ব্রা-প্যান্টির নারীবাদ নয়, ট্যাবু ভাঙার শব্দাবলী…

ইশরাত জাহান ঊর্মি: আমার খু্ব কফির নেশা। দুপুরে খাওয়ার পর এক মগ ব্ল্যাক কফি চাই-ই-চাই। নতুন অফিসে এখনও সব সেটআপ হয় নাই। খাওয়ার পর চা পাওয়া যায়, কফি মেলে না।

আমার সেদিন মাথাটা পাগল পাগল লাগতে থাকলো। কাজের চাপও অতটা নেই, আমি দুপুরে খাওয়ার পর বনানী চলে গেলাম, একটা কফিশপে।

Urmiভাবলাম, হয়ে যাক একটা একলা কফি। যদিও এ শহরে বিশেষত: সারাক্ষণ আরেকজনের বেডরুমে উঁকি দেওয়া টাইপ রাষ্ট্রে একটা একলা মেয়ে কোথাও বসে কফি খাচ্ছে আর সঙ্গে একটা সিগারেট, এমন দৃশ্য দেখতে খুব একটা অভ্যস্ত নয় মানুষজন। সিগারেট আমি কালে-ভদ্রে খাই। এটা এমন কোনো খাদ্য নয় যে খেয়ে আমাকে স্মার্ট হতে হবে বা বিপ্লব দেখাতে হবে।

কিন্তু ইচ্ছে করলেও একলা কোন ক্যাফেতে বসে সিগারেট খেতে পারবো না, লোকজন হয় ‘হা’ করে তাকিয়ে থাকবে, নয়তো নয় ঠোঁটের কোণে এমন হাসবে যে গা জ্বলে যাবে। বা ধরেন কিছু বলেই বসলো। তো ছোট একটা ইচ্ছের দাম দিতে গিয়ে ঝামেলা বাঁধাতে ইচ্ছা করে না, তাই খাওয়াও হয় না।
যা বলছিলাম, কফি নিয়ে মাত্র বসেছি। মনের মধ্যে সুখ-সুখ। এমন সময় পরিচিত এক ভদ্রমহিলা আমার দিকে প্রায় উড়ে এলেন। আমারও ভালো লাগলো। ভদ্রমহিলা লেখালেখি করেন, তার চেয়েও বড় কথা, পড়েন আর চারপাশের খোঁজখবর রাখেন। আমি তাঁর নামটা বলছি না, বললে অনেকেই চিনবেন।
কুশলাদি বিনিময়ের পর খুব একটু রোষ আর ঠাট্টা মিশিয়ে বললেন,
: আচ্ছা তোমরা কী শুরু করেছো বলো তো?
: কী আপা?
: এই যে উইমেন চ্যাপ্টারে…
আমি যতদূর জানি এই ভদ্রমহিলা নিজেও উইমেন চ্যাপ্টারে লিখেছেন দুএকবার, পড়েন তো নিয়মিতই। আমি একটু তটস্থ হই।
: কী আপা?
: এই যে ব্রা, পেন্টি, পিরিওড এইসব ছাড়া কি লেখার কোন বিষয় নাই? এগুলো লিখে তোমাদের অর্জনটা কি হচ্ছে? নারীবাদের কোন উদ্ধারটা তোমরা করছো?
আমি একটু ডিফেন্সিভ হওয়ার চেষ্টা করি। হেসে বলি,
: আপা, আমি তো এইসব লিখি নাই, তবে হ্যাঁ অনেকে লিখছেন…
ভদ্রমহিলা সিরিয়াস। আমাকে পেড়ে ধরেন,
: শোন মেয়ে পিরিয়ড, ব্রা, প্যান্টি, এগুলো নিয়ে লেখাটা কি খুব জরুরি? লেখালেখি করার তো আরও অনেক কিছু আছে, তোমরা কি ভাবছো এইসব নিয়ে লিখে খুব স্মার্টনেস দেখানো হচ্ছে? বরং নারীবাদের ক্ষতি করছো তোমরা, উইমেন চ্যাপ্টারের লেখাগুলো তো একেকটা বিপ্লবের হাতিয়ার, তাই না? তোমরা নব্য নারীবাদীরা যা শুরু করেছো…

আমি তাকে কী বলবো প্রথমে বুঝে পাই না প্রথমে। অন্য লেখকের লেখার ব্যাখ্যা দেয়ার দায় তো আমার না, কিন্তু আমার মনে হলো, এই ভদ্রমহিলার প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা জরুরি। আমি তার সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলি। প্রিয় কফি আমাকে চাঙ্গা করে।
কথা বলতে বলতে আমার কিন্তু খুব অদ্ভুত লাগতে থাকে। কারণ আমি বুঝতে পারি মহিলা আসলে শ্লেষ দেখাতে চাইছেন, এর বাইরে কিছু নয়। আবার একটু দ্বিধান্বিতও হই, না কি আসলেই এসব নিয়ে লেখালেখিটা তিনি পছন্দ করছেন না!
আমার কমলা ভাসিন এর কথা মনে পড়ে। নারীবাদ একটা আদর্শগত অবস্থান। পৃথিবীর বহু নারী নারীর বিপক্ষে কাজ করে, আবার বহু পুরুষ আছেন যারা নারীর পক্ষে সংগ্রাম করেন। অতএব নারীবাদ শুধুই নারীর চর্চার বিষয়টা এমন থাকে না।
ব্রা-পিরিয়ড সাবজেক্টগুলো কেউ মহৎ সাহিত্য লেখার জন্য বেছে নেয় না, এটা মেয়েদের দৈনন্দিন জীবনের নানান বিভাজন আর হিউমেলিয়েশনের প্রেক্ষিতে লেখা হয়।

একটা মেয়ে ওড়না পরবে কি পরবে না, জামার নিচ দিয়ে তার ব্রা’র ফিতা দেখা যাচ্ছে কীনা, এসব একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার, আপনি, নারী বা পুরুষ যেই হোন, নারীকে ব্যক্তিসত্ত্বা হিসেবে দেখতে শিখুন, সেক্স অবজেক্ট হিসেবে নয়-এই ধরনের লেথাগুলোর উদ্দেশ্য থাকে একথাটা বলাই।
আমি নিজে এসব নিয়ে লিখতেই হবে তা মনে করি না। আমার আরও অনেক কাজ আছে, আরও অনেক কিছু নিয়ে লেখার আছে বলে মনে করি। আমার ফ্যামিলিতে মা-খালাকে স্লিভলেস ব্লাউজ পড়তে দেখেছি, মামীদের খুবই ফ্যাশনেবল শাড়ি, ফুপুদের বোরকা আর চাচীকে সাধারণ শাড়ি। কোনটাই অস্বাভাবিক লাগে নাই।

পিরিয়ডের সময় আম্মার বিছানায় বসা নিষেধ ছিল, সাতদিন পর ওই কদিন পরা সব কাপড় আর বিছানার চাদর ধুয়ে আরবী বই ধরতে হতো, এইটা নাকি পাক-গোছল। পরে ঢাকায় পড়তে এলাম, হলে উঠলাম। দেড় মাসে একবার বিছানার চাদর পাল্টাই, পড়াশুনা করে অত সময় পাওয়া যায় নাকি, কিসের পাক-গোছল! নেসেসিটি নোজ নো ল। তো হয়েছে টা কি?

এইসবের মধ্য দিয়েই তো গিয়েছি আমরা মেয়েরা এবং যার যার কাজটা নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে করার চেষ্টা করেছি। তাছাড়া আমি এমনিতেও মনে করি নারীবাদ বা যেকোন বিপ্লবেরই সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।

আমি এই জিনিস দেখেছি, হেফাজতের আস্ফালনের সময়। বিরাট নাস্তিক, বিপ্লবীরা নিরাপত্তাহীনতা আর চাপাতির কোপ দেখে গর্তে ঢুকে গিয়েছিলেন, পরে আবার ফিরে এসে নিজেদের ফ্রেন্ডস আর ফলোয়ার পরিবেষ্টিত হয়ে আবারও আগের মতোই দায়িত্বজ্ঞানহীন লেখা লিখেছে।
কিন্তু সবকিছুর পরে আমি যেটা বলতে চাই, তাহলো কেউ যদি ” আরে তুমি তো পাতলা জামা পরো, নিচ দিয়ে ব্রার ফিতা দেখা যাচ্ছে” ” ঐ মেয়ে বুকে ওড়না নাই ক্যান” ” রোজা রাখো না ক্যান, পিরিওড হইছে?” …পুরুষদের নিরন্তর এইসব বাক্যাবলীর প্রতিবাদ করতে চায় লেখার মধ্য দিয়ে, তাহলে সে কিভাবে নারীবাদের ক্ষতি করলো? তাকে শ্লেষ করারই বা কি আছে? আসলে এই শব্দগুলি দ্বিধাহীনভাবে, আড়ষ্টতা ছাড়াও যে বলা যায়-এটাই সম্ভবত নতুন অনেকের কাছে। তাই এই বিরক্তি আর শ্লেষ।
ভদ্রমহিলাকে আমি বোঝানোর চেষ্টা করি, কতটুকু বুঝলেন জানি না। আলোচনা তো হতেই পারে, কিন্তু মস্তিস্কে ঘিলু কম থাকলে তখন আর যুক্তির রাস্তায় কেউ যেতে চান না, শ্লেষকেই মনে করেন বিরাট ধারালো অস্ত্র। হাসি পায় আমার!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.