পদে পদে ভয় যাদের

শারমিন জোহরা সিমি: দীর্ঘ সাত বছরের অপেক্ষা, প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মা হবার গল্পটি বলেছিলাম। আজ বলবো আর একটি না বলা কথা, যেটি এ পর্যন্ত মনের মধ্যেই গোপন রেখেছি।

বলতে অপরাধবোধ করছি- সত্যি বলতে কি গর্ভধারণের পর প্রথম কয়েকমাস কন্যা সন্তান হোক সেটি চাইনি, যদিও আজীবনকাল মেয়েদেরকেই বেশি মানবিক ভেবে এসেছি। এ চাওয়া কারও বংশে প্রদীপ জ্বালাতেও নয়, আগুন জ্বালাতেও নয়। মনে শংকা ছিল কেবলমাত্র নিরাপত্তাহীনতার। দ্বিতীয় কোনো কারণ নয়। যদিও পরে মন খারাপ করিনি, বরং খুশি হয়েছি।

Sharmin Shimiকিন্তু দু:শ্চিন্তা রয়েই গেছে। মেয়ে হয়ে জন্মে নিজে জানি পথ কতোটা বন্ধুর। কৈশোরে না পড়তেই প্রতিনিয়ত যে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করতাম, সেটি ছিল ইভ-টিজিং। এদিকে, বাইরে এক দফা অপদস্থ হবার পর বাসায় এসে বললে হতে হতো দ্বিতীয়বার অপমানের পালা! তাদের কথা- তোমাকে কেন বলে? আর কাউকে তো বলে না! (তারা কিভাবে জানে যে আর কাউকে বলে না, এটি আমার এখন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে!)

যেন টিজারের দায় আমারই। অদ্ভুত বিচার! আর বলতেও ইচ্ছে করতো না, না বললেও আবার ঘটনা গোপন রাখার দোষ!! সেই নাজুক সময়টিতে যখন সাপোর্ট দরকার, কেন যেন অনেক অভিভাবক তাদের খবরদারি দেখান। যখন মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠা প্রয়োজন, সেসময় উল্টে গুটিয়ে থাকতে হয়েছে।

এটি শুধু আমার না, আমার পরিচিত অনেক মেয়েকে দেখেছি। এখন হয়ত ইভটিজারের সংখ্যা কমেছে- যদিও নিশ্চিত নই, কিন্তু যারা আছে তারা নব্বই দশকের চেয়ে বিপজ্জনক।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দু’ একটা ভিডিও ক্লিপ দেখি- কোনো একটি ছেলে একটি মেয়েকে চড়-থাপ্পড় মেরেই যাচ্ছে, তার সাঙ্গপাঙ্গ পেছনে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। আর মন্তব্যগুলোতে—কেন যেন বেশির ভাগ মানুষই মেয়েটার দোষ খোঁজে! অদ্ভুত লাগে এসব বিচার!!

আমার কন্যার জন্য আমি নিশ্চয়ই এমন বিচারক হবো না, কিন্তু নিষ্পাপ শিশু মুখের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবি- কোথায় লুকাবো আমি তাকে!!

স্বপ্ন দেখি সে একদিন বড় হবে। হে ঈশ্বর! হবে তো? তার আগে কোন… না, আমি আশাবাদী।

তারপর? বড় হয়ে… তখন থাকবে ট্র্যাপ! মিষ্টি কথার, ইমোশনের!

শুধু ইমোশন কেন? প্রলোভন, ভীতি আরো কত কী ফাঁদ! কোচিং, মাদ্রাসা, বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, কোথায় নেই অঘটন!

পত্রিকা পড়তে ভয় হয়, দুঃসংবাদের ভয়। খুন-খারাবি আর নারী-শিশু নির্যাতন! শুধুই কি মেয়ে শিশু? না তো! তবে রেশিওতে অনেক পার্থক্য। এক জায়গায় পড়েছিলাম ছেলে শিশু নিপীড়নের হার ৪০:১, যেখানে মেয়ে শিশু হার ৫:১। আর এই নিপীড়ক গোষ্ঠী রয়েছে পরিবার থেকে শুরু করে রাস্তা-ঘাট সবখানেই! তবে কোথায় নিরাপদ আমার সন্তান?

মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে ভাবি, সন্দেহপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি কি? না হয়েই কি করবো! সময়টা খারাপ, ভবিষ্যতের সময় হয়তো আরো খারাপ হবে!

কিন্তু আমি আশা করতে চাই, সুদিনের আশা, নিরাপদ ভবিষ্যতের আশা। কেউ কি আমায় নিশ্চয়তা দেবেন? সুন্দর স্বপ্ন দেখতে চাই, বিশ্বাস করুন!!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.