কিডস অন ক্যামেরা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: কয়েকদিন আগে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হলো প্রখ্যাত সাংবাদিক আবেদ খানের ফোনে। বিবিসি রেডিওতে প্রচারিত আমার একটি সাক্ষাতকার শুনে তার এই সকাল সকাল ফোন। বিষয় ছিল, চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তার সন্ত্রী হত্যার ঘটনায় আমাদের প্রায় সব গণমাধ্যম, পত্রিকা, অনলাইন, টেলিভিশন এবং রেডিও কেন তার ছোট্ট শিশুটির কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা নিল?

Reza bhaiসাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার সময়ও আমরা দেখলাম, তাদের সন্তান, পাঁচ বছরের মেঘের সাক্ষাতকার নিচ্ছে সাংবাদিকরা। সেই ঘটনার যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আমাদের প্রত্যাশা ছিল নিশ্চয়ই এরপর সাংবাদিকরা সচেতন হবেন। কিন্তু হননি।

আসলে আমাদের সাংবাদিকতায় প্রযুক্তি যোগ হয়েছে, অনেক জৌলুশ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান বলে কিছু দাঁড়ায়নি।  

মেঘ কিংবা পুলিশ কর্মকর্তার সন্তান, তাদের সাথে ‘বাবু সোনা’ বলে আদর করে করে কথা বের করতে দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। এখানে আদর সোহাগের সুর যতই থাকুক না কেন এ ধরনের সাংবাদিকতা হৃদয়হীন সাংবাদিকতা।

শুধু এমন হত্যাকাণ্ডে নয়, নানা ঘটনায় আমাদের অনেক সাংবাদিক টেলিভিশনে শিশুদের দিয়ে কথা বলান। কিন্তু যে পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ায় শিশুদের সাক্ষাৎকার সাংবাদিকরা নেন তা অনেক সময়ই নৈতিকতার প্রশ্নকে জাগিয়ে তোলে। বিশেষ করে ব্রেকিং নিউজ পরিস্থিতিতে শিশুরা যা বলে তার ফলাফল সম্পর্কে বা ঝুঁকি সম্পর্কে তার কোন ধারণা থাকে না।

পশ্চিমা দুনিয়া শুধু নয়, সাংবাদিকতা যেখানেই কিছুটা নীতি নৈতিকতা মেনে চলে সেই সমাজেও শিশুকে পত্রিকার পাতায় বা টেলিভিশনের পর্দায় আনার ব্যাপারে সতর্ককতা মেনে চলতে হয়। এমনকি খুব ইতিবাচক বা সাধারণ বিষয়েও শিশুদের ছবি ও কথা প্রচারের অভিভাবক বা সংশ্লিষ্টদের অনুমতি বাধ্যতামূলক।

তাই বলে কি কোন ঘটনায় শিশু যদি প্রত্যক্ষদর্শী হয় তার সাথে কথা বলা যাবে না? এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হই প্রায়ই। কথা বলা যাবে, যদি খুব প্রয়োজন হয় এবং অবশ্যই সাথে সাথে নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান The Dart Center for Journalism and Trauma বলে “Kids at Tragedies: Turn Off the Cameras. There is no good journalistic reason to put a child at a murder scene on live TV, permission of the parents or not”. অভিভাবক অনুমতি দিলেও হত্যার বর্ণনা শিশুর কাছ থেকে নয়।  এই নির্দেশনা এসেছিল স্যান্ডিহুকে স্কুল শিক্ষার্থী হত্যার পরপর। দেশটির প্রায় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠানো হয় একটি গাইডলাইন। দু:খজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই।  

ট্রমা বা ভয়ংকর কোন পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যদি তার আপনজন কেউ ঘটনার শিকার হয়,  শিশুকে কোন প্রশ্ন নয়, প্রয়োজন তাকে সান্ত্বনা দেয়া। কথা যদি বলতেও হয় তবে অপেক্ষা করতে হবে, তা যদি সপ্তাহ বা মাসও হয়।

Dart Center বলছে,  “Be willing to wait until the parents and child are ready to talk, even if that is weeks or months after the crisis. You will likely get a much better interview.”

ট্রমায় থাকা মানুষ সবসময় ঠিক বলে না।

তাই Dart Center বলে, “Traumatized people often make poor decisions. Be prepared for adults or children to change their minds once the interview is complete. If this happens, don’t use the material.”

Babul Akhter Policeএমন বাস্তবতায় একটি একটি শিশুর লাইভ ইন্টারভিউ বা সরাসরি সাক্ষাৎকার কতটা জরুরি বা কতটা নৈতিক? একটি আকস্মিক মন্তব্য, কিংবা না বুঝে বা বলা একটি কথা, বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে, হতে পারে সেই শিশু আর তার পরিবারের জন্য  জীবনভর অস্বস্তি। এখন যে কথা বলেছে, কিছুক্ষণ পরই যে তার কথার পরিবর্তন হবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে?

আমাদের মধ্যে প্রবণতা বেড়েছে লাইভ ইন্টারভিউ বা সরাসরি সাক্ষাৎকারের। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা কখনোই শিশুদের নিয়ে লাইভের খেলা খেলবে না। ব্যাক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে বড়দের চেয়ে শিশুদের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার বেশি। শিশুদের সরাসরি সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় বিশেষ যত্নবান হতে হবে, কেননা এ ধরনের লাইভ কাভারেজ নিয়ন্ত্রণ বা সম্পাদনা করা অনেক কঠিন।     

শিশু সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকের বিবেচনা কী হতে পারে তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যেতে পারে। সাক্ষাতকার যে নেয়া হবে তার উদ্দেশ্য  আসলে কী? শিশু যে তথ্য দিচ্ছে সবই সত্য বলে ধরে নিচ্ছে কি সাংবাদিক? যদি নিতেই হয় তাহলে কেমন করে শিশুকে উপস্থাপিত করা হবে সে বিবেচনা কি থাকে সাংবাদিকের? বিবেচনা করা হয় কী দর্শকরা কিভাবে তাকে দেখবে? সে সম্পর্কে শিশুর উপলব্ধি কী বা তার উপলব্ধি করার ক্ষমতা কতটুকু? এই শিশু তার নিজের দেয়া বক্তব্যের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে কতটা সচেতন?  

আমরা যারা খুব উৎসাহিত হয়ে এমন কাজে  ঝাঁপিয়ে পড়ি তারা কি কখনো ভেবে দেখি যদি আমাদের নিজের সন্তান বা আমাদের পরিবারের কেউ হতো তাহলে আমরা কি এই সাক্ষাতকার এমন ট্রমা পরিস্থিতিতে বা স্বাভাবিক সময়েও  নিতে দিতাম?

যদি দরিদ্র পরিবারের শিশু হয় তাহলে আমাদের প্রবণতা থাকে কোন না কোন প্রণোদনা দিয়ে সাক্ষাতকার নেয়া, যা আরো বড় নীতি বিবর্জিত কাজ। দায়িত্বশীল সাংবাদিক  জানার চেষ্টা করে  ক্যামেরায় সাক্ষাৎকার না নিয়ে অন্য কোন বিকল্প আছে কিনা তথ্য সংগ্রহের। জানার চেষ্টা করে শিশুর বক্তব্যের স্বল্প বা দীর্ঘ মেয়াদে কী কী সম্ভাব্য পরিণাম হতে পারে।

সময় এসেছে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমুহের এসব বিষয়ে নিজস্ব গাইডলাইন তৈরি করার। প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার শিষ্টাচারবিধিই পারে সাংবাদিকতায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে।

পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.