেবনাথ: সংখ্যালঘু হিসেবে আমার বাপ-দাদা কেউই এদেশ ছাড়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেনি। ছয় ভাইয়ের মধ্যে আমার দাদাই দেশ ছাড়েনি। কাঁটাতার পেরিয়ে ওই দেশে দাদার অন্য ভাইরা কিন্তু দিব্যি আছে। আমার বাপের ছয় ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই সেখানে থিতু হয়েছেন।

আত্মীয়-স্বজন-বন্ধু অনেকেই আমার বাপকে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিতো। এখনও দেয়। তাদের আশাভঙ্গ করে আমার বাপ তার বাপ-দাদার ভিটায় ৩০/৩২ লাখ টাকা (বাপের পেনশনের টাকা’র প্রায় সবটা) খরচা করে ইট-বালু-রড-সিমেন্ট দিয়ে একখান বাড়ি বানালো।

Sebika 2আমার দাদার শখ ছিল তার বড় ছেলে বাড়িতে একটা ঘর তুলবে এবং তিনি তা দেখে যাবেন। দাদার তখন মরো মরো অবস্থা। বাপের ইচ্ছা পূরণ করতে নিজের সর্বস্ব দিয়ে বাপ আমার বাড়ি তৈরির কাজে হাত দিলেন। সবাই হা হা করে উঠলো। করে কী, করে কী!!!

সবাই প্রকাশ্যে কিংবা অলক্ষ্যে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করে, আর এই বেকুব গ্রামে বাড়ি বানায়? তাও যদি স্থায়ীভাবে থাকতো, তাহলে একটা কথা। ছুটি ছাটায় বেড়াতে আসবে, তার জন্য এত খরচা করার কী আছে?

একই প্রশ্ন আমি আমার বাপরে করেছিলাম। বাপের উত্তর ছিল, ‘অন্য দেশে দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকার চেয়ে নিজের দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচা অনেক মর্যাদার। তাছাড়া বাবা, তোমাদেরতো কিছুই দিয়ে যাইতে পারি নাই। নিজ দেশে বাপ-দাদার ভিটায় মাথা গোঁজার একটা জায়গা যদি করে দিয়ে যেতে পারি….’

প্রবাসী বড় মেয়ে যখন বিদেশ যেতে বলে, বাপ আমার হাসে। বেড়াতে যাবার কথায়ও রাজি হয় না। এদেশ যে তারে কোন মায়ায় বাঁধছে তা একমাত্র বাপেই জানে। জীবদ্দশায় দাদাতো ভাইদের ওখানে বেড়াইতেও যায় নাই।

দুষ্টামি করে দাদাকে যদি দেশ ছাড়ার কথা বলতাম, দাদা অনেকটা ক্ষেপে যেতেন। বলতেন, ‘ধুর শুয়োর, দেশ ছাড়মু কেন? এটা আমার বাপ-দাদার দেশ। বলদেরা দেশ ছাড়ে।’ ( বিঃ দ্রঃ শুয়োর এবং বলদ ছিল দাদার জাতীয় বকা।)

ঘুষ বা অসৎ পথের টাকায় সন্তান বা বাপ-ভাইরে কিছু করার দুর্বুদ্ধি আমার বাপের কোন কালেই ছিল না। মেডেল বা পদকে হয়তো সততার পুরস্কার বাপ পায়নি। কিন্তু একজন সৎ মানুষ হিসেবে আমার বাপের যে সুনাম তা কোন মেডেল বা পদকে হয় না।

ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য আমার বাপের নাই। কোনো কালে যে ছিল না সেটা বলবো না। আত্মকেন্দ্রিক মানুষ হলে হয়তো অনেক কিছুই থাকতো। সংসারে বড় ছেলে এবং ভাইয়ের দায়িত্ব পালনে বাপ আমার কখনও কার্পণ্য করে নাই। সবাইকে নিয়ে ভাল থাকার একটা প্রবল ইচ্ছা আমার বাপের মধ্যে ছিল। এখনও আছে। আর আছে পূর্বপুরুষের দেশের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার ইচ্ছা।

বাপ-দাদার রক্ত এই শরীরে। তাদের গুণগুলো না পেলেও ঘাড়ত্যারা স্বভাবটা যে আমরা ভাইবোন সবাই অনেকটাই পেয়েছি, সেটা আত্মীয়-স্বজন সবাই বলে। কিন্তু বাপ-দাদার মতো দেশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার ইচ্ছাটা ইদানিং উবে যায়। চারপাশে যা ঘটে যাচ্ছে তা দেখে ইচ্ছাটা টলতে থাকে।

প্রশ্ন জাগে, এই দেশটা কি আদৌ আমাদের আগলে রাখবে? বাপের ইচ্ছা এবং দেশকে ভালবেসে বাপ যে বাড়িটা করেছে সেখানে কতদিন থাকতে পারবো? দা বা চাপাতির কোপ যে আমার কাঁধেও পড়বে না তার কী নিশ্চয়তা?   

বাপ-মা তুলে কেউ গালি দিলে ওই লোকটারে খুন করতেও পিছপা হয় না/ হবে না অনেকে। বুকে হাত দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইলে কিংবা ও দেশাত্মবোধক গানে চোখের পাতা ভিজে আসলেও এই দেশটাকে মায়ের মতো আমরা ভালবাসতে পারিনি। তখনই দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্নটা উঠে। আর আমাদের হতাশাগুলো শাখা-প্রশাখা মেলে বিস্তার ঘটে। চারপাশে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্খিত ঘটনাগুলো ফরমালিন হয়ে সেই হতাশাগুলোকে জিইয়ে রাখে।

শেয়ার করুন:

শুধু থাকতে দিন কিংবা বিচার চাই বলে মুসলিম দেশে থাকাও যাবে না, বিচারও মিলবে না। দুনিয়ার কোনও মুসলিম দেশে অমুসলিম্দের মানুশ বলে গন্য় করা হয়্না। সব্চে মডারেট মুসলিমদেশ মালয়েশিয়া থেকেও অমুসলিমরা ধর্মীয় বাইশম্য়ের কারণে সিংগাপুরে পার হচেচ। বাংলাদেশে সত্য়ি যদি হিন্দুরা থাকতে চায় তাহলে এল টি টি ই র মত সংগঠিত হতে হবে। নচেত অন্য় উপায় নেই।

শ্রদ্ধেয় সেবিকা দেবনাথ আপনার লেখাটি পড়লাম; পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চেয়ে ছিলাম; এখন যেন দেশটা কেমন হয়ে যাচ্ছে, তবুও আশাকরি দেশটা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ হিসেবেই বেঁচে থাকবে আজীবন।

শুধু থাকতে দিন কিংবা বিচার চাই বলে মুসলিম দেশে থাকাও যাবে না, বিচারও মিলবে না। দুনিয়ার কোনও মুসলিম দেশে অমুসলিম্দের মানুশ বলে গন্য় করা হয়্না। সব্চে মডারেট মুসলিমদেশ মালয়েশিয়া থেকেও অমুসলিমরা ধর্মীয় বাইশম্য়ের কারণে সিংগাপুরে পার হচেচ। বাংলাদেশে সত্য়ি যদি হিন্দুরা থাকতে চায় তাহলে এল টি টি ই র মত সংগঠিত হতে হবে। নচেত অন্য় উপায় নেই।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.