সমালোচনা সহজ, কাজটা করা কঠিন

নাদিয়া শারমিন: সমালোচনা বড় মজার কাজ। মুখে মুখে কারো ছাল ছিলে নিতে পারার মত মজা আর বোধহয় পৃথিবীতে নেই। কাজটায় আর দশজনের মত আমিও মজা পাই খানিক….অস্বীকার করবো না। সেই কাজটা করতে গিয়েই একদিন সিরিয়াস একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।

আমার এক অপছন্দের লোক তার চেয়েও বেশি অপছন্দ করি এমন একজনকে নিয়ে আমার সামনে প্রশংসা শুরু করে। আমি তার প্রতিবাদ করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেই-তার প্রশংসা আসলে কতটা অযৌক্তিক এবং ভুল, আমার ঐ চরম অপছন্দের লোকের যে আসলে ঐরকম কোন ইতিবাচক কাজ নেই। উদ্দেশ্য মজা পাওয়া না থাকলেও মজা পাচ্ছিলাম।মজাটা ধাক্কা খেল যখন সে বললো যে- ‘ঐ অবস্থানে আগে পৌঁছে নাও, তারপর তুমি তাকে এমন অপমান করে কথা বলার অধিকার রাখবে, এখন এই অবস্থান থেকে তাকে সমালোচনার কোন অধিকার তোমার নেই।’

চিন্তিত মুখে চুপ হয়ে গিয়েছিলাম।

Nadia Sharmin 2
নাদিয়া শারমিন

আসল প্রসঙ্গে আসি। গত কয়েকদিন মাছরাঙার জিপিএ ফাইভ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অজ্ঞতা নিয়ে একটা রিপোর্ট ব্যপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে এই প্রশংসাকারী এবং সমালোচনাকারী উভয়ের প্রায় সবাই একমত- এ প্লাস/ গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়াদের হার এবং শিক্ষার মান দুটো সমানভাবে বাড়ছে না। গ্রেডিং পদ্ধতির আমি প্রথম ব্যাচ, প্রথম গিনিপিগ। আমার সময় এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৭৬ জন যার মধ্যে ৭৫ জন সায়েন্সে, একজন মানবিকে। কমার্সে কেউ পায়নি। এইচএসসিতে ২০ জন জিপিএ ফাইভ পেয়েছিল, যাদের সবাই ছিল সায়েন্সের।

আর এখন…………? গুনতেও ভয় লাগে।

যাহোক রিপোর্টটার কারণে Anowar Hossain কে যারা সমালোচনা, গালিগালাজ করেছেন তাদের অনেকেই অনেক উচ্চপদস্থ, অনেক অভিজ্ঞ। তাদের সাথে আমার অভিজ্ঞতার তুলনা করতে গেলে সেই ২০০১/০৩ এর জিপিএ ফাইভ এবং বর্তমান জিপিএ ফাইভের হারের মত পার্থক্য দেখা দেবে। কেউ আমার সাংবাদিকতার আদর্শ, কেউ শিক্ষাদানকারী, কেউ আমার প্রশিক্ষণদানকারীও বটে। কাজেই তাদের টপকে জ্ঞান দেখানোর দুঃসাহস করা আমার উচিত না। কেননা প্রচলিত নিয়মে তা বেয়াদবি।

সাংবাদিকতায় অনার্স মাস্টার্স করার সুবাদে খানিকটা নৈতিকতা শেখার সুযোগ হলেও তা ঝাড়ার সুযোগ নেব না।

কারন ডিপার্টমেন্টে দেখেছি ‘সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা’ নিয়ে প্রশ্নটা থাকতো অপশনাল এবং সেটার উত্তর দিলে অন্যটার তুলনায় কম নম্বর পাওয়া যেত। তাই ক্লাসমেটদের বেশিরভাগকেই দেখেছি পড়ার শর্টলিস্ট থেকে ঐ প্রশ্ন/টপিকটাকে বাদ দিতে। আমি পড়তাম-শিখবো বলে।

কিন্তু বাস্তব কর্মজীবনে আসার পর অনেকের মত আমাকেও শুনতে হয়েছে-যা পড়েছ ভুলে যাও। নতুন করে শেখ।সেটা ভূলিয়ে দিতে অনেকে উঠে পড়ে লেগেছিলও। পুরোপুরি লাভ হয়নিা। কোন বিষয়ে সাংবাদিকতার এথিক্স ভাঙতে দেখে প্রতিবাদ করলে বা আমাকে অনৈতিক পদ্ধতিতে কোন রিপোর্ট করতে বললে যদি না করতাম, তবে সেটা হয়ে যেত বেয়াড়াপনা,একগুয়েমি, ঘাড়ত্যাড়ামি।

আমার মনে হয়- সাংবাদিকতায় এসে অনেক জুনিয়রই অনেক সিনিয়রদের কাছ থেকে এভাবে শিক্ষা নিতে নিতে হয় নীতিহীন ভদ্র ও জনপ্রিয় হয়েছে অথবা তা অগ্রাহ্য করে নীতিবাগীশ বেয়াদব, কোনঠাসা সাংবাদিকে পরিণত হয়েছে।

যাহোক এই নীতি হজম,বমন এবং বদহজম করা সাংবাদিকদের নিয়েই আমাদের মহান সাংবাদিক সমাজ।

এবার তাদের আদালতে বিচারের মুখোমুখি মাছরাঙার এই রিপোর্টার। সাংবাদিকতায় পদে পদে গেটকিপার ( নিউজ এডিটর, সিএনই, হেড অফ নিউজ, মালিকানা) থাকার কথা জেনেও খুব কম মানুষই সেই গেটকিপারদের দোষ দিয়েছেন। যা ঝড় রিপোর্টারের উপর দিয়েই যাচ্ছে। কবে না জানি শুনবো তাকে সরিয়ে দেয়ার নির্দেশ এসেছে। কারণ এটাই ঐতিহ্য। কেউ নিজের দোষ নিজে স্বীকার করে না, বালিশ ছোড়াছুড়ির মত অন্যের দিকে পাস করে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচে।

এখন প্রশ্ন হল রিপোর্টটা কি নৈতিক হয়েছে? উত্তরটা আমি দেব না। কারণ দিন শেষে রিপোর্টের নৈতিকতা আসলে রিপোর্টারের কাছেই। আমি কোনদিন সাড়ে ছয় মিনিটের রিপোর্ট করিনি। করলে মনে হয় আমার সাবেক এবং বর্তমান অফিসের সিনিয়ররা আমাকে খুন করতো। সেটা বানাতে গিয়ে এসব বাচ্চাদের ইন্টারভিউ নিতাম কিনা? নিতাম। চেহারা ব্লার করতাম কিনা? জানি না। সেই অবস্থায় পড়লে বুঝতাম। সিনিয়ররা ব্লার করতে বলতো কিনা? মনে হয় না। কারণ অনএয়ার হওয়ার আগে এই সমস্যাটা তারা বেশিরভাগই মনে হয় বুঝতো না।

এর সাথে আর কি কি যুক্ত হতে পারতো? অনেককিছু। সেগুলো যুক্ত করা আসলেই সম্ভব হত কিনা? জানিনা-এটাও সেই অবস্থার মধ্যে পড়লে বুঝতাম। প্রশ্নগুলো কঠিন হয়েছে কিনা? আমার মনে হয়নি। রিপোর্টটায় আর কি কি করলে সমালোচনা হত না? কিছুই না।কারণ আলোচিত রিপোর্ট মাত্রই ভুল থাকবে এবং কেউ না কেউ সমালোচনা করবেই। সেটা যৌক্তিক হোক বা অযৌক্তিক। রিপোর্টের মাধ্যমে কারো মানহানি হয়েছে কিনা? হয়েছে। কিন্তু পুলিশ কাউকে এরেস্ট করে এনে যখন আসামী বলে ক্যামেরার সামনে পরিচয় করিয়ে দেয় তখন তাদের ছবিটাও আমরা দিতে বাধ্য। তারা অপরাধী হোক বা না হোক। কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ আসলে তাকেও দেখাতে আমরা বাধ্য। এই বাচ্চারা কি পড়াশোনায় সবোর্চ্চ গ্রেড পাওয়ার যোগ্য? কে জানে! আমি তো পরীক্ষা পদ্ধতিটাকেই মান যাচাইয়ের উপযুক্ত মাপকাঠি মনে করি না। এমন রিপোর্ট কি আমি করতাম? তাও জানি না। অবস্থা বলে দিত।

সব মিলিয়ে রিপোর্টের নৈতিকতা বিশ্লেষণের কোন ইচ্ছাই আমার নেই। কেননা, নৈতিকতা বিষয়টাই খুব সাবজেকটিভ। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এর ব্যাখ্যা ভিন্ন। বিএনপিকে গালি দেয়া নিউজ আওয়ামীলীগের কাছে দারুন, বিএনপির কাছে রুচিহীন অনৈতিক। আবার আওয়ামী লীগকে গালি দেয়ার রিপোর্টও বিএনপির কাছে নৈতিক, আওয়ামী লীগের কাছে অনৈতিক।

এখন প্রশ্ন হলো- সিনিয়র জুনিয়র উভয় ধরনের সাংবাদিকই এই রিপোর্টারের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু কেউ কি এমন কোন রিপোর্ট বানিয়ে দেখিয়েছেন, যাতে বোঝা যায় এই রিপোর্ট কেমন হওয়া উচিত ছিল? কেউ কি তেমন কোন রিপোর্টের নিদর্শন হাজির করেছেন, যাতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এমন চিত্র পরিষ্কারভাবে ফুটে , ব্যাপক আলোচিত/জনপ্রিয়ও হয়, সমস্যা সমাধানে সরকারকে বাধ্যও করানো যায়, আবার তেমন কোন সমালোচনাও না হয়?

যখন এমন কোন রিপোর্ট বানাবেন তখন না হয় আমিও এই রিপোর্টারকে একরাশ সমালোচনা করবো। তার আগে… মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.