জীবন কখনই ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ না

সুমন্দভাষিণী: অনলাইনে গতকাল বক্সিং সম্রাট মোহাম্মদ আলীর প্রয়াণের খবরের পাশাপাশি ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে অভিজাত একটি মেয়ের বাদাম বিক্রির খবর ছিল হটকেক। বাংলানিউজের খবরটি মূহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।

অনেকেই এর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পক্ষে-বিপক্ষে, দুভাবেই। প্রথমে নিউজটি এবং মেয়েটির ছবি দেখে আমিও অনেকের মতোন ‘আহা-হা’ করে উঠেছিলাম। শার্ট-জিন্স পরা, কানে হেডফোন লাগানো স্মার্ট একটি মেয়ে বাদাম বিক্রি করছে, দারুণ খবর তো! খবরের বিস্তারিত জানতে পেরে আর বিস্ময় কাজ করেনি। বলা যায়, কিছুটা বিরক্তি কাজ করেছে মনে। বিশেষ করে যারা মেয়েটির এই কাজে ধন্য ধন্য শোরগোল তুলছেন, তাদের প্রতি।

ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিকের মন্তব্যই শুধু যৌক্তিক মনে হলো। তিনি লিখেছেন, ‘আমি ঠিক সাপোর্ট করতে পারিনি। কোনো কাজ না পেলে বাদাম বিক্রি ঠিক আছে, কিন্তু ট্রাভেল এজেন্সির কাজ বাদ দিয়ে বাদাম বিক্রি করাটা কাজের কথা না। ফুডচেনের মতো পেশারও একটা চেন আছে। যারা লেখাপড়ার করার সৌভাগ্য অর্জন করেননি, তাঁরা ট্রাভেল এজেন্সির কাজ জুটাতে পারবেন না, তাঁদেরকে হকারি করতে হয়। এখন আমরাও যদি সেখানে ভালো মার্কেটিং নিয়ে ঢুকে পড়ি, তাহলে ঐ বেচারাদের প্রতি সুবিচার করা হয় না’।

বিষয়টিকে অতোটা সিরিয়াসলি দেখছি না। কিন্তু আমার মনে হয় না, ‘তাহমিনা কথা’ নামের এই মেয়েটি সত্যিই হকার হতে চাইছে। আমার ধারণা, এটি মেয়েটির একটি হঠাৎ খেয়াল।

ছোটবেলায় স্কুলে স্পোর্টসে আমরা ‘যেমন খুশি তেমন সাজতাম’। এই ঘটনাটার সাথে সেই যেমন খুশি সাজো ব্যাপারটার কোথায় যেন মিল আছে। মেয়েটির সাজপোশাক, তার ঝুড়ি, বাদামের প্যাকেট দেখে তাকে কোন পেশাদার বাদাম বিক্রেতা বলে মনে হয়নি আমার। আর খবরটিও অসম্পূর্ণ অনেক কিছুই জানার থেকে যায় পড়ার পরও।

Badam Seller
ছবিটি বাংলানিউজের সৌজন্যে নেয়া

যেমন, লালমাটিয়া কলেজে পড়া ২৩ বছরের একটি মেয়ের পরিবার মালয়েশিয়ায় চলে গেছে। এই বয়সী একটি মেয়ে শুধুমাত্র দেশে থেকে কিছু করবে বলে একাই রয়ে গেল বিশাল এই ঢাকা শহরে, তার পরিবারও তাতে রাজী হয়ে গেছে, কিছুটা অকল্পনীয়ই মনে হয়েছে। তাছাড়া, সে তো তার পড়াশোনাই এখনও শেষ করেনি।

খবর অনুযায়ী মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থেকে বাদাম কিনে নিয়ে এসে বাসায় বসে এই মেয়েটি ভাজে, বাছে, তারপর একটি ফ্যাশনেবল ঝুড়িতে করে, তার চেয়েও ফ্যাশনেবল প্যাকেটে করে বাদামগুলো নিয়ে এসে বিক্রি করছে জনে জনে, পুরো বিষয়টাই আমার কাছে গোলমেলে মনে হয়েছে। এই প্যাকেট বানানোর জন্যও তো লোকবল দরকার, কারখানা দরকার। সেই মানুষগুলো কোথা থেকে আসে? সেই খরচের হিসাব কোথায়?

স্পষ্ট করে বলতে গেলে মনে হয়েছে, খবর হওয়ার জন্য কিংবা সকলের নজর কাড়ার জন্যই কাজটি করছে সে। এবং সে এদিক দিয়ে সফলও, কারণ কর্পোরেট মিডিয়ার নজর কাড়তে পেরেছে সে। তার চুলের ফ্যাশন, পোশাক, বাদামের ঝুড়ি-প্যাকেট এসবই দামি। কিন্তু ওই রবীন্দ্র সরোবরেই যেসব কিশোর-কিশোরী শুধুমাত্র দুটো ভাতের আশায় শতচ্ছিন্ন জামাকাপড় পরে বাদাম বেচে, কই, তারা তো খবর হয় না কখনও? তাদের হাঁড়ির খবর তো আমরা জানতে চাই না?

এ্ই মেয়েটি কবে থেকে সে বাদাম বিক্রি করছে? দিনে দুশো-আড়াইশ টাকা লাভ নিয়ে সে ঘরে ফিরে যাচ্ছে, তাহলে মাস শেষে তার ইনকাম কতো দাঁড়াচ্ছে? এটাই কি তার আয়ের একমাত্র উৎস, যা দিয়ে সে ঢাকায় চলছে? পরিবার যদি মালয়েশিয়ায় থাকে, তাহলে কার সাথে সে থাকে? বাবা সাটুরিয়া মেডিকেল কমপ্লেক্সে কাজ করতেন, মা-ও করতেন, তারা কী কাজ করতেন, তারা কি চিকিৎসক ছিলেন, নাকি কর্মচারি ছিলেন? এসবই জানার বাইরে রয়ে গেল। 

আমরা শুধু জানলাম, একটা স্মার্ট মেয়ে বয়ান দিতে চাইছে যে, দুনিয়ার সব কাজই কাজ, ছোট কাজ-বড় কাজ বলে কিছু নেই। বেকারত্বে জর্জরিত এই দেশে এই বার্তাটিই নাকি সে পৌঁছে দিতে চাইছে। দারুণ অনুপ্রেরণা তো! আমরা যাই, দলেবলে এখন বাদাম বেচি। ওর কথামতো আমি মোটেও ট্রাভেল এজেন্সির জব আর বাদাম বিক্রিকে এক ধরনের কাজ হিসেবে ধরতে পারবো না। প্রতিটি কাজই আলাদা, প্রতিটি কাজেরই সুনির্দ্দিষ্ট ধরন আছে।

অবশ্যই সব কাজই কাজ, অসম্মানের কাজ বলে কিছু নেই, কিন্তু সেই জায়গায় পৌঁছানোর তরিকা স্মার্ট বাদাম বিক্রেতা হওয়া না। তাহলে কোথায় যাবে রবীন্দ্র সরোবরের আমাদের চেনা পরিচিত সেই বাদামওয়ালারা? একজন মানুষ হকার হয় আর কোনো কাজের যোগ্যতা না থাকায়, বা অন্য কোনো কাজের সুযোগ না থাকায়। একজন শিক্ষিত মানুষের কোনো অধিকার নেই হতদরিদ্র, অনন্যপায় মানুষের মুখের আধার কেড়ে নেয়ার।

সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়ার সময় আমিও কাজ করেছি বিভিন্ন জায়গায়। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে পাথর টানা থেকে শুরু করে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে সুতা টানার কাজ, ছুটিতে লন্ডনে গিয়ে রেস্টুরেন্টেও কাজ করেছি। উন্নত দেশগুলোতে সব কাজই করা যায়, এতে অসম্মানের কিছু নেই। আমাদের দেশেও এমন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। এখন অনেক জায়গাতেই স্টুডেন্টদের কাজ করতে দেখা যায়। এটা অবশ্যই পজিটিভ।

কিন্তু স্টুযেন্টরা যেখানে কাজ করছে, সেখানে নিশ্চয়ই গ্রাম থেকে আসা একজন অশিক্ষিত মানুষ কাজ করতে পারবে না। কাজেই গরীব লোকেরা যেখানে দুটো করে খাচ্ছে, সেখানে নজরকাড়ার জন্য ‘স্মার্টনেস’ দেখানোর কোনো কারণ নেই।

জীবনটা মোটেও ওই ছোটবেলার স্পোর্টসের মতোন নয়, যেখানে আমরা মেথরানি সাজতাম, পত্রিকার হকার সাজতাম, বা পানওয়ালা, ভিক্ষুক সাজতাম। দরিদ্র চরিত্রগুলো কয়েক ঘণ্টার জন্য সাজা যায়, কিন্তু বাস্তবে একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে দারিদ্র্য উপলব্ধি করা যায় না।

 

শেয়ার করুন:

এত মানবদরদী হইলে মেডাম এড লাগায়া ব্লগ লেখেন ক্যান?? জনসেবা মার্কা ব্লগ লেইখা তাতেও তো লাভের অঙ্ক ছারলেন না।। আপনিও বিজনেসে নামসেন, সেও বিজনেসে নামসে।। এন্ড অফ দ্যা ডে নোওয়ান কেয়ারস এবাউট দ্যা পুঊর।। পুজিবাদি দালাল দুইজনই।। সো হিপোক্রসি রাখেন।। অফ যান।।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.