জরায়ু দায়গ্রস্ত কন্যা

তাসলিমা আক্তার: লেখক, শিক্ষক, গায়ক ইত্যাদি শব্দগুলোকে আকার হ্রস্ব-ইকার অথবা দীর্ঘ-ইকার দিয়ে মূল শব্দের নারীকরণ ব্যাপারটা আমার পছন্দ না। নৌকার ছইয়ের মত, রিক্সার হুডের মত কিংবা মাথায় ঘোমটা তোলার মত দীর্ঘ-ইকারের ঘোমটা তোলা নরের তরে নারী। তাই গ্রস্থ শব্দটির নারীকরন বাদ দিলাম।

Taslima Akterআজ একটা তুমুল ঝড়ো প্রেম কাহিনী লিখতে বসেছি। কোনো টুইস্ট ছাড়া স্বভাবতই কাহিনীতে একটি ছেলে আর একটি মেয়ে আছে। মেয়েটির নাম দেই ছড়া, ছেলেটির তিলক।

পরিচয় পর্ব এক আত্মীয়ের বিয়েতে। দুজনেই পারিবারিকভাবে ইনভাইটি। ফেরার সময় সেল নাম্বারটা বিনিময় হয়েছিল। ধীরে ধীরে ভালোলাগার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয় দুজনে। ভালোলাগা ঘনায়মান হলে ভালোবাসা জন্ম নেয়। ভালোবাসাটা বিশ্বাসের সুতোয় বাঁধা। কোনো এক বিকেলের ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দে মানুষ ভুল করে। ছড়ার সাদা শার্টের খোলা বোতামে সুখ সুখ উষ্ণতা। তিলক অন্ধকারে হাতরে খুঁজে ছড়ার ঘন চুলের অরণ্য। আংগুল ছুঁয়ে যায় নগ্নপীঠ। ঘুরেফিরে স্থির হয় কন্ঠার হাড়ের নিচে। ঘরের ভেতর যন্ত্রের বাতাস। হিম হিম বাতাসে ছড়া বন্য হয়।  বাতাস কহে রোসো, ঘড়ির কাঁটায় সময় স্থির হয়। কিন্তু যুবক যুবতীর স্থির হবার অবকাশ নেই। অনাদিকাল থেকে স্বতঃসিদ্ধ ধারায় মানুষের সমর্পণ রমণের কাছে।

পনের বার ট্রাই করে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ছড়া আর ঠিক তখুনি বেজে উঠে

-পিরিয়ড মিস করেছি তিলক যতটা তীব্র ছড়ার কণ্ঠ, ঠিক ততটাই শীতল গলা তিলকের

-চলে আসো স্যামসনাইটে গিয়ে বড় একটা স্যুটকেস কিনব, শপিং করব তারপর বিয়ে করে বাড়ি ফিরব আইএ্যাম ড্যাম সিরিয়াস একথা তোমাকে আগেও বলেছি ছড়া

ফোন কেটে বারান্দার লাগোয়া চেয়ারে বসে ছড়া পড়া শেষ হতে এখনো দু’বছর বিয়ে, ছেলে উফ!!! সব শেষ হয়ে যাবে নিজের করে কিছুই থাকবে না আনন্দ দুজনার ধারণ করার দায় শুধুই ছড়াতেই বর্তায়

Asian Motherকিছু কিছু কষ্ট কাউকে কওয়া যায় না, সওয়া যায় না সিগারেটটা অসহ্য লাগছে ছুঁড়ে ফেলে মেঝেয় ধোঁয়া থেকে উঠে আসে মায়াময় মুখ ম্যাডোনা মাতা বুকের কাছে ধরা জরির সুতায় বোনা কাঁথায় জড়ানো শিশু মুখ শরীরের ভেতর ক্রমবর্ধিষ্ণু জীবন। আনন্দ জোগায় না ঘুণপোকার অনুকরণে ক্রমাগত কুঁড়ে কুঁড়ে খায় জাত, কূল, সমাজ,স্বপ্ন, শ্লেষ্মা, রক্ত

জরায়ু দায় প্রকৃতি শুধু মেয়েগুলোকেই দিয়েছে। সেই দায়ে মেয়েগুলো কুঁকড়ে থাকে। জন্মের পর কটা মাত্র বছর একটু শান্তি। তারপর থেকেই নিয়মের বাঁধন। একসুতাও আলগা করার উপায় নেই।

যে বয়সে একটা মেয়ের পিরিয়ড শুরু হয়, এ বড় অবুঝ বয়স। কিছুই বুঝে উঠার আগে মেয়েটিকে একটি বৃত্ত এঁকে দেয়া হয়। সীতার জন্য যেমন ছিলো লক্ষণ রেখা। লক্ষণ রেখা লংঘন করলেই তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে দশ মাথাওয়ালা রাবণ। এর এক মাথা সমাজ, এক মাথা, রীতি রেওয়াজ এক মাথা তোমার শরীর। হা-করে থাকা এদের হা-মুখ তোমায় গিলে খাবে মেয়ে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে মেয়েদের নিরন্তর প্রচেষ্ঠা চলে লক্ষণ রেখা সুদৃঢ় করার। যে মেয়ের লক্ষণ রেখা যত দুর্বল, জীবন তার ততোই কন্টকময়।

সাউথ এশিয়ার বেশির ভাগ পরিবারে এখনো মেয়েদের পড়াশুনা শেষ হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের আগে তরুণ স্বামীটি কথা দেয়, তোমাকে পড়াশুনা করাবো। রেগুলার ক্লাস করেই পড়া শেষ করবে। বছর না ঘুরতেই মেয়েটি জরায়ুতে ধারণ করে জীবন। তারপর আবার সেই একই চক্র। সন্তান জন্মদান, লালন পালন, ঘর কন্যা।

নারী-পুরুষের ভালোবাসার সাথে নিয়তির মতোই শরীর কিংবা সেক্স। আনন্দ বা বেদনা বোধও দুজনার সমান। কিন্তু যেহেতু ধারনের দায়টা একা মেয়েটির তাই আনন্দ পরবর্তী জীবনটাকেও বয়ে রেড়ানোর দায়ও একা মেয়েটির ঘাড়ের উপর সিন্দাবাদের ডাইনীর মতো সওয়ার হয়। দৃশ্যত জ্বালা সইতে না পেরে কিছু মেয়ে নীরবে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভপাত ঘটায়, কিছু মেয়ে মরে বাঁচে।

জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রি-কশন ব্যবস্থার পাশাপাশি আজকাল অনেক পোস্ট-কশন কন্ট্রাসেপ্টিভও বাজারে এসেছে। কিন্তু তার একটিও পুরুষের জন্য নয়। প্রতিটিই ব্যবস্থাই মেয়েদের জন্য। এগুলোর পার্শ্ব প্রতিকৃয়াগুলোও ভোগ করতে হয় মেয়েদেই। সমপরিমাণ হরিষ কিন্তু ভবিতব্য অন্যান্য অনাচারের মত বিষাদটা শুধুই তোমাকেই দিয়েছে কন্যা।

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.